হাসমতের পরিবারের শত বছরের ঘুড়ির ইতিহাস

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৪, ১৫:৪৩

ঘুড়ি। দূরের নীল আকাশ আর মাটি-এই দুয়ের প্রেমের সে যেন এক ডাকপিয়ন। চোখের সামনে ঘুড়ি দেখামাত্রই ভেসে ওঠে শৈশবের ফেলে আসা অবুঝ দিনগুলোর কথা। তবে ঘুড়ি ওড়ানো শুধু শৈশবের শখ নয়। এ এক এমন শখ, যা কিশোর থেকে যুবক কিংবা মধ্যবয়সী; পৌষের বিকেল সবার মনেই দোলা দিয়ে যায়। আবার কেউ কেউ তো গোটা এক জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন ঘুড়ির প্রেমে পড়েই। এমনই একজন মোহাম্মদ হাসমত; যিনি ঘুড়ির পেছনেই পার করেছেন জীবনের ৬০টি পৌষ। পুরান ঢাকার কলতাবাজারে নিজ বাড়িতে বসেই ঘুড়ি বানান মোহাম্মদ হাসমত। তাকে ‘ঘুড়িয়াল হাসমত’ নামেই চেনেন অনেকে। শাঁখারি বাজার, কলতাবাজারসহ পুরান ঢাকার বেশিরভাগ এলাকার কয়েক প্রজন্মের কথা একটাই— ‘সাকরাইনে হাসমতের ঘুড়ি চাই’। কেউ কেউ পছন্দের ডিজাইন বুঝিয়ে দেন অন্তত সপ্তাহ/দশ দিন আগে। তাদের চাহিদা মেটাতেই এই সময়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর সুযোগ নেই হাসমতের।

হাসমতের খোঁজে পৌষের এক বিকেলে চলে যাই কলতাবাজারের হাজী আব্দুল মজিদ লেনে। তার বাড়ির খোঁজ পেতে খুব একটা কাঠখড় পোহাতে হয়নি। অলিগলির ভেতরে হলেও ‘ঘুড়িয়াল হাসমত’ বলতেই সবাই দেখিয়ে দিলেন; পৌঁছে গেলাম তার ডেরায়। পরিচয় দেওয়া মাত্রই হাসমতের প্রশ্ন, ‘আমার গল্প শুনতে এসেছেন?’ ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়ালাম। তারপর শুরু হলো সেই গল্প। চলুন একসাথেই শুনি...!

গল্পটা শত বছরের

পাকিস্তান আমলেই ঘুড়ির হাতেখড়ি মোহাম্মদ হাসমতের। পড়ালেখায় যতটা মনোযোগ ছিল না, তারচেয়ে বেশি ছিল ঘুড়ির প্রতি। স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাবার সাথেই বসে থাকতেন, দেখতেন ঘুড়ির গাঁথুনি। খুব সহজেই রপ্ত করে ফেলেন ঘুড়ি বানানোর কৌশল। ৮ বছর বয়সে প্রথম সফলভাবে ঘুড়ি বানান হাসমত। সেই সময়ে ঘুড়ি বানানো এবং অন্যের ঘুড়ি ধরা তার কাছে ছিল আনন্দের বিষয়। হাসমত বলেন, ‘পাকিস্তান আমল থেকে শুরু। বেশ আনন্দ ও শখের বশেই এটি পেশা হিসেবে নিয়েছি। প্রায় ৬০ বছর ধরে শখের ঘুড়ি বানিয়েই যাচ্ছি। আমার বাবা এই ঘুড়ি বানিয়েছেন ৪০ বছরের বেশি। এই বাড়ির নাম সামুর বাড়ি। পাকিস্তান আমল থেকে আমাদের বানানো ঘুড়িকে ‘সামুর বাড়ির ঘুড়ি’ নামেই জানত। এরপর আস্তে আস্তে সবাই হাসমত ঘুড়ি বলতে থাকল।’

ঘুড়ির মাধ্যমে একসময় যে প্রেম নিবেদন ও চিরকুটের আদান-প্রদান হতো সেই গল্পও শোনালেন হাসমত। তিনি বলেন, ‘আগে ছোট কাগজে লিখে ঘুড়ির মধ্যে বেঁধে দিত ছেলেরা। ওই ঘুড়ি জানালা দিয়ে, ছাদে বাড়ির উঠানে ফেলত। তখন তো আর মোবাইল ছিল না, তাই এভাবেই যোগাযোগ করত।’

গল্পের এক ফাঁকে এলো এক তরুণ। সাকরাইনের জন্য তার ঘুড়ি চাই, তাই বুকিং মানি দিয়ে যেতে চান। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওনার ঘুড়িই কেন?’ তরুণ শাহাদাত্ জানাল, ‘হাসমত চাচার ঘুড়ি ভালোভাবে ওড়ে। এই ঘুড়ি নিয়ে কাইট খেলাটা বেশ জমে ওঠে।’ শুধু শাহাদাত্ নয়, তার পাড়ার সবারই হাসমতের ঘুড়ি চাই। আসছে সাকরাইনে তারা এই ঘুড়ি ওড়াবে, তাই আগে এসেই ঘুড়ি নিশ্চিত করছেন।

ঘুড়িতে এনে দিয়েছে সম্মাননাও

এক যুগ আগেও ঘুড়ি ছিল সাদামাটা। কিন্তু হাসমত বিভিন্ন নকশার ঘুড়ি বানানো শুরু করেন ২০১২ সালের পর থেকে। চিল, ঈগল, প্রজাপতিসহ নানা ধরনের ঘুড়ি। তবে এসব ঘুড়ি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন উত্সব, প্রদর্শনী ও মেলায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান হাসমত। তিনি বলেন, ‘২০০৫ সালে ‘ছবির হাটের’ উদ্যোগে সেন্টমার্টিনে ঘুড়ি উত্সব হয়। সেখানে আমাকে নিয়ে যায় তারা। টানা ৭দিন সেখানে ঘুড়ি বানাই। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা সেগুলো উড়িয়েছে, প্রদর্শনী করেছে। এখনো কক্সবাজার, মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমার ঘুড়ি নিয়ে যায় প্রদর্শনীর জন্য।’

ঘুড়ির জন্য সুদূর চীন থেকেও সম্মাননা এসেছে হাসমতের ঘরে। করোনার আগে চীনের একটি ঘুড়ি উত্সবে বাংলাদেশ থেকে প্রদর্শনীর জন্য নিয়ে যাওয়া হয় তার ঘুড়ি। হাসমতকে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি যেতে পারেননি; তার সম্মাননা পাঠানো হয় ঘুড়ি ফেডারেশনের মাধ্যমে। এছাড়া ঢাকার লালকুঠিতেও তাকে সম্মাননা জানানো হয়। এবার সাকরাইনেও তাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদর্শন করা হবে।

প্রতিদিন ২০০-২৫০ ঘুড়ি

সারাবছরই ঘুড়ি বানান হাসমত। তবে বর্ষা শেষ হলেই তার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। কোনো কোনোদিন ২৫০টি ঘুড়ি পর্যন্ত বানাতে হয়! ঘুড়ি তৈরির জন্য খুব ভোরে ওঠেন হাসমত। কনকনে শীতে ঘুড়ি বানানোর জন্য বাঁশের কাঠি, ছুরি, আঠা ও কাঠের একটি পাটাতন নিয়ে নিজ কক্ষে ঘুড়ি বানাতে বসে পড়েন, মাঝে মাঝে ছাদেও ঘুড়ি তৈরি করেন। ঘুড়ি তৈরির মালামাল আনেন বিভিন্ন জায়গা থেকে। হাসমত জানান, ঘুড়ির জন্য উন্নতমানের টিস্যু কাগজ নিয়ে আসি নয়াবাজার থেকে। আর বাঁশ যেটা দিয়ে ঘুড়ি বাঁকানো হয় সেটি আনা হয় কেরানীগঞ্জ থেকে। ঘুড়ি বানানোর যাবতীয় কাজ তাকেই করতে হয়। তাই ঘুড়িও ২০০/২৫০টার বেশি বানানো যায় না। চাহিদা আছে, কিন্তু তার পক্ষে সম্ভব হয় না। ‘যতদিন বেঁচে আছি ঘুড়িই বানাবো। কিন্তু আমাকে দিয়ে শেষ হবে এই হাসমত ঘুড়ি, আমার পরে কেউ করবে না...।’ বিদায় বেলায় অনেকটা বিরহের সুরেই কথাটি বললেন হাসমত।

ইত্তেফাক/এইচএ