‘পাঁচদিন থাকি রইদ (রোদ) নাই। ঠাণ্ডার মধ্যে কামাইয়ো করবার পাই না। ঠাণ্ডায় দুদিন কাজে যায়নি। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুবই কষ্টে আছি। হামরা নদী এলাকার মানুষ। হামার কাইয়ো খোঁজও নেয় না। শুনি অনেক জায়গায় কম্বল আসে, হামার এতি কাইয়ো কম্বল-টম্বল ধরিও আইসে না। এই ঠাণ্ডাত কম্বল পাইলে খুব ভালো হইল হয় বাহে।’
চলমান তীব্র শীত ও কনকনে ঠাণ্ডায় এভাবেই নিজেদের দুর্ভোগের কথা বলছিলেন দেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর নাওডাঙ্গা ইউনিয়নে ধরলা নদী অববাহিকার চরগোরকমণ্ডল গ্রামের দিন মজুর ফজর আলী (৭৬)। একই কথা জানান একই গ্রামের আমজাদ হোসেন (৯৫)।
রোববার (১৪ জানুয়ারি) বিকালে ফজর আলী ও আমজাদ আলীর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ধরলা নদী ও ভারত সীমান্তঘেষা তীরবর্তী এই গ্রামটিতে শহরাঞ্চলের তুলনায় বেশি ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে। আমজাদ আলী টানা পাঁচদিন পর সূর্যের দেখা পেয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় ধরলা পাড়ে শেষ মুহূর্তের সূর্যের আলোয় উষ্ণতা নিচ্ছেন। টানা পাঁচদিন পর সূর্যের দেখা পেলে তার মতো অনেকেই রোদে উষ্ণতা অনুভূতি নিচ্ছেন। তবে সূর্যের দেখা মিললেও হিমেল বাতাস বইছে। তাই ঠাণ্ডায় কাবু মানুষগুলো আগুনের পরশ ছেড়ে উঠছেন না। ফলে অনেকেই আগুন জ্বালিয়ে ঠাণ্ডা নিবারণের চেষ্টা করছেন। ফজর আলী ও আমজাদ আলীর গ্রামের চারটি আবাসনে ১৫০টি পরিবার ঠাণ্ডায় কাঁপছে। তারাও এই চলামান তীব্র ঠাণ্ডা কম্বল পায়নি। তারাও তীব্র ঠাণ্ডায় পরিবার-পরিজন নিয়ে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করছেন। একই অবস্থা গোরকমণ্ডল আবাসনেও। শুধু নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের গোরকমণ্ডল ও চর-গোরকমণ্ডলে নয়, গত কয়েকদিন ধরে গোটা উপজেলা জুড়ে শীতের প্রকোপ বাড়ায় নিদারুন কষ্টে দিনানিপাত করছেন এ অঞ্চলের হাজারও নিম্ন আয়ের মানুষজন। মানুষের পাশাপাশি কষ্ট বেড়েছে গবাদিপশুরও। গত পাঁচদিন ধরে সূর্যের দেখা না মেলায় এবং ৭-৮ কিলোমিটার বেগে হিমেল হাওয়ার প্রবাহ অব্যাহত থাকায় কষ্টের মাত্রা বহুগুণে বেড়েছে।
চরগোরকমণ্ডল গ্রামের জেলেকা বেগমসহ একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন, নদী তীরবর্তী প্রান্তিক এলাকা হওয়ায় তাদের কাছে এসব কম্বল পৌঁছায় না। কেউ তাদের জন্য শীতবস্ত্র নিয়ে এলাকায় যান না। ফলে তারা এই হাড়কাঁপা ঠাণ্ডাতেও কষ্ট করে জীবনযাপন করছেন। তাদের শীতবস্ত্র প্রয়োজন। পাওয়া গেলে তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে।
গোরকমণ্ডল আবাসনের বাসিন্দা দিনমজুর জামিলা বেগম ও রশিদা বেগম জানান, আমাদের এইদিকে খুব শীত। সেই রকম ঠাণ্ডা বাহে। গরম কাপড়চোপর নাই। ঠাণ্ডার জন্যে কাজ কামাই কিছু করবার পারতেছি না। আমরা খুব কষ্টে আছি। কাপড়চোপর পাওয়া গেইলে কিছু ঠাণ্ডা নিবারণ করা গেইলো হয় বাহে। কিন্তু আমাদের এইদিকে কেউ কম্বল নিয়া আইসে না। এই দুই নারী আরও জানান, রোববার দুপুরে মাত্র ৮টি কম্বল আবাসনের বয়স্কদের দিয়েছে। জানি না আমাদের ভাগ্যে কম্বল জুটবে কি না।
চারটি আবাসনসহ ধরলার তীরবর্তী মানুষজন কম্বল না পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে চর-গোরকমণ্ডল ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আয়াজ উদ্দিন জানান, চরাঞ্চলে অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। সেখানে সরকারিভাবে কম্বল পেয়েছি ২০টি ও বেসরকারিভাবে পেয়েছি ৫০টি। একেবারে যারা নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের মাছে বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, কমপক্ষে আরও ৩০০টি কম্বল হলে আমার এলাকায় চাহিদা মেঠানো সম্ভব।
গোরকমণ্ডল ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শ্যামল চন্দ্র মণ্ডল জানান, ‘গোরমণ্ডল আবাসনসহ এলাকায় অনেক গরীব মানুষ তীব্র ঠাণ্ডায় কাঁপছে। সরকারিভাবে মাত্র ৫টি কম্বল বরাদ্দ পেয়েছি। মাত্র পাঁচটি কম্বল দিয়ে কি এতো মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব’ বলে ক্ষোভ জানিয়েছেন। তিনি তার এলাকার অসহায় শীর্তাত মানুষদের কম্বল দেওয়ার জন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন, গত শনিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রোববার (১৪ জানুয়ারি) ফুলবাড়ী উপজেলাসহ জেলা জুড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গড়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি থেকে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠানামা করছে। এ অবস্থা আরও কয়েকদিন চলতে পারে। ১৭ থেকে ১৮ তারিখের মধ্যে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। বৃষ্টি পর ঠাণ্ডার মাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তখন আকাশে থাকা মেঘও কেটে গিয়ে রোদের দেখা মিলবে।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী জানান, ওই গ্রামে শুধু নয়, আমার ইউনিয়নের অনেক হতদরিদ্র শীতার্ত মানুষ কম্বল পায়নি। আমার ইউনিয়নের চারটি গ্রাম ভারত সীমান্তঘেষা। ভারতের হিমালয় কাছাকাছি হওয়ায় ফুলবাড়ী উপজেলা জুড়ের শীতের প্রকোপ অনেক বেশি। তাই আমার এলাকায় অন্তত দেড় হাজার থেকে ২ হাজার শীতবস্ত্র প্রয়োজন। কিন্তু সরকারিভাবে পেয়েছি ১০০ ও বেসরকারিভাবে পেয়েছি ১০০। তাই অনেকেই কম্বল পায়নি।
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিব্বির আহমেদ জানান, সরকারিভাবে ৩ হাজার কম্বল বরাদ্দ পেয়েছি। সেগুলো নির্বাচনের আগেই বিতরণ করা হয়েছে। চাহিদার তুলনায় এ বছর বরাদ্দ কম। তাই অনেক এলাকায় শীতবস্ত্র পৌঁছায়নি। তবে নতুন করে ১ হাজার শীতবস্ত্র এসেছে। সোমবার সকাল চর-গোরকমণ্ডলসহ যে এলাকায় এখনও শীতবস্ত্র পৌঁছায়নি সেখানে দ্রুত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে।

