বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। সকালে সাব্বির হোসেন নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড নিহত হওয়ার বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের বিষয়টিও জানান পুলিশ সুপার।
গতকাল সকালে এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৪টার দিকে বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের পূর্ব বুড়িরচর গ্রামের পাশে পায়রা নদীর তীরে চায়না প্রজেক্টের রাস্তা সংলগ্ন মজিদ মিলিটারির বাড়ির পূর্বপাশে প্রধান আসামি নয়ন বন্ড অন্য আসামিদের নিয়ে লুকিয়ে আছে এমন খবরে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে, পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। উভয় পক্ষের গোলাগুলিতে আসামিদের মধ্যে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই পড়ে থাকে। গোলাগোলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে মো. সাব্বির আহম্মদ নয়ন বন্ডকে শনাক্ত করে। গোলাগুলিতে অতিরিক্ত এসপি শাহজাহান, এসআই হাবিবুর রহমান, এসআই মনিরুল, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান আহত হয়। আহতরা বরিশাল পুলিশ লাইন হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন।
পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি গুলি এবং তিনটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি আরো বলেন, নয়নকে জীবিত ধরতে পারলে ভালো হতো। তা হলে অন্য আসামিদের ধরতে সহজ হতো। তারপরও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অন্য আসামিরাও ধরা পড়বে।
মিন্নির প্রতিক্রিয়া : নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘আমার সামনেই আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে ওরা। আমি চেষ্টা করেও রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি। দুনিয়ার কোনো মেয়ের যেন এমন নির্মমতা চোখের সামনে দেখতে না হয়। মিন্নি বলেন, আমি এখন স্বস্তিতে নিশ্বাস নিতে পারছি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। প্রধানমন্ত্রীকে আমি ধন্যবাদ জানাই।
দুলাল শরীফের প্রতিক্রিয়া : কান্নায় ভেঙে পড়ে দুলাল শরীফ বলেন, ছেলেকে তো ফিরে পাব না, তবে ছেলের আত্মা অন্তত একটু শান্তি পাবে। আমার একমাত্র ছেলেকে আমি যাদের কারণে হারিয়েছি, তাদের ফাঁসির দাবি করছি। এদিকে বন্দুকযুদ্ধে নয়ন নিহত হওয়ায় বরগুনার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
কে এই নয়ন বন্ড : বরগুনা পৌর শহরের ডিকেপি রোড এলাকার মৃত সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে সাব্বির আহমেদ নয়ন (নয়ন বন্ড)। শহরের কলেজ রোড, ডিকেপি সড়ক, কেজি স্কুল ও ধানসিঁড়ি সড়কে মূলত নয়নের বিচরণ ছিল। ছিনতাই, ছাত্রদের মোবাইল ফোন জিম্মি করে টাকা আদায়, ছোটোখাটো মারধর থেকে তার অপরাধপ্রবণতা শুরু হলেও ২০১৭ সালে পুলিশি অভিযানে নয়নের কলেজ রোডের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্যসহ তাকে আটক করে পুলিশ। এরপরই নয়ন নামটি লাইমলাইটে চলে আসে। ওই মামলায় জামিনে আসার পর বেপরোয়া হয়ে ওঠে নয়ন। এরপর সে নিয়মিত মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যায় এবং রিফাত ফরাজীকে সঙ্গে নিয়ে একটি গ্রুপ তৈরি করে। ওই গ্রুপে নয়নের সহযোগী হিসেবে বরগুনা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ধানসিঁড়ি সড়কের দুলাল ফরাজীর দুই ছেলে রিফাত ফরাজী ও তার ছোটভাই রিশান ফরাজী কাজ করত।
মূল নাম সাব্বির আহমেদ নয়ন হলেও কর্মকাণ্ডের জন্য রহস্য উপন্যাসের চরিত্র জেমস বন্ডের নাম নিজের নামে জুড়ে দেয় নয়ন। ফলে সহযোগীরা তাকে ডাকা শুরু করে ‘নয়ন বন্ড’ নামে। রিফাত ফরাজী ও অন্যদের সহযোগিতায় ধানসিঁড়ি সড়ক থেকে শুরু করে শহরজুড়ে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল নয়ন। বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হলেও আইনের ফাঁক গলে বের হয়ে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সে। চুরি ছিনতাই লুটপাট, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে নয়নের বিরুদ্ধে বরগুনা থানায় ৮টি মামলা রয়েছে।
নিহত রিফাতের আত্মীয় ও কয়েকজন বন্ধু জানান, এক বছর আগে বাকিতে সদাই বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় বিকেবি সড়কের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নয়া মিয়ার পা ভেঙে দেয় নয়ন। এর কিছুদিন পর বাসা থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ইয়াবা ও দেশীয় ধারালো অস্ত্রসহ নয়নকে গ্রেফতার করে বরগুনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এই মামলায় কিছুদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে নয়ন। কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি না থাকলেও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি এবং বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে ছাত্রলীগ নামধারী রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীদের সঙ্গে চলাফেরা করায় কাউকেই পরোয়া করছিল না নয়ন।
নয়নের লাশ নানাবাড়িতে দাফন
নিহত নয়ন বন্ডের লাশ বরগুনা সদর উপজেলার ৩ নম্বর ফুলঝুড়ি ইউনিয়নের বুরজিরহাট গ্রামে তার নানা জয়নাল মৃর্ধার বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। জেনারেল হাসপাতালের মর্গে নিহত নয়ন বন্ডের লাশ ময়না তদন্ত শেষে মঙ্গলবার বিকালে পরিবারের পক্ষে মামা বরগুনা পৌরসভার কর্মচারী মিজানুর রহমান গ্রহণ করেন।
পারিবারিক লোকজন ও কিছুসংখ্যক গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে নামাজের জানাজা পড়ান মাওলানা জাকির হোসেন। দাফনের সময় নিহত নয়ন বন্ডের মা মোসাঃ সাহিদা বেগম উপস্থিত ছিলেন। নিহত নয়নের মামা জানান, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর ঝামেলা এড়াতে লাশ বরগুনা শহরের ধানসিঁড়ি সড়কের বাড়িতে দাফন না করে তার নানাবাড়িতে দাফন করা হয়েছে।
