রোববার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিতে প্রতিবন্ধীরা

তারা বাড়ি ছেড়ে যেতে চান না...

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩৫

জলবায়ু বিপদাপন্ন বাংলাদেশে প্রতিবছর বিভিন্ন দুর্যোগ হানা দেয়। ছোট-বড় সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় হঠাত্ এসে লন্ডভন্ড করে দেয় দেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা। হামুন, মোখা, সিত্রাং, সিডর-এমন নানা নাম নিয়ে এরা এসে ধুলোয় মিশিয়ে দেয় মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। প্রতিবছরই মৃত্যু ঘটে অসংখ্য মানুষের, কেউ কেউ হাত-পা হারিয়ে এখনো লড়ছেন জীবনযুদ্ধে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়ের পরিমাণ বেড়েছে। যার ফলে ভূমি, ঘরবাড়ি, জীবিকার ক্ষতি ছাড়াও ব্যক্তি এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী স্থানচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় গ্রাম থেকে গত এক যুগে অন্তত ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ শহরে স্থানান্তরিত হয়েছেন। এই তালিকায় পিছিয়ে রয়েছেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। প্রতিবন্ধী ও বৃদ্ধরা নিরাপদ এলাকায় স্থানান্তরিত হতে না পারায় তীব্র জীবন ঝুঁকি নিয়েই তাদের মোকাবেলা করতে হয় দুর্যোগ।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নুর নবীর কথাই ধরা যাক। বেশ কয়েক বছর আগে ঘূর্ণিঝড়ের সময় তাকে ছাড়াই তার পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গিয়েছিল। কারো সাহায্য ছাড়া ধ্বংসাবশেষ ও বিদ্যুতের লাইন পার হয়ে প্রচণ্ড বাতাসের মধ্যে তার আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া ছিল অসম্ভব। ৫১ বছর বয়সী নুর নবী বলেন, ‘যখন বাতাস তীব্রভাবে বাড়তে থাকলো, তখন আমার স্ত্রী এবং বাচ্চারা পিছনের দরজা দিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যায়। আমি তখন সামনের দরজায় দাঁড়িয়ে। পরে আমার এক মেয়ে বাড়ি ফিরে আবার আমাকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যায়।’ নুর নবী সীতাকুন্ডের একটি প্রতিবন্ধী অ্যাডভোকেসি গ্রুপের প্রধান। তিনি চেষ্টা করেছিলেন শহরে স্থানান্তরিত হতে। নুর নবী বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের জন্য শহরে চাকরির সুযোগ নেই বললেই চলে। চাকরি না করতে পারলে ওখানে গিয়ে খাবো কী? এখানে তো নিজের অনেক কিছুই আছে। তাই ছেড়ে যেতে পারি না।’

দুর্যোগে প্রতিবন্ধীরা সবচেয়ে অবহেলিত
বাংলাদেশের ২৮ শতাংশ মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করেন। ‘বাংলাদেশের জলবায়ু স্থানচ্যুতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিবছরই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলবর্তী ২৩৬টি উপজেলার মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এসব উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ২৭ শতাংশই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রতিবন্ধীদের হার একেবারেই নগণ্য। এটি তাদের জীবনকে আরো বেশি বিপদের মধ্যে ফেলে; কারণ প্রতিবছরই দুর্যোগের তীব্রতা বেড়েই চলছে।

দুর্যোগের সময় প্রতিবন্ধী মানুষেরা থাকেন সবচেয়ে অবহেলিত। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেসব মানুষকে প্রতিবন্ধী করেছে, তারা সবচেয়ে আতঙ্কে থাকেন। ২০১০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে গাছ চাপা পড়ে পা হারিয়েছেন ফেনীর সোনাগাজীর নিম্নাঞ্চলের রেণু আক্তার। এখন তিনি হামাগুড়ি দিয়েই চলাফেরা করেন। তবে মাঝে মধ্যে অন্যের সাহায্যে একটি হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন। রেণু বলেন, ‘হুইলচেয়ার চালানোর মতো শক্তি আমার নেই। আমার ভাইবোনেরা মাঝে মধ্যে ধাক্কা দিয়ে চারপাশে ঘুরিয়ে আনে।’

যখন দুর্যোগ আঘাত হানে, তখন গ্রামবাসীদের মতো রেণুর পরিবারও দ্রুত কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে বা উঁচু স্থানে সরে যান। তখন রেণু একধরনের ‘বোঝা’ হয়ে ওঠেন বলেই মনে করে তার পরিবার। অন্যদিকে সামান্য ঝড়, বৃষ্টিও রেণুর কাছে বেশ ভয়ংকর মনে হয়। কারণ ৩ কিলোমিটার দূরের আশ্রয়কেন্দ্রে তাকে নিয়ে যাওয়া যদি সম্ভব না হয়!

মিরসরাইয়ের ইছাখালী ইউনিয়নের সেলিনা আক্তারও দুর্যোগের সময়ে প্রতিবন্ধীদের ‘বোঝা’ মনে করেন। তিনি দুইজন গুরুতর প্রতিবন্ধী শিশুর মা। পরিবারে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় বেশ চিন্তায় পড়ে যান সেলিনা। তিনি বলেন, ‘আমি আর কী করতে পারি, দুই সন্তানকে একাই সরিয়ে নেওয়া সম্ভব? আমি কোন শিশুকে বহন করব? তাদের কাউকে তো ফেলে রাখা যাবে না।’

দুর্যোগের সময় প্রতিবন্ধী ও নারীদের জন্য জরুরি পরিবহন ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে মনে করেন সেলিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে পাঠালে আমার দুই সন্তানকে সরিয়ে নিতে পারব। অন্যথায় কোথাও যাবো না। প্রয়োজনে আমি বাচ্চাসহ এখানেই মারা যাব।’

সেলিনা বেগম কিংবা রেণু আক্তার—এত ঝুঁকির মধ্যে থেকেও নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে শহর কিংবা অন্যত্র যেতে চান না। যাওয়ার ইচ্ছে যে নেই, বিষয়টা এমনও না। রেণু আক্তারের মতে, তার একার জন্য তার পরিবার কখনো শহরমুখী হবে না। অন্যদিকে সেলিনা বেগম মনে করেন, শহরে গিয়ে তিনি এরচেয়ে ভালো থাকবেন না। সেখানে জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো তার পক্ষ সম্ভব নয়।

অনেকে কখনোই বাড়ি ছেড়ে যান না...
চট্টগ্রামের একমাত্র দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে জলবায়ু জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ে কাজ করেন জাহেদুল ইসলাম (২২)। পুরো সন্দ্বীপেই গত কয়েক দশক ধরে ভাঙন ও দুর্যোগের ফলে শত শত পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শক্তিশালী কোনো ঝড়, বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এই ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দেয়।

জাহেদুল ইসলাম বলেন,  ‘দ্বীপে মাত্র কয়েকটি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এর মধ্যে পৌর ভবনের দ্বিতীয় তলা অন্যতম। দুর্যোগের সময়ে এখানে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ মানুষ অবস্থান করে। প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। বরং এখানে এসে তাদের আরো কষ্ট করতে হয়।

তিনি বলেন,  ‘কিছু প্রতিবন্ধী মানুষ কখনোই তাদের বাড়ি ছেড়ে যান না। তাদের কাছে দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়াটাই একধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। তবে, কখনো কখনো তাদের জোর করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তখন আবার ভাঙা রাস্তা, উপকরণ সংকটসহ নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়।

নীতিনির্ধারকরা অনেকাংশে ভুল বোঝেন
জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের সামনের সারিতে রাখতে হবে বলে মনে করেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, ‘আমি যদি নোয়াখালী কিংবা দক্ষিণাঞ্চলে থাকি এবং ৬, ৭ কিংবা ১০ নম্বর সিগন্যাল দেয়—আমার পাশে যদি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিংবা একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি থাকেন সেক্ষেত্রে আমরা তাদের ফেলে কীভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে যাব? যাদের হাঁটতে সমস্যা, চোখে সমস্যা কিংবা যারা যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তাদের দিকে আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। যারা অসমর্থ, তাদের দিকে যত্নশীল হতে হবে, আর তাদের পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। কাজের মধ্য দিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন পরিবর্তন করতে পেরেছেন—২০২১ সালের এমন ৩০ জন প্রভাবশালী নেতার মধ্যে একজন বাংলাদেশের ভাস্কর ভট্টাচার্য। যিনি প্যারিসে কপ-২১ জলবায়ু সম্মেলনেও অংশ নিয়েছিলেন। ভাস্কর ভট্টাচার্যের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো এখনো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা অনেকাংশে ভুল বোঝেন।

ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রভাবিত করে, তা আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য বেশি বেশি গবেষণা প্রয়োজন। তবে তিনি কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি দোষ দিতে চান না। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে যারা কাজ করছেন, এই সমস্যা সম্পর্কে তাদের আরো সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম