নব্বইয়ের দশকে এরশাদ সরকারের আমলে ধলপুরের সিটি পল্লিতে পুনর্বাসন করা ছিন্নমূল মানুষের থাকার জায়গায় পরিবহন পুল ও গ্যারেজ নির্মাণ করছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এতে এখানে প্রায় ৩৫ বছর ধরে বসবাস করা বাসিন্দাদের খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই হয়েছে। সিটি পল্লির বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে আমরা সিটি করপোরেশনকে এই জায়গার জন্য ভাড়াও পরিশোধ করেছি। কিন্তু হঠাত্ করে আমাদের থেকে ভাড়া নেওয়া বন্ধ করে দেয়। এছাড়া আমাদের উচ্ছেদ করে পুনরায় ঘর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৯ মাস পার হলেও কোনো ধরনের ঘর বা থাকার জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি আমাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ও করা হচ্ছে না। আমরা এখন খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোনো রকম প্লাস্টিকের কাগজের বেড়া দিয়ে এই শীতের মধ্যে থাকছেন তারা। এই ছোট খুপরিতে চার-পাঁচ জন এক সঙ্গে থাকছে। শীতে ও অসুস্থ হয়ে ইতিমধ্যে অনেক বৃদ্ধ মারাও গেছেন বলে জানান তারা। তাদের দাবি, আমরা এখন কোথায় গিয়ে উঠব, কিছুই জানি না। যার কারণে এক পাশে নির্মাণকাজ চললেও আমরা এখানে খোলা আকাশের নিচে আছি। কিন্তু আমাদের প্রতিদিনই হুমকি দিচ্ছে আমাদের এই কাগজের বেড়া বা খুপরি উঠিয়ে নিতে।
জানা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ধলপুরের এ ছিন্নমূলদের উচ্ছেদ করে সিটি করপোরেশন গাড়ি রাখার স্থান ‘কেন্দ্রীয় যানবাহন বিশ্রামাগার’ বানাচ্ছে। এটি নির্মাণের সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস জানান, পর্যায়ক্রমে এ এলাকায় বৈধভাবে বসবাস করা উচ্ছেদের শিকার সবার জন্যই পুনর্বাসন ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, পাঁচ একর জায়গাতে আমরা আমাদের কর্মচারীদের পুর্নবাসন এবং ১২৬টি পরিবার যারা তেলেগু সম্প্রদায় আছে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছি। বাকি ১০ একর ৭ শতাংশ জমিতে আধুনিকভাবে সব যন্ত্রপাতি, গাড়ি ও বিশ্রামাগার করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সিটি পল্লির বাসিন্দা রাশিদা বেগম কাগজপত্র দেখিয়ে বলেন, ১৯৯০ সালে ঘর বরাদ্দ পেয়েছিলাম ভূমিহীন ছিন্নমূল পরিবার হিসেবে। আমরা ভূমিহীন ছিন্নমূল ২৩০টি পরিবার নব্বইয়ের দশকে কমলাপুর বসবাস করেছিলাম। ওখান থেকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদেরকে ধলপুর ১ নম্বর সিটি পল্লিতে ২৩০টি ঘর বরাদ্দ দেন। গত প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমরা এখানে বসবাস করে আসছি, কিন্তু গত ১ ফেব্রুয়ারি সিটি করপোরেশন উন্নয়নের কথা বলে এবং এ ঘরের বিনিময়ে প্রতিটি পরিবারকে তিন মাসের মধ্যে একটি টিনশেড এবং পরে একটি করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে আমাদেরকে উচ্ছেদ করে। সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বর্তমানে থাকছি আমরা। আমাদের মাথা গোজার ঠাঁই নাই।
কাঁদতে কাঁদতে রাশিদা জানান, আমরা প্রত্যেকে দিনমজুরের কাজ করে কোনো রকম দিনাতিপাত করি। আমাদের প্রত্যেকে একটি ঘরের বিনিময়ে দ্রুত একটি টিনশেড ঘর দরকার। আমাদের একটি করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিবে কথা বলে আজ প্রায় ৯ মাস হতে চলল। কোনো প্রকার টিনশেড ঘর আমরা পাইনি এবং কবে নাগাদ ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাব তা আমাদের কাছে স্বপ্ন। এমনকি মেয়রের সাক্ষাত্ করার অনুমতিও পাচ্ছি না। এমনকি বর্তমানে স্থানীয় কাউন্সিলর আমাদের সাক্ষাৎ দিচ্ছে না।
পরিবার নিয়ে যাত্রাবাড়ী এলাকার ধলপুর বস্তিতে থাকতেন রিকশাচালক শাহীন। কিছু দিন আগেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানে সেই থাকার ঘরটি হারিয়েছেন তিনি। এখন পরিবার নিয়ে পড়েছেন অথই সাগরে। শাহিনের মতো একই অবস্থায় ধলপুর বস্তির সিটি পল্লি কলোনিতে বসবাস করা আরো কয়েক হাজার মানুষের।
এ বিষয়ে জানার জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমানেক ফোন দিলে তিনি ধরেননি। তবে এ বিষয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও মুখপাত্র আবু নাসের বলেন, যারা এখানে বৈধভাবে ছিল তাদের পুনর্বাসন করা হবে। এর বাহিরে আমি আর কিছু বলতে পারছি না।
