রাজশাহীতে শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ১৩:৩৪

কারও ৩ মাস, আবার কারও ৮ মাসের বেতন বকেয়া। রাজশাহী মহানগরীর বিসিক শিল্প নগরী এলাকার সাকোয়াটেক্সের ৩০০ শ্রমিকের মধ্যে বেশির ভাগই বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করতে পারেননি। সেই সঙ্গে দোকানের খাতা ভরেছে বাকির তালিকায়। অনেকের সন্তানের পড়াশোনা বন্ধের পথে। রোগশোকে নিজের চিকিৎসার খরচও মেটাতে পারছেন না অনেকে। বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন শ্রমিকরা।

‘সম্প্রতি কারখানায় উৎপাদিত সোয়েটার রপ্তানি নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছে। তাই শ্রমিকদের ১ মাসের বেতন পরিশোধ করা যায়নি। খুব দ্রুতই শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা হবে’
- এনামুল হক
সাবেক এমপি এবং
চেয়ারম্যান, ‘এনা গ্রুপ’

এই কারখানার মালিক রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সদ্য সাবেক এমপি এনামুল হক। এই সোয়েটার কারখানাটি তিনবারের সাবেক এমপি এনামুল হকের মালিকানাধীন ‘এনা গ্রুপে’র অঙ্গীভূত প্রতিষ্ঠান। ৩০০ শ্রমিকের সবার বেতন বকেয়া রয়েছে।

‘এই কারখানার শ্রমিকরা কাজের ওপর পারিশ্রমিক পান। মাসে গড়ে তারা ১২-১৭ হাজার টাকা বেতন পান। কারখানার ৩০০ শ্রমিকের কারও ৩ মাসের আবার কারও ৮ মাসের বেতন বকেয়া। তিনি নিজে ৪ মাসের বেতন পাবেন। প্রতি মাসে বেতন না পাওয়ায় বাড়িভাড়া ও দোকানে অনেক বাকি পড়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও কিনতে পারছি না। নতুন বছরে ছেলেমেয়ের স্কুলড্রেস দেয়ার অবস্থাও নেই’
- আশা বেগম
লিংকিং অপারেটর,
সাকোয়াটেক্স কারখানা

ভুক্তভোগী শ্রমিকরা জানান, বকেয়া বেতনের জন্য তারা অনেক দিন থেকেই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেনদরবার করছিলেন। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের পর যেকোনো মূল্যে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মালিকপক্ষ। কিন্তু নির্বাচনের পরও বকেয়া পরিশোধে মালিকপক্ষের কোনো সাড়া নেই। অবশেষে বকেয়া আদায়ে প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করেই গত বুধ-বৃহস্পতিবার  কারখানায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ ও অনশন করে শ্রমিকরা।

‘আমি ও ছেলে তুষার এখানে কাজ করি। ৪ মাস হলো দুই মা-ব্যাটার (মা-ছেলে) বেতন বন্ধ। তাহলে সংসার চলবে কী করে? কাজ করেও বেতন পাবো না, এই দুঃখের কথা কাউকে বলাও যায় না। ভোটের আগে বেতন চাইতে গেলে কর্মকর্তারা জানান, মালিক (এনামুল হক) নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত। ভোট পার হলেই বেতন দেবেন। কিন্তু ভোটে তিনি হেরে যাওয়ায় বকেয়া দেওয়ার আর কোনো খবর নেই’
- পিয়ারা বেগম

এ সময় ভুক্তভোগী শ্রমিকরা জানান, ৩-৪ মাস ধরে প্রতি সপ্তাহের সোমবার বা বৃহস্পতিবার বকেয়া পরিশোধের আশ্বাস দেন কর্মকর্তারা। কিন্তু বেতন দেওয়া হয় না। এভাবে মাসের পর মাস বেতন ছাড়া তারা মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।

সাকোয়াটেক্স কারখানার লিংকিং অপারেটর আশা বেগম বলেন, ‘এই কারখানার শ্রমিকরা কাজের ওপর পারিশ্রমিক পান। মাসে গড়ে তারা ১২-১৭ হাজার টাকা বেতন পান। কারখানার ৩০০ শ্রমিকের কারও ৩ মাসের আবার কারও ৮ মাসের বেতন বকেয়া। তিনি নিজে ৪ মাসের বেতন পাবেন। প্রতি মাসে বেতন না পাওয়ায় বাড়িভাড়া ও দোকানে অনেক বাকি পড়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও কিনতে পারছি না। নতুন বছরে ছেলেমেয়ের স্কুলড্রেস দেয়ার অবস্থাও নেই।’

নারী শ্রমিক সম্পা খাতুন বলেন, ‘কেউ বকেয়া বেতন চাইতে গেলে কারখানার কর্মকর্তারা দুর্ব্যবহার করেন। যারা বকেয়া বেতনের জন্য কর্মকর্তাদের কাছে যায়, তাদের নাম লিখে রাখা হয়। পরদিন ওই শ্রমিকদের আর কারখানায় ঢুকতে দেওয়া হয় না। এভাবে প্রায় অর্ধশত শ্রমিককে চাকরিচ্যুত বা কারখানায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর শ্রমিকরা একজোট হয়ে আন্দোলন শুরু করেছেন। সবাই মনে করছেন, তাদের আর চাকরির দরকার নাই, তবে বকেয়া বেতনের খুব দরকার।’

আরেক শ্রমিক সেলিনা বেগম বলেন, ‘বেতন চাইতে গেলে কর্মকর্তারা জোরপূর্বক সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়। কর্মকর্তারা জানায়, এটাই রিজাইনের কাগজ। বেতন দিয়ে দেবে। তারপর বের করে দেয়। বকেয়াও আর দেয় না। ৩ মাসের বেতনও এভাবে মেরে খায়। গত কোরবানির ঈদেও শ্রমিকরা এতিম বাচ্চা নিয়ে খালিমুখে কাটিয়েছে। বেতন দেয়নি। এই কারখানায় কাজ করে শ্রমিকদের বড়ই দুরবস্থা।’

কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন শ্রমিক পিয়ারা বেগম বলেন, ‘আমি ও ছেলে তুষার এখানে কাজ করি। ৪ মাস হলো দুই মা-ব্যাটার (মা-ছেলে) বেতন বন্ধ। তাহলে সংসার চলবে কী করে? কাজ করেও বেতন পাবো না, এই দুঃখের কথা কাউকে বলাও যায় না। ভোটের আগে বেতন চাইতে গেলে কর্মকর্তারা জানান, মালিক (এনামুল হক) নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত। ভোট পার হলেই বেতন দেবেন। কিন্তু ভোটে তিনি হেরে যাওয়ায় বকেয়া দেওয়ার আর কোনো খবর নেই।’

শ্রমিকদের অভিযোগ, কারখানায় তারা বেতনের দাবিতে অবস্থান নিলে পুলিশ আসে। কিন্তু তারা কারখানার পক্ষ নিয়েই কথা বলে। অবস্থান নিলে লাঠিপেটা করে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শ্রমিক জানান, কারখানার মালিকের অনেক টাকা। অনেক ক্ষমতা, তাই পুলিশও তারই পক্ষে কথা কয়। শ্রমিকদের টাকা নেই, তাই পুলিশও শ্রমিকদের লাঠিপেটা করতে চায়।

শ্রমিকদের বেতন বকেয়ার বিষয়ে ‘এনা গ্রুপে’র চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি এনামুল হককে প্রশ্ন করা হয়। তখন তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি কারখানায় উৎপাদিত সোয়েটার রপ্তানি নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছে। তাই শ্রমিকদের ১ মাসের বেতন পরিশোধ করা যায়নি। খুব দ্রুতই শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা হবে।’

ইত্তেফাক/এইচএ