ইউক্রেন ইস্যুতে ভুগবে রাশিয়া!

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২২

রাশিয়া নাবিকসহ ইউক্রেনের ৩টি জাহাজ আটক করার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। এমনকি সর্বশেষ পরিস্থিতি শান্ত না হলে যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ২৬ নভেম্বর ইউক্রেন রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত ও কৃষ্ণ সাগর উপকূলের কাছের কিছু অংশে ৩০ দিনের জন্য সামরিক শাসন জারি করেছে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট পেট্রো পোরোশেঙ্কো স্থলপথে রাশিয়ার হামলার আশঙ্কা করছেন। এমন প্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রেক্সিট নয়, ইউরোপের বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে ইউক্রেন। তবে ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়া ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলেও মনে করা হচ্ছে।

 

২৫ নভেম্বর রাশিয়া আজভ সাগরে ২৪ জন নাবিকসহ ইউক্রেনের ৩টি জাহাজ আটক করে। আহত তিন নাবিকের চিকিত্সা চলছে। আটক ২৪ জন ইউক্রেনীয় নাবিকের মধ্যে কয়েক জনকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে স্বীকারোক্তি দিতে দেখা গেছে। সেখানে পরিকল্পিত প্ররোচনার কথাও স্বীকার করেছেন তারা। ক্রিমিয়ার এক আদালত ৭ জন নাবিককে ২ মাসের জন্য আটক রাখার নির্দেশ দিয়েছে। কের্শ প্রণালী থেকে জাহাজ আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই দ্বন্দ্ব এখন আর দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ইউরোপ ছাড়িয়ে এর উত্তাপ যুক্তরাষ্ট্রেও পৌঁছেছে।

২০১৪ সালে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ বেদখল ও ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশপন্থি বিদ্রোহীদের মদদের কারণে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছিল। এবার নাবিকসহ ইউক্রেনের ৩টি জাহাজ দখল করায় আরো নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কথা বলছেন ইউরোপের অনেক নেতা। ইইউ’র সভাপতি দেশ অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কারিন কে্নইসি বলেন, গোটা ঘটনা সম্পর্কে আরো তথ্য ও দুই পক্ষের আচরণ বিশ্লেষণ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর আরো নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। পোল্যান্ড রাশিয়ার ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। জার্মানিতেও এমন সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ইউক্রেন ইস্যুতে বেশ কোণঠাঁসা হয়ে পড়তে পারে রাশিয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জানিয়েছে, তারা চলতি মাসেই রাশিয়ার ওপর চলমান অবরোধ আরো বাড়াবে। গ্রুপ সেভেনভুক্ত দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং জাপান) ইউক্রেনের নাবিকদের ওপর সামরিক শক্তি প্রয়োগকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেছে। তাদের সঙ্গে সায় দিয়েছে ইইউ। আগামী ১০ ডিসেম্বর ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন।

বর্তমান সংকটের সমাধান করতে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল সংলাপের ডাক দিয়েছেন। বার্লিনে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির প্রতিনিধিরা ‘নর্মান্ডি’ কাঠামোর আওতায় ইউক্রেনের সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা যৌথভাবে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে স্পষ্ট পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো ইউক্রেনের ঐক্য ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।

 

জাহাজ আটক করে আর্থিক বাজারে চাপের মুখে পড়েছে রাশিয়া। রুশ মুদ্রা রুবেলের বিনিময় মূল্যও কিছুটা পড়ে গেছে। এই অবস্থায় নতুন নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে বাধ্য। বার্লিনে রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার গ্রুশকো বলেন, তার দেশের ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা চাপালে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না।

রাশিয়ার আচরণের প্রেক্ষাপটে ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন প্রকল্প ‘নর্ড স্ট্রিম-২’ চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে এই প্রকল্পের মদদদাতা হিসেবে জার্মানির মতো দেশ বিপাকে পড়েছে। পোল্যান্ডে পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশ পশ্চিমা বিশ্বকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবার ডাক দিচ্ছে। তাদের মতে, প্রয়োজনে এই পাইপলাইন প্রকল্পও বাদ দিতে হবে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হেদার নাউয়ার্টও এই প্রকল্পের সমালোচনা করেন। তার মতে, রাশিয়ার সরকারের লাভ হয় এমন কোনো প্রকল্পের মদদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে উত্তেজনা সম্পর্কে তিনি উদ্বিগ্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসন পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি জি-২০ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকও বাতিল করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পিও সরাসরি রাশিয়ার পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। রাশিয়ার দাবি, জাহাজগুলো বেআইনিভাবে রাশিয়ার জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউক্রেনকেই এই সংকটের জন্য দায়ী করেছে। মস্কোর দাবি, রাশিয়ার ওপর আরো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা চাপানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত প্ররোচনার মাধ্যমে ইউক্রেন এমন সংকট সৃষ্টি করেছে। উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার গ্রুশকোর মতে, ইউক্রেনই দেশের পূর্বাঞ্চলে মিনস্ক চুক্তি বানচাল করতে প্ররোচনা সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার গুপ্তচর সংস্থা এফএসবি তার প্রমাণ হিসেবে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনে সামরিক শাসন জারি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউক্রেন অবশ্য যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রেসিডেন্ট পোরোশেঙ্কোর অভিযোগ, ক্রিমিয়ার পর এবার পুরো ইউক্রেন দখল করতে চান প্রেসিডেন্ট পুতিন। তিনি সোভিয়েত আমলের মতো সাম্রাজ্য গড়তে চান। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট পোরোশেঙ্কো ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এই  মুহূর্তে নিজেদের দেশে চাপের মুখে রয়েছেন। তাদের জনপ্রিয়তাও কমে চলেছে। এই অবস্থায় এমন সংঘাত তাদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।