পররাষ্ট্র নীতির প্রেসিডেন্ট

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২৪

 

জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের (সিনিয়র) মতো কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে হোয়াইট হাউসে খুব কম প্রেসিডেন্টই এসেছেন। কর্মজীবনে বীরযোদ্ধা ও বড় তেল ব্যবসায়ী ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র প্রধান, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে দুইবার ভাইস প্রেসিডেন্টও ছিলেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত মাত্র এক দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। কিন্তু ওই সময়েই আন্তর্জাতিক পরিসরে একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনায় তাকে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের অবসান এবং ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলের ঘটনা তার সময়েই। যেগুলো তিনি অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতায় সামলেছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ইউরোপের কারিগর প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশই। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি পররাষ্ট্র নীতিতে দক্ষ সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট!

পলিটিকো ম্যাগাজিনের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইতিহাস ও রাজনীতিতে ভাগ্যের ভূমিকা নিয়ে হয়তো অনেক কিছুই লেখা হয়েছে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, পশ্চিমা বিশ্বকে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করতে হবে কারণ ১৯৮৮ সালে বুশ প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। বিশেষ করে জার্মানির সৌভাগ্য যে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ছিলেন সিনিয়র বুশ।

তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া ও চীন সব দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বুশ শুধু কূটনীতি জানতেনই না বরং এটা ‘এনজয়’ও করতেন। তার যোগাযোগ ও দক্ষতাই বিশ্বের অনেক নেতাও সফল হয়েছিলেন। বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গে বুশের সমানুভূতিই ছিল এ সফলতার মূল।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ব্লকে ব্যাপক অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়। তবে ওই বছরের ৯ নভেম্বর বার্লিন প্রাচীরের পতনকে মানিয়ে নিতে প্রস্তুত ছিল না ইউরোপ এবং বিশ্ব। যে কারণে এ ঘটনা একটি ধাক্কা হয়ে এসেছিল। মস্কোও তখন অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায়। পশ্চিম ইউরোপের দেশ ব্রিটেন ও ফ্রান্স এই ঘটনাকে স্বাগত জানায়নি। এমনকি প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম প্রতিক্রিয়াও ছিল সংশয়পূর্ণ। ফ্রান্সের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোয়া মিত্তাররান্দ তখন পূর্ব ইউরোপ সফর করেছিলেন দুই জার্মানির একত্রীকরণ ঠেকাতে। এ ঘটনায় ওয়াশিংটনেও মতভিন্নতা দেখা দেয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের অনেকের মধ্যে সন্দেহ দানা বাধতে শুরু করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি ওই মুহূর্তের সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ছিলেন চ্যান্সেলর হেলমুত কোল। পরবর্তীতে জার্মানি একত্রীকরণে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন প্রেসিডেন্ট বুশ। পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের পর যিনি বলেছিলেন, নতুন এক সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, মুক্তির গন্ধ নিয়ে এক নতুন পৃথিবীর জন্ম হচ্ছে। জার্মানির পুনঃএকত্রীকরণের বড় পদক্ষেপ ছিল সিসিক সামিট। ওই বছরের ২ ডিসেম্বর মাল্টায় সোভিয়েত জাহাজে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্ভাচেভের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বুশ। ৪ ডিসেম্বর বুশ সরাসরি ন্যাটো হেড কোয়ার্টারে চলে যান। সেদিনই এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিবৃতি পড়ে শোনান প্রেসিডেন্ট বুশ। সেখানে তিনি ঘোষণা দেন, জার্মানরা অবশ্যই মত প্রকাশের মাধ্যমে জার্মানির ভবিষ্যত্ নির্ধারণ করবে। মিত্রকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা থাকবে একত্রিত জার্মানির। এই ছোট বিবৃতিই ইউরোপের ভবিষ্যত্ নির্দিষ্ট করে দেয়। পরবর্তীতে গর্ভাচেভ নিজেই স্বীকার করেন যে, ব্যক্তিগত আলাপে কতটা সম্মান তাকে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশ। কিভাবে সব সহজ করেছিলেন তিনি।

নিবন্ধে আরো বলা হয়েছে, প্রায় একই সময়ে সংগঠিত প্রথম গালফ যুদ্ধে বুশের ভূমিকার কথা ভুলে যাওয়া  উচিত হবে না। সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলের পর তাকে সেখান থেকে হটাতে বুশই আন্তর্জাতিক এক সামরিক কোয়ালিশন তৈরি করেন। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের এই বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট পরলোম গমন করেন। জন অ্যাডামসের পর তিনিই হলেন দ্বিতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যার ছেলেও প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। বহির্বিশ্বে ভূমিকার জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি, কিন্তু তার বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হয় যে, তিনি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন দিচ্ছেন না। ১৯৯২ সালের নির্বাচনে তিনি বিল ক্লিনটনের কাছে পরাজিত হন। প্রেসিডেন্ট পদে হারলেও তার কর্ম হারিয়ে যায়নি। এখনো তার গড়া অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুশ দেখিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র তখনই ‘মহান’ হতে পারবে, যখন তাদের অংশীদার ও মিত্রদের যথাযথ সম্মান দেখানো হবে।