২২ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ

উত্তরে শীত বাড়ছেই

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩৯

দেশের উত্তরের জেলাগুলোতে শীতের তীব্রতা প্রতিদিন বাড়ছে। গতকাল বেড়েছে শীতের বিস্তার। বৃহস্পতিবার ৯ জেলায় এবং শুক্রবার ১৭ জেলার শৈত্যপ্রবাহ গতকাল বিস্তৃত হয়েছে ২২ জেলায়। কোথাও কোথাও রূপ নিয়েছে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে। সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় টানা দুই দিন যাবত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। উত্তরের অধিকাংশ জেলায় তাপমাত্রা ৭-১০ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। শীতের তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে দেশের বেশির ভাগ অঞ্চল।

বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় গত এক সপ্তাহ ধরে দিনে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। মানুষের পাশাপাশি প্রাণীকুল ও গবাদি পশু শীতে কাবু হয়ে পড়েছে। শীতের কারণে হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ঘন কুয়াশা আর কনকনে শীতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বোরো ধানের বীজতলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। সূর্যের আলো ঠিকমতো না পাওয়ায় বোরোর বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এরই মধ্যে হলুদ ও ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে ধানের চারা। যদিও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো বীজতলার ক্ষতি হওয়ার মতো পরিবেশ হয়নি। মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর রেখে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

কৃষকেরা বলছেন, বোরো ধানের বীজ বুনলেও প্রচণ্ড কুয়াশা আর শীতের কারণে গজাচ্ছে না চারা। কিছু চারা গজালেও মরে যাচ্ছে। এভাবে যদি চারা মরে যায়, তাহলে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। আবার চারা রোপণ করতে দেরি হয়ে যাবে। তাতে ভালো ফলন পাওয়া যাবে না। ধানবীজ ছাড়াও একইভাবে আলু, টম্যাটো, শিম, বেগুনসহ অন্যান্য ফসলেরও ক্ষতি হচ্ছে বলে বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকেরা জানান। ফসল রক্ষায় প্রয়োজনীয় বালাইনাশক স্প্রে করেও সুফল পাচ্ছেন না কৃষকেরা।

এদিকে  আজ রবিবার শীতের আরও বিস্তার ঘটতে পারে বলে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়ে বলেছেন, আজ চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের সাতটি বিভাগে শৈত্যপ্রবাহ অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। চলমান এই শৈত্যপ্রবাহ আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর বুধবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় আবারও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হতে পারে।

গতকাল আবহাওয়া দপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মৌলভীবাজার, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা জেলাসহ রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। আজ মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং দেশের অন্যত্র কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা পড়তে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন চলাচল ব্যাহত হতে পারে। সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুক্রবার মৌসুমে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল এই তেঁতুলিয়ায় ৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেঁতুলিয়ায় কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা ৭ থেকে ১০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানান, উত্তরের শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে। আর সব জায়গা থেকে শৈত্যপ্রবাহ এখনই যাবে না। আর এক থেকে দুই দিন থাকবে। এরপর তাপমাত্রা একটু করে বাড়বে। তিনি বলেন, ৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে অস্থায়ীভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কোথাও কোথাও ২ ফেব্রুয়ারিও বৃষ্টি হবে। বৃষ্টিপাতের পর তাপমাত্রা একটু কমতে পারে। আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ গতকাল জানান, আজ রবিবার দেশের সাতটি বিভাগের (চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য সব বিভাগ) ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের উত্তরের জেলাগুলোর ওপর আজ সকাল ৬টার সময় তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। চলমান এই শৈত্যপ্রবাহ আগামী মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) পর্যন্ত অব্যাহত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে আবারও বাংলাদেশের মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে আগামী বুধবার ৩১ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে।

জয়পুরহাট প্রতিনিধি শাহাদুল ইসলাম সাজু জানান, জয়পুরহাটে শনিবারও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত সাত দিন ধরে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে থাকায় জেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ঘন কুয়াশার সঙ্গে শৈত্যপ্রবাহে মাঘের হাড় কাঁপানো শীতে জনজীবন একেবারেই বিপর্যস্ত ও জবুথবু হয়ে পড়েছে জয়পুরহাটের সাধারণ মানুষ। কনকনে ঠাণ্ডা আর হাড় কাঁপানো শীতে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার নাজেহাল অবস্থা।

রাজশাহী থেকে আনিসুজ্জামান জানান, রাজশাহী অঞ্চলে গতকাল শনিবার মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে। এই অঞ্চলে চলতি মৌসুমেরও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বলে জানিয়েছে স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার। রাজশাহী অঞ্চলে বেশ কয়েক দিন থেকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ চলছিল। পাশাপাশি ওঠানামা করছিল তাপমাত্রার পারদ। এর আগে গত মঙ্গলবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার তাপমাত্রা কিঞুটা বাড়লেও শুক্রবার থেকে তাপমাত্রা আবারও কমে যায়। চলমান মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ পুরো উত্তরাঞ্চলে চলছে। ফলে বিপাকে পড়ছে ছিন্নমূল ও ভাসমান লোকজন। সাধ্যমতো শীত নিবারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে শীতার্তরা।

দিনাজপুর:স্টাফ রিপোর্টার মতিউর রহমান জানান, টানা দু’দিন ধরে দিনাজপুরে তাপমাত্রা মাপযন্ত্রের পারদ রয়েছে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। গতকাল শনিবার দিনাজপুরে তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। অব্যাহত রয়েছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। হাড় কাঁপানো কনকনে শীতে কাবু দিনাজপুরসহ উত্তর জনপদের মানুষ।

এদিকে অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহ, উত্তরের হিমেল বাতাস আর কনকনে শীতে কাবু হয়ে পড়েছে দিনাজপুরসহ এই জনপদের মানুষ। ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষ রয়েছে চরম দুর্ভোগে। আর সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। সকালে কাজের সন্ধানে বের হয়ে অনেকেই কাজ না পেয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। আর যারা কাজ করছে তীব্র শীতে তারা বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছে না।

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি রুবাইত-বিন-আজাদ সুস্থির জানান, চুয়াডাঙ্গায় কনকনে শীত, ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় তাপমাত্রা নেমেছে ৮ ডিগ্রিতে। গতকাল শনিবার ভোরে কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হালকা রোদের দেখা মেলে। একই সঙ্গে মৃদু শৈতপ্রবাহ অব্যাহত ও হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। টানা শীতে মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে একপ্রকার স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু শ্রমজীবী মানুষ, কনকনে শীত উপেক্ষা করেই কাজে নেমে পড়েছে তারা। তীব্র শীতে রোটাভাইরাসের কারণে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বেশির ভাগই শিশু। শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ শীতজনিত বিভিন্ন রোগে হাসপাতালের বহির্বিভাগে ৪৫০-৫০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সদর হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আতাউর রহমান।

অনিল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, দেশের উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর মানুষ মাঘের শীতে কাবু হয়ে পড়েছে। এ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু ও মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। কনকনে ঠাণ্ডা ও শীতের দাপটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়ে পড়েছে। ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে গোটা জনপদ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া লোকজন ঘরের বাইরে যাচ্ছে না। ফলে সবচেয়ে চরম বিপদে পড়েছে খেটে খাওয়া দিনমজুরসহ নিম্ন আয়ের মানুষ।

গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় এ উপজেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। গত শুক্রবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা নিম্নগামী হওয়ায় শীতে ধরলা ও বারোমাসিয়াসহ বিভিন্ন নদনদী তীরবর্তী চরের মানুষজন। ঘন কুয়াশার সঙ্গে হিমেল হাওয়া বাড়িয়ে দিচ্ছে শীতের তীব্রতা। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার হাত থেকে রক্ষা পেতে মানুষজন খড়কুটো জ্বালিয়ে একটু উষ্ণতা নিচ্ছে।

ঠাণ্ডার তীব্রতায় প্রতি ঘরে ঘরে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশিসহ শীতজনিত রোগে হাসপাতালেও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

ইত্তেফাক/এমএএম