ইতিহাস ও ঐতিহ্যে মোড়ানো ডিএমপি সদর দপ্তর

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৪, ২২:০৯

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মূল লাল ভবনটির নির্মাণ সমাপ্ত হয় ১৯১০ সালে। ঢাকার পুরনো বনেদী বাড়িগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এ অঞ্চলের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি। প্রখ্যাত ব্যক্তিদের স্মৃতির পরশ মিশে আছে এর প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে। 

১৯৭৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিষ্ঠালগ্ন হতেই ভবনটি এর সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি এক সময় ছিল একটি সরকারি বাসভবন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকাররা, পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম আইজিপি এ বাড়িতে বসবাস করেছেন। এটি এক সময় স্পিকার ভবন নামেও পরিচিত ছিল। বৃটিশ ভারতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক স্বনামধন্য শিক্ষকও এখানে থেকেছেন।

রমনা এলাকার আরও কিছু বিলাসবহুল ভবনের সঙ্গে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। মুঘল আমলে ১৬১০ সালে রমনার গোড়াপত্তন। রমনা নামটিও তাদের দেওয়া। শাহবাগ, পুরনো হাইকোর্ট, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিন্টো রোড সংলগ্ন এলাকা পুরনো রমনায় পড়েছে। পুরো এলাকাটিতে মুঘলরা তৈরি করেছিল বিশাল বাগান, যার নাম দেওয়া হয়েছিল বাগ-ই-বাদশাহী। বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানটি ছিল তখন সবুজ ঘাসে ঢাকা একটি চত্বর। কেবল সেই চত্বরটির নাম ছিল রমনা। পরে আশপাশের এলাকাও এ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। কোম্পানি আমলে ১৮২৫ সালের দিকে তৎকালীন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস জেলের কয়েদীদের নিয়ে এলাকাটি আরও পরিষ্কার করে মনোরম রূপ দেন। ১৮৪৪ সালের দিকে রমনার মালিকানা কিনে নিতে শুরু করেন ঢাকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আবদুল গনি; পরবর্তী সময়ে যিনি নবাব আবদুল গনি। 

১৮৬০ সালের দিকে নবাবরা এলাকাটির আরও উন্নয়ন ঘটান। ১৯০৫ সালের অক্টোবর মাসে এ উপমহাদেশে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। প্রদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব রাতারাতি বেড়ে যায়। নবগঠিত প্রদেশের জন্য একজন ছোটলাট, একটি ব্যবস্থাপক পরিষদ এবং রাজস্ব বোর্ডের ব্যবস্থা করা হয়। নতুন নতুন ভবন তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয়। ২৭নং ভবনটি সে পরিকল্পনারই ফসল। রমনার অনেকটা অংশ নবাবদের থেকে সরকার নিয়েছিলেন নতুন রাজধানী নির্মাণের জন্যে। এলাকাটির নাম দেওয়া হয়েছিল সিভিল স্টেশন।

মুঘল স্থাপত্য এবং ভিক্টোরিয়ান রীতির সাথে দেশীয় রীতির সংমিশ্রণে যে স্থাপত্যের ধারা তখন ঢাকায় সৃষ্টি হয় তারই স্পষ্ট ছাপ রয়েছে ভবনটিতে। শয়ন কক্ষগুলোতে ছিল ফায়ার প্লেস। গাড়ি বারান্দাটিও বেশ বড়। দোতলায় প্রশস্ত এবং দীর্ঘ বারান্দা। এগুলো ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের ফলশ্রুতি। ভবনের সামনে থামগুলো উপরের দিকে খিলানের রূপ দিয়েছে যা মুসলিম স্থপত্যের পরিচায়ক। দ্বিতল এ বাড়িটিতে রয়েছে ছোট বড় ১৭টি কক্ষ, প্রশস্ত বারান্দা, সামনে পিছনে প্রশস্ত বাগান। দোতলায় ওঠার কাঠের সিঁড়ি এখনো অক্ষত আছে।

বঙ্গভঙ্গের শুরু থেকেই এর পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আন্দোলন হয়। এর ফলে প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঢিমেতাল পরিলক্ষিত হয়। ভবনটির নির্মাণ পরিকল্পনা ১৯০৫ সালের দিকে হাতে নিলেও এটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয় ১৯১০ সালে। ব্যাপক বিরোধিতার মুখে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর সম্রাট জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। একই বছর ভারতের রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয় এবং কলকাতা অবিভক্ত বাংলার রাজধানী হিসেবে থেকে যায়। নবগঠিত প্রদেশ বাতিল হওয়ার সাথে সাথে ঢাকাও তার গৌরব হারায়। 

পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের বড় বড় সাহেবরা বাড়িটিতে থাকতে না পারলেও তৎকালীন ঢাকায় অবস্থানরত দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা বাড়িটি ব্যবহার করেছেন। কিছুদিন পরে বাড়িগুলো সরকার ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজকে ভাড়া দিয়ে দেন। কলেজ দুটির অধ্যাপক-কর্মকর্তারা বাড়িটি তখন ব্যবহার করেছেন। বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার আশাহত মুসলমানদের শান্ত করার জন্য বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন এবং ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেন। একই বছর ২ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার এক ইশতেহারে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব করেন। পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯২১ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব প্রয়োজনে রমনার সিভিল স্টেশনের বাড়িগুলো নিয়ে নেয়।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হিসেবে ঢাকা আবার তার হৃতগৌরব ফিরে পায়। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন সমস্যার জন্য সরকার এ সব ভবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিকুইজিশন করে নেয়। ২৭ নম্বর পার্ক এভিনিউর বাড়িটি এভাবে আবারও আসে সরকারি কর্তৃত্বাধীনে। বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বাড়িটিতে তখন বসবাস করেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম আইজিপি জাকির হোসেনও এ বাড়িটিতে থেকেছেন।

১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ রাতে জেনারেল ইয়াহিয়া খান দ্বিতীয়বারের মতো সমগ্র পাকিস্তানে মার্শাল ল’ জারি করেন। বাড়িটির বিস্তৃত বাগান পরিচর্যাকারী মালী দেলোয়ার, ইলেকট্রিশিয়ান আলম একদিন ভোরে বাড়িটি পরিত্যক্ত দেখতে পান। গণপূর্ত বিভাগের লোকজন বাড়িটি তালাবদ্ধ করে রাখেন। হঠাৎ একরাতে তালা ভেঙে কে বা কারা বাড়িটির মূল্যবান আসবাবপত্র এবং ফিটিংস লুট করে নিয়ে যায়। পরবর্তী যুদ্ধকালীন বাড়িটি অরক্ষিত ও নির্জন ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১ মার্চ তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানী এ বাড়িটিতে উঠেন। তখন বাড়িটিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়। নিরাপত্তার জন্যে ভবনটির পিছনে নতুন গার্ডরুম তৈরি করা হয়। খোলা প্রশস্ত বারান্দা নেট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর এ বাড়িতে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুর রব সেরনিয়াবাত। সপরিবারে বসবাসের সময় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি এ বাড়িতেই নির্মমভাবে শহিদ হন। 

দুদিন পরই ছিল আবদুর রব সেরনিয়াবাতের মেয়ের বিয়ে। সেরনিয়াবতের ছেলে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ অনুষ্ঠানকে হৃদয়গ্রাহী করার জন্য বরিশাল হতে নিয়ে আসেন প্রায় দশজনের একটি সাংস্কৃতিক দল। এদিকে আবার ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় সেরনিয়াবাত তার প্রয়াত শাশুড়ির আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মিলাদের আয়োজন করেন। লালবাগ মসজিদের ইমামকে ডেকে আনা হয়। বাদ মাগরিব মিলাদের কথা থাকলেও অনেক রাত হয়ে যায় সেরনিয়াবাতের বাড়ি ফিরতে। লুঙ্গি এবং গেঞ্জি পরা সেরনিয়াবাত ছোট নাতনীকে (আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর ছেলে, বয়স ৫ বছর) কোলে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে মিলাদে শরীক হন। মিলাদ হয় নিচ তলায় সিঁড়ি সংলগ্ন বড় কক্ষটিতে। 

সাংস্কৃতিক দলের সকলে, মালী, গার্ডসহ সকল কর্মচারী এবং পরিবারের সকল সদস্য মিলাদ শেষে করে ঘুমাতে যান। ফজরের নামাজের পর পরই মেশিনগানের বিকট আওয়াজ। কেঁপে উঠে পুরো ভবনটি। ঝাঁঝরা হয়ে যায় বাড়িটির দেয়াল। আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে বেডরুমে গুলি করে হত্যা করা হয়। আদরের শিশু নাতনী কিছুতেই তাকে ছাড়বে না। বুলেটের আঘাত শিশুটিকেও স্তব্ধ করে দেয়। কাজের এক বৃদ্ধা মহিলা সেরনিয়াবাতের পরিবারে অনেক দিন ধরে ছিলেন। মনিবকে সে জড়িয়ে ধরে বাঁচানোর জন্য। সেও এ হত্যাকাণ্ড থেকে রেহাই পায়নি। জ্যেষ্ঠপুত্র আবুল হাসনাত বাড়ির এক কোণে লুকিয়ে থেকে রক্ষা পান। সাংস্কৃতিক দলের সদস্যসহ পরিবারের প্রায় সবাই কমবেশি আহত হন। অনেকেই দৌড়ে ভবনের পিছনে ধানক্ষেতে শুয়ে থাকেন। ভবন কম্পাউন্ডের পিছনের দিকে তখন ধানের চাষ করা হয়েছিল। পরদিন ভোরে মালী দেলোয়ার ভবনের সীমানা সংলগ্ন কুটির হতে বেরিয়ে এসে মাঠে নিহত ব্যক্তিদের লাশের স্তুপ দেখে শিউরে উঠেন। তৎকালীন রমনা থানার ওসি আনোয়ার (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত) সবগুলো লাশ পুলিশ ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িটির সব সদস্য ভয়ে পালিয়ে যান। বুলেটের চিহ্ন নিয়ে বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়। গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা আবারও বাড়িটিতে তালা লাগিয়ে দেন। এরপর বাড়িটি তৎকালীন বিডিআর প্রধানের নামে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারও করা হয়। ক্ষতবিক্ষত কক্ষগুলো পুনঃনির্মাণ করা হয়। চারপাশের নিচু দেয়াল বেশ উঁচু করে পুনঃনির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ বরাদ্দ বাতিল করে ১৯৭৬ সালের ২৬ জানুয়ারি বাড়িটি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে হস্তান্তর করা হয়। একই সালে ১ ফেব্রুয়ারি ডিএমপি প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কমিশনার এবং ডিসি (সদর দপ্তর) বাড়িটিতে প্রথম দাপ্তরিক কাজ শুরু করেন। 

রমনার স্মৃতি বিজড়িত বাড়িগুলোর মধ্যে ২৭ নম্বর পার্ক এভিনিউর বাড়িটি অন্যতম। এটি কর্মচঞ্চল ডিএমপির মূর্ত প্রতীক। বাড়িটিতে এক সময় উড়েছিল বৃটিশ পতাকা, তারপর পাকিস্তানের পতাকা, এখন উড়ছে রক্তে কেনা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ১৯৭৬ সাল থেকে জাতীয় পতাকার পাশে স্থান করে নিয়েছে ডিএমপির পতাকা। কালের করাঘাতে ভবনটি প্রায় ভগ্নদশায় উপস্থিত হলেও এর গৌরবময় ঐতিহ্য ডিএমপির প্রতিটি সদস্যের জন্যে গর্বের বিষয় হয়ে আছে। 
 
লেখক: পুলিশ সুপার, নৌ পুলিশ, সিলেট অঞ্চল  

ইত্তেফাক/পিও