বাল্যবিবাহ আমাদের দেশে একটি সামাজিক ব্যাধি। বর্তমান আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি বাধা হচ্ছে এই বাল্যবিবাহ। সাধারণত অপ্রাপ্ত বয়সে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বিবাহকে বাল্যবিবাহ বলে। বাংলাদেশের আইনে ১৮ বছর বয়সে মেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং ২১ বছর বয়সে ছেলেরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এই বয়স কম হতে পারে। বাল্যবিবাহ সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রেই বেশি হয়। অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই এর হার বেশি। আমাদের বাংলাদেশে এই বাল্যবিবাহের হার আগের তুলনায় কমলেও সন্তোষজনক নয়। জাতিসংঘের ইউনেস্কোর সর্বশেষ এক প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ৫৯ শতাংশ। কিন্তু সরকারি হিসাবমতে এই হার ৫২ শতাংশ। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে ৪র্থতম। আর সংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের পরেই ২য় অবস্থানে। বাংলাদেশে প্রায় ৩৯ লাখ ৩৪ হাজার মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়েছে। এটা আমাদের দেশের জন্য সুখবর নয়। কারণ যেখানে আমরা উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি সেখানে নারীর এই বাল্যবিবাহ কাম্য নয়। কারণ যেকোনো দেশ উন্নত হওয়ার পেছনে নারীর ক্ষমতায়ন অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অনেকগুলো কারণ রয়েছে; যেমন-অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, দরিদ্রতা ইত্যাদি। সাধারণত দরিদ্র পরিবার তাদের কন্যাসন্তানকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করে অল্প বয়সে অযোগ্য পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কারণ বাল্যবিবাহ মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অল্প বয়সে বিবাহের কারণে অল্প বয়সেই মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে যায়, যা তাদের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই অবস্থার উত্তরণের জন্য চাই সামাজিক সচেতনতা। কারণ সামাজিকভাবে প্রতিরোধ ছাড়া এটা নির্মূল সম্ভব না। আইন করে হয়তোবা এর হার কিছুটা কমানো যাবে, কিন্তু সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করার জন্য আমাদের গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায়, শহরে প্রতিরোধ গড়তে হবে সামাজিকভাবে। এর জন্য তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ তরুণ সমাজ যেখানে এগিয়ে আসে সেটার সফলতা নিশ্চিত থাকে। তাই তরুণ সমাজকে দায়িত্ব নিয়ে তাদের প্রত্যেকের জেলায় এই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তাদেরকে নিজ জেলায় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় গিয়ে সেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে সভা বা সেমিনার করতে হবে। বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে এলাকায় মাইকিং করতে হবে, বিলিপত্র দিতে হবে, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সচেতন মানুষদের সঙ্গে নিয়ে এলাকাবাসীকে সচেতন করতে হবে। তাহলেই কেবল এই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্ভব। স্থানীয়ভাবে যারা গরীব, অসচ্ছল তাদের একাধিক সন্তান থাকলে তার মধ্যে কন্যাসন্তানের লেখাপড়ার দায়িত্ব এলাকার বিত্তবান ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিতে হবে। তাহলে সেই পিতা কন্যাকে বোঝা হিসেবে নিবে না। আর দেশের সব জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। যাতে করে কোনো পরিবার এটা না ভাবে যে তাদের বৃদ্ধকালে পুত্রই একমাত্র সম্বল। নারী হচ্ছে পরের বাড়ির সম্পদ—এই ধারণা থেকে তাদের মুক্ত করার জন্য দেশের সব সেক্টরে নারীকে অংশগ্রহণ করাতে হবে। এবং যে পরিবার তাদের সন্তানকে বাল্যবিবাহ করাবে সেই পরিবারকে সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখতে হবে। তাতে তারা অনুতপ্ত হবে এবং অন্যেরা শিক্ষা নেবে। আমাদের দেশ এখন ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে নাম লেখানোর জন্য এগিয়ে যাচ্ছে। এই পথে সফলতার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ দূর করে নারীকে স্বাধীনভাবে তার জীবন নির্বাহ করতে দেওয়া। তাহলেই আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবো। মনে রাখতে হবে আমাদের দেশে প্রথম থেকেই আইন আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব হয়নি। তাই আমরা তরুণ সমাজ যদি উদ্যোগী হয়ে নিজ নিজ এলাকায় সংঘবদ্ধ হয়ে এই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি তাই এই ক্ষেত্রে অবশ্যই সফলতা আসবে। আমাদের প্রত্যেককে বাল্যবিবাহ মুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নারীকে স্বাধীনভাবে তার কর্ম পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। আসুন আমরা সকলে মিলে এই সমাজ থেকে বাল্যবিবাহের মত একটি সামাজিক ব্যাধিকে দূর করি এবং সুখী সমৃদ্ধ স্বদেশ গড়ি।
n লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
