সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পদক্ষেপ

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৯, ২০:৪৩

মোজাহেদুল ইসলাম

 

সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে এখন তোলপাড় সারা বিশ্বে। যে কেউ কোনো বিষয়ে যা খুশি বলে দিতে পারে সোশ্যাল মিডিয়ায়, নিয়ম কানুনের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে। কিছু দিন আগে নিউজিল্যান্ডে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসবাদী হামলা চালিয়ে ৫০ জনকে হত্যার ঘটনা যেভাবে ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিমিং করা হলো—সেটা নিয়ে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ধিক্কার উঠেছে বিশ্বজুড়ে।

বিভিন্ন রাষ্ট্রেই এখন চেষ্টা চলছে কীভাবে বড়ো বড়ো সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া কাজকর্মের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়। এটিকে আবার অনেকে দেখছেন মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের চেষ্টা হিসেবে।

 

ব্রিটেন

সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব করেছে। এর উদ্দেশ্য, ক্ষতিকর কোনো ‘কনটেন্ট’ কোনো সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তার জন্য কোম্পানির কর্মকর্তাদেরও যেন দায়ী করা যায়।

ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নিয়ম ভঙ্গকারী সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের জরিমানা থেকে শুরু করে তাদের সেবা পুরোপুরি বন্ধ বা ব্লক করে দেওয়ার কথাও রয়েছে।

ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার থেকে শুরু করে নানা ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া যারা ব্যবহার করেন, তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের কথা ভাবছে। এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে এজন্যে আলোচনা-পরামর্শ গ্রহণ চলেছে ১ জুলাই পর্যন্ত।

ব্রিটেনের বর্তমান আইনে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।

ব্রিটিশ সংস্কৃতি মন্ত্রী মারগট জেমস জানান, এই অবস্থান পরিবর্তন দরকার। তিনি চান, ব্রিটেনে এমন আইন তৈরি করা হোক, যাতে করে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো বাধ্য হয় এরকম অবৈধ কনটেন্ট সরিয়ে নিতে।

 

জার্মানি

জার্মানিতে ২০১৮ সালের শুরু থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপারে এক নতুন আইন কার্যকর হয়। জার্মানিতে যেসব সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফরমের বিশ লাখের বেশি ব্যবহারকারি আছে, তারা সবাই এই আইনের আওতায় পড়বে। জার্মানির এই নতুন আইনে বলা আছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো কনটেন্ট সম্পর্কে কোনো অভিযোগ আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা তদন্ত এবং পর্যালোচনা করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো এর ফলে বাধ্য হয়েছে সেই ব্যবস্থা করতে।

কেউ যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কোনো কনটেন্ট শেয়ার করে যা এই আইনের বিরোধী, সেজন্যে তাকে ৫০ লাখ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকে জরিমানা করা যাবে পাঁচ কোটি ইউরো পর্যন্ত। জার্মানিতে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম বছরে ব্যবহারকারীদের দিক থেকে ৭১৪টি অভিযোগ আসে। অনলাইন প্লাটফরমের কাছে অভিযোগ করার পরও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আপত্তিকর পোস্ট সরিয়ে নেওয়া হয়নি বা ব্লক করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছিলেন এরা।

 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ইউরোপীয় ইউনিয়ন সোশ্যাল মিডিয়ায় আপত্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বিবেচনা করছে। বিশেষ করে জঙ্গিবাদে উত্সাহ যোগায় যেসব ভিডিও, তার বিরুদ্ধে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে জেনারেল ডাটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (জিডিপিআর) নামে এক নতুন আইন কার্যকর হয়েছে গত বছর থেকে। বিভিন্ন কোম্পানি এবং প্রতিষ্ঠান কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করবে, সে বিষয়েই মূলত এই আইন।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরেকটি আইনের প্রস্তাব করেছে, যেটি নিয়ে ইন্টারনেট কোম্পানিগুলো দুশ্চিন্তায় আছে। কেউ যদি কোনো সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফরমে কপিরাইট লঙ্ঘন করে কিছু পোস্ট করে, সেজন্য ঐ ব্যক্তি তো বটেই, সেই সঙ্গে অনলাইন প্লাটফরমকেও দায়ী করা যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে পূর্বের আইনে আপত্তিকর কনটেন্টের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর তা সরিয়ে নিলেই মামলা চুকে যেত।

 

অস্ট্রেলিয়া

গত ৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ায় এক কঠোর আইন চালু করা হয়েছে যাতে সহিংস এবং জঘন্য কোনো কিছু অনলাইনে শেয়ার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করলে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনে জেল-জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। জরিমানার অঙ্কটি বেশ বড়ো। কোনো সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির গ্লোবাল টার্নওভারের দশ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।

নিউজিল্যান্ডে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসবাদী হামলা চালিয়ে ৫০ জনকে হত্যার ঘটনা হামলাকারী যেভাবে ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিমিং করেছিল, তারপর অস্ট্রেলিয়া এই আইন চালু করল।

এর আগে ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনলাইন সেফটি আইন নামে আরেকটি আইনে একজন ‘ই-সেফটি কমিশনারের’ পদ তৈরি করা হয়। ই-সেফটি কমিশনার সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করতে পারেন আপত্তিকর কনটেন্ট সরিয়ে নিতে। এজন্যে তিনি সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকে ৪৮ ঘণ্টার নোটিশ দিতে পারেন। জরিমানা করতে পারেন পাঁচ লাখ ২৫ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত।

 

রাশিয়া

রাশিয়ায় ২০১৫ সালের ডাটা আইন অনুযায়ী সব সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকেই রুশ নাগরিকদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য রাশিয়াতেই কোনো সার্ভারে সংরক্ষণ করতে হয়। তবে ফেসবুক এবং টুইটার কীভাবে এই আইন মেনে চলবে সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে না পারায় রুশ কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

রাশিয়া-এর পাশাপাশি জার্মানির মতো একটা আইন করার কথা বিবেচনা করছে যেখানে আপত্তিকর কনটেন্ট সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা এটা করবে না তাদের বিরুদ্ধে জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে।

 

চীন

টুইটার, গুগল বা হোয়াটসঅ্যাপ চীনে নিষিদ্ধ। তবে সেখানে একই ধরনের কিছু চীনা অনলাইন প্লাটফরম আছে। যেমন— ওয়েইবো, বাইদু এবং উইচ্যাট। চীনে কিছু ভাচয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক আছে। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ সেগুলোর ব্যবহারও সীমিত করে দিতে সক্ষম হয়েছে।

চীনের সাইবার স্পেস অ্যাডিমিনিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগের ছয় মাসে তারা ৭৩৩টি ওয়েবসাইট এবং নয় হাজারের বেশি মোবাইল অ্যাপ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে এগুলোর বেশিরভাগই আসলে জুয়া খেলার বেআইনি সাইট বা অ্যাপ।

চীনের হাজার হাজার সাইবার পুলিশ আছে। এরা ২৪ ঘণ্টাই নজরদারি চালায় সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফরমের ওপর।

সূত্র : বিবিসি