বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন

নির্বাচনের পর কমিটি নিয়ে তোড়জোড়

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:০০

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা যুবলীগের ২১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গত ৩১ জানুয়ারি ঘোষণা করা হয়েছে। জামায়াত-বিএনপির সংশ্লিষ্টতা, টেন্ডারবাজি, নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িতরা এই কমিটিতে স্থান পেয়েছেন বলে লিখিত অভিযোগ করে জেলা যুবলীগ বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। যার অনুলিপি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের কাছে পাঠানো হয়েছে। 

লিখিত অভিযোগটি করেছেন কমিটির এক নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্যরা। যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল উদ্দিন চৌধুরীসহ ১৬ জন সদস্য উক্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও অনাস্থা প্রদান করে আগামী সাত দিনের মধ্যে ঘোষিত কমিটি স্থগিত করে সম্মেলনের মাধ্যমে একটি সুন্দর কমিটি উপহার দেওয়ার দাবি জানান। এদিকে ঘোষিত সেনবাগ উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি প্রত্যাখ্যান করে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করেছেন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এমরান হোসেন চৌধুরী বাবু, আতিকুর রহমান পলাশ, মিজানুর রহমান মিঠু, মহিন উদ্দিন, দিদারুল ইসলাম। এ সময় লিখিত বক্তব্যে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এমরান হোসেন চৌধুরী বাবু অভিযোগ করে বলেন, সেনবাগ উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জামায়াত-বিএনপির সংশ্লিষ্টতা টেন্ডারবাজসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।

শুধু সেনবাগই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই ধরনের অভিযোগ আসছে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর তৃণমূল কমিটি নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। তবে কিছু কমিটিতে স্থান পাচ্ছেন বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্টরা। এমন অনেক অভিযোগ সহযোগী সংগঠনগুলোর কেন্দ্রে জমা পড়েছে। ক্ষমতার সুবিধা নিতে বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে প্রবেশের লাইন ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। আর তাদের সুযোগ করে দিচ্ছে আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। এমন অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা। তাদের অভিযোগ, সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্য দিয়েই সুবিধাবাদীরা বেশি অনুপ্রবেশ করছেন। এতে বিএনপি-জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী বা স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সদস্যরাও চোখের পলকে আওয়ামী পরিবারের সদস্য হয়ে যাচ্ছেন। বাগিয়ে নিচ্ছেন পদ-পদবিও। এ বিষয়ে গতকাল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দুই জন নেতা বলেন, ‘আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। আওয়ামী লীগে বা সহযোগী সংগঠনে জামায়াত-শিবির ও যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সদস্যদের নেওয়া হবে না। হয় তো দুই-একটা জায়গায় এমনটা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে প্রতিবেদন এলে ব্যবস্থাও নিচ্ছি।’ সহযোগী সংগঠনগুলো তো আওয়ামী লীগের বাইরে আলাদা কোনো নিয়মে চলতে পারে না। সুতরাং তাদের (সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের) আওয়ামী লীগের নিয়ম মানতে হবে।

জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ১৫ বছরের বেশি সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় দলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বিএনপি-জামায়াত, রাজাকার-আলবদরের সন্তান, ছাত্রদল ও শিবিরের প্রচুর নেতাকর্মীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তবে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকর্মী ভোল পালটে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। তবে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর মধ্য দিয়ে তাদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে। মূল দল আওয়ামী লীগে কিছুটা কড়াকড়ি থাকায় মূলত সহযোগী সংগঠনগুলোকে তারা প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আর অনুপ্রবেশকারীদের অধিকাংশই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। তাদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, নির্দেশনা থাকলেও বিষয়গুলো (আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ) থেমে নেই। বিশেষ করে, সহযোগী সংগঠনগুলো আরও বেশি সুযোগ করে দিচ্ছে সুবিধাবাদীদের। সহযোগী সংগঠনের নেতারা নিজেদের সুবিধার জন্যই মূলত অন্য দল থেকে আসা লোকজনকে জায়গা করে দিচ্ছেন। আবার ভালোভাবে দেখছেনও না, তারা কোথা থেকে আসছেন বা কেন আসছেন। পৃথক সংগঠন হওয়ায় জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদেরও এ বিষয়ে কিছু করার থাকে না। আবার কেন্দ্র থেকে এগুলো সব সময় জানাও সম্ভব হয় না।

আওয়ামী লীগের একশ্রেণির নেতাদের মাধ্যমেই দলের মধ্যেও অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে দলীয় সতর্ক অবস্থান থাকলেও অনুপ্রবেশ বন্ধ হচ্ছে না। গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে এবং এটি ব্যাপকভাবে আলোচিত। এই অনুপ্রবেশের কারণ কী—সেটাও দলের নেতাদের কাছে চিহ্নিত এবং অনুপ্রবেশ ঠেকাতে দল থেকে বারবার তাগিদও দেওয়া হচ্ছে। টানা ১৬ বছর দল ক্ষমতায় থাকার কারণে সুবিধাবাদীরা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে অনুপ্রবেশ করছেন। সুবিধাবাদীরা যাতে দলে ঢুকতে না পারেন, সেজন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন। তার পরও অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে এবং তাদের দ্বারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসসহ একের পর এক ঘটনা ঘটছে, যার দায় সরকার এবং আওয়ামী লীগের ওপর এসে পড়ছে।

আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগ। সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগও এখন অনুপ্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। ত্যাগী নেতাকর্মীর চেয়ে অনুপ্রবেশকারী ও বিত্তবান নেতাদের কদর বেশি। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে বিএনপিতে ভেড়েন, এমন নেতারা তাদের আশপাশে ঘেঁষার সুযোগ পান বেশি। স্বেচ্ছাসেবক লীগ এখন অনুপ্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে—দাবি করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনটির সম্পাদকীয় একটি পদে থাকা এক নেতা বলেন, বিএনপির সক্রিয় একজন নেতা এখন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। এছাড়া ছাত্রদল-ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামীর আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়া এক নেতাও এখন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতনকারী নেতা কীভাবে স্বেচ্ছাসেবক লীগে পদ পান?

আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভা ১০ ফেব্রুয়ারি

আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভা আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় গণভবনে অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশেষ বর্ধিত সভায় আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, জেলা/মহানগর ও উপজেলা/থানা/পৌর (জেলা সদরে অবস্থিত পৌরসভা) আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা, জাতীয় সংসদের দলীয় ও স্বতন্ত্র সদস্যরা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের দলীয় চেয়ারম্যানরা উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া সভায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার দলীয় মেয়ররা এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত থাকবেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিশেষ বর্ধিত সভায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।

ইত্তেফাক/এমএএম