বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:০০

ভাষার মাসে সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে লেখক-কবিদের কলমেও ঝরেছিল বারুদের স্ফুলিঙ্গ। মাতৃভাষাকে নিয়ে কবি-সাহিত্যিকরা অজস্র গল্প-কবিতা রচনা করেছেন। কবি সিকান্দার আবু জাফর লিখেছিলেন তার অমর কবিতা ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’। কবিতার শেষ লাইনগুলোতে লিখেছেন ‘অতীতের কোন নির্বাক একদার/ দেশের লোকের গর্ব-গৌরবের/ অশ্রু এবং রক্ত দানের/ ক্ষ’য়ে ঝ’রে-যাওয়া প্রেরণা মূল্য/ নিখিল জীর্ণ নিষ্প্রভ ইতিহাস/ একুশে ফেব্রুয়ারি।’ সে সময় রচিত আবুল হোসেনের কবিতার মধ্যেও উচ্চারিত হয় দেশপ্রেম ও জীবনমুখিতা। সমাজ ও রাষ্ট্রের উপনিবেশ-কবলিত রূপ কবিমানসকে সচেতন ও প্রতিবাদী করে তুলেছিল।

এখন ভাষা আন্দোলন নিয়ে দেশে-বিদেশে গবেষণা হচ্ছে। ভাষা আন্দোলনের আগে পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলার ওপর আঘাত হানতে শুরু করে। বশির আল হেলাল রচিত ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, ১৯৫০ সালের ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর নিখিল পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনের ওপর গুন্ডাদের আক্রমণ হয়েছিল। পাকিস্তান সরকার, প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। একই সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশসহ প্রচারমাধ্যম ও বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র উর্দু ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়। তাত্ক্ষণিকভাবে পূর্ব বাংলায় এ প্রস্তাবের বিরোধিতা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন বাংলাকে তাদের অনুমোদিত বিষয় তালিকা থেকে বাদ দেয় ও সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রা এবং ডাকটিকিট থেকেও বাংলা অক্ষর বিলুপ্ত করে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান মালিক উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বানানোর জন্য ব্যাপক প্রস্ততি গ্রহণ করেন। পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং ১৯৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ছাত্রদের একটি বিশাল সমাবেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়।

সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ বলেছেন, উর্দুকে যদি রাষ্ট্রভাষা করা হয় তবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ নিরক্ষর এবং সব সরকারি পদের ক্ষেত্রেই অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থনে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি সদস্যদের বাংলায় বক্তৃতা প্রদান এবং সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। বাংলাকে অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে ধীরেন্দ্রনাথ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি তোলেন। এ ছাড়াও সরকারি কাগজে বাংলা ভাষা, খাজা নাজিমুদ্দিন এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, ‘পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হোক।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান প্রস্তাবটিকে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে।’ অনেক বিতর্কের পর সংশোধনীটি ভোটে বাতিল হয়ে যায়। সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে অনেক বাঙালি মুসলমান সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত সংশোধনীটিকে সমর্থন করতে পারেননি। গণপরিষদের ঘটনার প্রথম প্রতিক্রিয়া শুরু হয় ঢাকায় ছাত্রদের একটি দল রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সচিবালয়ের সামনে নবাব আবদুল গণি রোডে পিকেটিংয়ে অংশ নেয়। তারা গণপরিষদ ভবন (ভেঙে পড়া জগন্নাথ হলের মিলনায়তন), প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউজ (বর্তমান বাংলা একাডেমি), হাইকোর্ট ও সচিবালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অফিস বর্জনের জন্য সবাইকে চাপ দিতে থাকে, ফলে বিভিন্ন স্থানে তাদের পুলিশের লাঠিচার্জের সম্মুখীন হতে হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা খাদ্যমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজল ও শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। এ বিক্ষোভ দমনের জন্য সরকার সেনাবাহিনী তলব করে। পূর্ব পাকিস্তানের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান (পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট) মেজর পীরজাদার অধীনে একদল পদাতিক সৈন্য নিয়োগ করে এবং স্বয়ং গণপরিষদে গিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনকে বাবুর্চিখানার মধ্য দিয়ে বের করে আনেন। বিকালে এর প্রতিবাদে সভা অনুষ্ঠিত হলে পুলিশ সভা পন্ড করে দেয় এবং কয়েক জনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, নুরুল ইসলাম, রওশন আলম, রফিকুল আলম, আব্দুল লতিফ তালুকদার, শাহ্ মো. নাসিরুদ্দীন প্রমুখ।

ইত্তেফাক/এমএএম