বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ফার্স্ট পোস্টের বিশ্লেষণ

ইমরান খানকে যেভাবে বাউন্সার দিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬:৪৬

পাকিস্তানের নির্বাচনের বাকি মাত্র আর দুই দিন। তবে নির্বাচনের আগেই মনে হচ্ছে ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গেছে। এই ফলাফল যে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আর তার দল পিটিআইয়ের জন্য খুব একটা সুখকর নয় তা অনুমেয়।

একসময় এস্টাব্লিশমেন্টের নীল-চোখের ছেলে হিসেবে বিবেচিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনুগ্রহ থেকে মারাত্মকভাবে রোষানলে পড়েছে ৭১ বছর বয়সী ইমরান খান। আর্মির পুরো ক্রোধ যেন এই সাবেক ক্রিকেট তারকার ওপর। এর প্রভাব নির্বাচনের আগে তার ও দলের ওপর সমানভাবে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, সেনাবাহিনীর ব্যবহার করা কৌশল অতীতে পরীক্ষিত এবং এর বাইরে কিছুই নয়। নির্বাচনের দৌড়ে এস্টাব্লিশমেন্ট কীভাবে ইমরান খানকে দৌড়ের বাইরে ঠেলে দিয়েছে এবং কী কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা আমরা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করি।

ইমরান খানের বিরুদ্ধে মামলা

২০২২ সালের এপ্রিলে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট ও ক্ষমতা থেকে অপসারণ, সবকিছুর পেছনেই পাকিস্তান আর্মির আঁতাত রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও স্বীকৃত। কেউ কেউ বলছেন, তার বিরুদ্ধে দাঙ্গা থেকে শুরু করে সন্ত্রাস পর্যন্ত ১৯০টির বেশি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তিনটি পৃথক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ও দীর্ঘ কারাদণ্ড পেয়েছেন। প্রথমটি ছিল গত মঙ্গলবার সাইফার মামলা যেখানে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁস করার অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এরছাড়াও ইমরান খানকে ২০২২ সালে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ইসলামাবাদে পাঠানো একটি সিরিজ সাইফার ফাঁস করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

খবরটি ছিল ইমরান খানের জন্য একটি ধাক্কা। তিনি ইতিমধ্যেই দুর্নীতির মামলায় রাওয়ালপিন্ডিতে তিন বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

এর প্রতিক্রিয়ায় ইমরান পরিস্থিতিকে ‘ফিক্সিং ম্যাচের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, এসমস্ত ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, বরং লন্ডনে বসে পরিকল্পনার ফসল যা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। ইমরান খান তার মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে লিখেছেন, সে কারণেই আমি এই মামলার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই জানি।

এর পরের দিন (৩১ জানুয়ারি) তোশাখানা মামলায় ১৪ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে ইমরান খান দ্বিতীয় আঘাত পান। উল্লেখ্য, এই মামলায় তার এখন ‘অবৈধ স্ত্রী’ বুশরা বিবিকেও একই সাজা দেওয়া হয়েছে। তোশাখানা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, ইমরান খান তোশাখানা থেকে উপহারগুলো রেখেছিলেন এবং সেগুলো বিক্রির বিবরণ ‘ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করেছিলেন’।

সাজা দেওয়ার সময় তার দলের মিডিয়া শাখা বলেছিল, ‘আমাদের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে আরেকটি দুঃখজনক দিন, যা ভেঙে ফেলা হচ্ছে।’ গত শনিবার (৩ ফেব্রুয়ারি), একটি স্থানীয় আদালত ইমরান খান ও বুশরা বিবিকে তাদের বিবাহ সংক্রান্ত একটি মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়। তাদের বিয়েকে ‘অ-ইসলামিক’ বলে ঘোষণা করে আদালত।

অনেক পর্যবেক্ষক বলেছেন যে তিনটি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ আর প্রতিটা মামলার লক্ষ্যবস্তু ইমরান খান। কারণ তিনি পাকিস্তানে এখনও জনপ্রিয়।

পিটিআইকে বিচ্ছিন্ন করা

ইমরান খানকে বন্দী করার পাশাপাশি পাকিস্তানের সামরিক কিংমেকাররা পিটিআইয়ের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ যাতে কম না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য অন্যান্য পদক্ষেপও নিয়েছে।

প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ তার বিখ্যাত ব্যাট প্রতীকটি ছিনিয়ে নিয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামাল দিয়েছে। একটি দেশে যেখানে নিরক্ষরতা একটি বিশাল সমস্যা, সেখানে একটি দলীয় প্রতীক হল লোকেদের তাদের প্রার্থীদের চেনার প্রধান উপায়।

যাইহোক, দলটি ক্রিকেট ব্যাট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার পাশাপাশি বেশিরভাগ পিটিআই প্রার্থী বাধ্য হয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে লড়ছে। সবার আলাদা প্রতীক। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতীক সরানোর মাধ্যমে পিটিআইয়ের দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছে সেনাবাহিনী।

স্বতন্ত্র হিসেবে এই প্রার্থীদের জয়ের পরে পিটিআই-এর সঙ্গে জোট করতে হবে না। তারা নির্বাচনের পর অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট করতে পারে।

ভোটের আগে পাকিস্তান পুলিশ পিটিআই নেতা ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধেও দমন-পীড়ন চালিয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি তারিখের প্রতিবেদন অনুসারে, দাঙ্গা, পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি গাড়ি ভাংচুরের অভিযোগে ৩৯ জন পিটিআই কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অন্যান্য সিনিয়র নেতাদেরও বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এসএটি