বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

পাকিস্তানের নির্বাচনে সামরিক ছায়া

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:০৮

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবাস ও পিটিআই নেতাদের ধরপাকড়ে পাকিস্তানের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের আগ্রহে ভাটা পড়েছে। এই নির্বাচন কি দেশটির রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাবে কোন পরিবর্তন আনবে?

পাকিস্তানের ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল কী হবে সেটি অনেকটাই নির্ধারিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ভোটারদের কেউ কেউ জানিয়েছেন দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী যেকোন মূল্যে ইমরান খানকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে চান বলে মনে করেন তারা। ইসলামাবাদের বাসিন্দা আলিয়া দুররানি বলেন, ‘আমার ভোট দিতে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই। আমি ইমরান খানের সমর্থক, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। যে কারণে এই নির্বাচন নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই।’

পাকিস্তানের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হয়েও ভোটে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না ইমরান। দুর্নীতি ও রাষ্ট্রের গোপনীয় তথ্য ফাঁসের একাধিক মামলায় তাকে কয়েক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারপরও জনমত জরিপে পিটিআই-এর তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারির পাকিস্তান পিপল'স পার্টির চেয়ে এগিয়ে আছে তার দল।

বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তানের মহাসচিব হারিস খালিকের মতে পিটিআই ‘নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের শীর্ষ জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের একটি। তিনি মনে করেন, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে দলটি বড় শহরগুলোর বেশিরভাগ আসনে জয় পাবে। তারপরও পার্লামেন্টে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মতো আসন লাভ নিয়ে তার সন্দেহ আছে। সামাজিক মাধ্যমে পিটিআই-এর প্রতি যে সমর্থন ও ইমরান খানের যে জনপ্রিয়তা তার মধ্যে অতিরঞ্জন আছে বলে মনে করেন এই মানবাধিকারকর্মী।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইমরানের দ্বন্দ্ব

ইমরান খান অংশ না নিলেও এই নির্বাচনে ইমরান খানের প্রভাব থেকে যাচ্ছে। দেশটির রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর জেনারেলদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। যদিও ২০১৮ সালে ইমরান খানের ক্ষমতায় আসার পেছনে সামরিক শক্তির মদদ আছে বলে অভিযোগ করেছিল বিরোধীপক্ষ। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই সামরিক শক্তির সাথেই ইমরান খানের বিরোধ তৈরি হয় এবং ২০২২ সালে বিরোধীরা অনাস্থা ভোটে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। এজন্য ইমরান বরাবরই সামরিক বাহিনীকে দায়ী করে আসছেন। অবশ্য দেশটির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এই প্রথম নয়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বরাবরই পাকিস্তানের রাজনীতিতে তারা প্রভাব বিস্তার করে এসেছে।

ইমরান খান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে সামরিক বাহিনী ও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগসাজশেরও অভিযোগ করেছেন, যা অস্বীকার করে আসছে ওয়াশিংটন।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বছরব্যাপী রেশারেশির পর ইমরান খানের সমর্থকেরা মাঠে নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, যা এক পর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়। সামরিক স্থাপনা ও আবাসিক এলাকায় হামলার ঘটনাও ঘটে। রাওয়াল পিন্ডিতে পিটিআই-এর নেতা শাহরিয়ার রিয়াজ বলেন, ‘আমি মনে করি এটা জনগণ ও কর্মীদের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ছিল। ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকলেও আমার বিশ্বাস এটি পাকিস্তানের রাজনীতিতে বড় একটি পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।’

এই ঘটনার কয়েক মাস পর কর্তৃপক্ষ পিটিআই নেতাকর্মীসহ সন্দেহভাজন বিক্ষোভকারীদের সামরিক আদালতে তোলে। এতে পিটিআই-এর শীর্ষ ও মধ্যম পর্যায়ের কয়েকজন নেতা দল থেকে পদত্যাগ করে সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানায়।

অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার ওয়াকার হাসান খান বলেন, ‘ইমরান খান অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় থেকেই পিটিআই একটি অ্যাখ্যান তৈরি করে। ৯ মে আমরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার ঘটনা প্রত্যক্ষ করলাম।’

সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনে পিটিআই-এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়ার সংবাদ খবর এসেছে। ক্রিকেট ব্যাটকে নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না পিটিআই এমন রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এসব ঘটনায় এই নির্বাচন ঘিরে চরম বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইমরান খানের সমর্থক ও বিভিন্ন বিশ্লেষকেরা নির্বাচন পূর্ববর্তী কারচুপির অভিযোগ করছেন।

হারিস খালিক বলেন, ‘নির্বাচন হতে হবে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও  স্বচ্ছ উপায়ে। যে-ই নির্বাচিত হোক তাদের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত যা মানুষের জীবন যাপনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

করাচিভিত্তিক সাংবাদিক নোরিন শামসের মতে, পাকিস্তানের গোটা ইতিহাসই ‘কারচুপির নির্বাচনের' ইতিহাস। তিনি বলেন, ‘এখন যা ঘটছে তা আগের নির্বাচনেও ঘটেছে। আগে যারা ক্ষমতার পছন্দের ছিলেন এখন তারা খলনায়ক হয়ে গেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে যারা খলনায়ক ছিলেন (সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ) এখন তারা পছন্দের হয়ে গেছেন।’

শামস আরও জানান, পাকিস্তানের সরকার কাঠামো বরাবরই হাইব্রিড ছিল। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সামরিক বাহিনীর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে চলেছে।

ইমরান খানকে কারাদণ্ড দেয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখান পিটিআই সমর্থকেরা

ভবিষ্যৎ কোন পথে

পাকিস্তানের আসন্ন নির্বাচন শুধু দলগুলো বা তাদের নেতাদের জনপ্রিয়তা মাপার জন্যই গুরুত্বপূর্ন নয়। অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ইস্যুগুলোতেও এই নির্বাচনের প্রভাব থাকবে।

কিন্তু নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের ঘাটতিতে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। ইসলামাবাদের স্কুল শিক্ষক সায়রা খান বলেন, ‘কে ক্ষমতায় আসবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেই ক্ষমতায় আসুন না কেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো উচিত, আর তা মানুষের আস্থা অর্জন ছাড়া সম্ভব নয়। কাজেই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তা খুব একটা পরিবর্তন আনবে এমন আশাবাদী হতে পারছি না।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের জয়ের সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে। পিটিআই ক্ষমতায় ফিরলে পাকিস্তানের রাজনীতি ও অর্থনীতি সেই চাপ নিতে পারবে না বলে দাবি করছে তার দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ পার্টি।

দলটির নেতা তারিক ফজল চৌধুরী বলেন, ‘খান ও তার দল তাদের মনোভাব বুঝিয়ে দিয়েছে। তারা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে চলতে দেবে না।’

গত বছর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পিটিআই-এর উপর থেকে থেকে তাদের সমর্থন সরিয়ে নিলেও ইমরান খানের জনপ্রিয়তা তারা থামাতে পারেনি। এটি নিশ্চিত যে নির্বাচনে জয়লাভ করে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাকে দেশটির সামরিক বাহিনীর সাথেই হাত মিলিয়ে চলতে হবে। আর সেটি যদি পিটিআই হয় এবং সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যদি তারা দ্বন্দ্ব মেটাতে সক্ষম না হয়, তাহলে পাকিস্তান আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েই এগুবে।

ইত্তেফাক/এসএটি