বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

পাকিস্তানে নির্বাচন

ইমরান খান যেভাবে জেল থেকে জয়ী হতে চান

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২১:২৯

দুই বছরেরও কম সময়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে কারাগারে— ইমরান খান ও তার দল এমন নাটকীয়ভাবে তাদের রাজনৈতিক জৌলুস হারিয়েছে। তবে ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই বলেছে, তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা বিভিন্ন মামলায় জেলে থাকলেও তারা আসছে সাধারণ নির্বাচনে জিততে পারবে।

কঠিন এই পরিস্থিতিতেও পিটিআই তাদের বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয়নি। দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ইমরান খানের বিরুদ্ধে সব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এভাবে একাধিক মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

কর্তৃপক্ষের দমনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পিটিআই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে পাল্টা জবাব দেয়ার চেষ্টা করছে এবং তাদের মধ্যে নতুন প্রার্থী রয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই একদমই নতুন।

পিটিআইয়ের ব্যাট প্রতীক তুলে নেওয়া আদতে বেশ ছোট সিদ্ধান্ত বলে মনে হতে পারে, কিন্তু যে দেশে নিরক্ষরতার হার ৫৮%, যেসব প্রার্থীদের ব্যালট পেপারে নিজেদের স্বীকৃত প্রতীক আছে তাদের জন্য বিষয়টি বেশ জটিল।

এটি হচ্ছে অগণিত বাধাগুলির মধ্যে একটি যা পিটিআই ৮ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তাদের সামনে এসেছে। কিন্তু দলটি তাদের লড়াই চালিয়ে গিয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমেও তাদের এই লড়াই চলছে যা একজন নেতাকে জেলের কয়েদখানা থেকে সমাবেশের সামনে নিয়ে গিয়েছে। এই বিষয়গুলো এটাই প্রমাণ করে যে তারা এই লড়াইয়ে সবকিছু করতে ইচ্ছুক।

আতিফ খান পাকিস্তানের উত্তরে খাইবার পাখতুনখোয়ায় প্রাদেশিক মন্ত্রী ছিলেন। এখন, নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসাবে, তিনি ভিডিও সম্প্রচারের মাধ্যমে তিন মিটার পর্দায় সবার সামনে হাজির জন।

তার দল এই ভিডিও স্ক্রিন সারা শহর ঘুরিয়ে, শহরের চত্বরে এনে প্রদর্শন করে। সেখানে জড়ো হওয়া পিটিআই সমর্থকদের উদ্দেশ্যে এই ভিডিও সম্প্রচার করা হয়। তিনি বলেন, ভোটারদের কাছে তার বার্তা পৌঁছে দেয়ার এটাই একমাত্র উপায়। কারণ তিনি মে মাস থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন।

কর্তৃপক্ষ বলছে সে তিনি একজন ওয়ান্টেড ব্যক্তি, অর্থাৎ তাকে ধরিয়ে দেয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। আতিফ খান বিশ্বাস করেন যে তিনি সুষ্ঠু বিচার পাবেন না। তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা, ভিড়ের মধ্যে নয়, মঞ্চে নয়, মানুষের মধ্যে নয়, তবে আমরা দল পরিচালনার চেষ্টা করছি।’

‘পিটিআই-এর সবচেয়ে বড় সমর্থন হল তরুণ ভোটাররা। তারা ডিজিটাল মিডিয়া, মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে, তাই আমরা ভেবেছিলাম এর মাধ্যমে তাদের সাথে আরও বেশি জড়িত হওয়া উচিত। এটাই একমাত্র কাজ, আমরা ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে পারি।’

এবারের নির্বাচনে পিটিআই-এর প্রচারণার জন্য প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্টির অফিসিয়াল এক্স বা সাবেক টুইটার অ্যাকাউন্ট, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক পেইজগুলোর প্রতিটিতে কয়েক মিলিয়ন ফলোয়ার রয়েছে।

যা কিনা অন্য দুটি প্রধান দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি-পিপিপি এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ, নওয়াজ-পিএমএল’এন এর চেয়েও বেশি। এই তিনটি দলের মধ্যে ইমরান খান একমাত্র নেতা যার সোশ্যাল মিডিয়ার ওই তিনটি প্ল্যাটফর্মে একটি করে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার অর্থ তার বার্তা সরাসরি মানুষের কাছে যাচ্ছে।

কোন প্রার্থী পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থী কিনা তা জানতে ভোটারদের সাহায্য করার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে।

ক্রিকেট ব্যাটের প্রতীক ছাড়াই, পিটিআই একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছে যেখানে ভোটাররা তাদের নির্বাচনী এলাকায় গেলে সংশ্লিষ্ট আসনের পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থীর প্রতীক খুঁজে পাবে। সমাবেশ আয়োজনের সময় আরেকটি সমস্যা দেখা দেয়। পাকিস্তানে রাজনীতি ব্যক্তিত্বের জৌলুসের সঙ্গে জুড়ে আছে।

ইমরান খান - প্রিয় ক্রিকেটার-রাজনীতিবিদ - এমন একজন নেতা, যার উপস্থিতি হাজার হাজার মানুষকে সমাবেশে আকর্ষণ করতে সক্ষম।

কিন্তু গত আগস্ট থেকে তিনি কারাগারে আছেন এবং এই সপ্তাহে দুটি তিনটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত ও সাজা পাওয়ার পর সামনের ১৪ বছর ধরে তিনি কারাগারে থাকতে পারেন বলে মনে হচ্ছে।

পিটিআই আরও বলেছে যে তারা সমাবেশ আয়োজনে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। জানুয়ারির শেষ দিকে, করাচীতে শত শত পিটিআই সমর্থকরা সমাবেশ করে। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে পিটিআই এর এভাবে জন সমাবেশ করার কোন সঠিক অনুমোদন ছিল না। পিটিআই বলেছে যে, তাদের কীভাবে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত রাখা হয়েছে এটি তার সর্বশেষ উদাহরণ।

পিটিআই অভিযোগ করেছে যে, তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দিতে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানি, অপহরণ, কারাগারে পাঠানো এবং সহিংসতা চালানো হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক তথ্যমন্ত্রী মুর্তজা সোলাঙ্গি।

ওয়াশিংটনের উইলসন সেন্টার থিংক ট্যাঙ্কের দক্ষিণ এশিয়া ইন্সটিটিউটের পরিচালক ড.মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘পাকিস্তানের জনসংখ্যার মাত্র ৩০ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সক্রিয় ব্যবহারকারী৷ সুতরাং এতে এটাই স্পষ্ট হয় যে পিটিআই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতো অনলাইন প্রচারণা চালাক না কেন পারে এর পরিসীমা সীমাবদ্ধ।’

এমনটা অবশ্য আগেও দেখা গিয়েছে – বিশেষ করে, গত নির্বাচনের সময় যখন নওয়াজ শরিফ কারাগারে ছিলেন।

কুগেলম্যান বলেছেন, ‘যদি এসব একই রকম শোনায়, তবে এর কারণ হল; এখন কেবল খেলোয়াড়রা বদলে গেছে।’

বেশিরভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতো তিনি ভাগ্যের এই পরিবর্তনের পিছনে পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর হাত দেখেন– সেই একই সামরিক বাহিনী যাদেরকে অনেকেই ইমরান খানের ক্ষমতায় আসার পেছনে প্রাথমিক টিকিট হিসেবে দেখেন।

‘পিটিআই ২০১৮ সালে নির্বাচনী সমর্থন পেয়েছিল। এজন্য সামরিক বাহিনী সরাসরি কলকাঠি না নাড়ালেও তারা পরিষ্কারভাবে সে সময় নির্বাচনী ব্যবস্থার সুবিধা পেয়েছিল।’

‘এখানে ব্যাপক মাত্রায় দমন-পীড়ন ও কারসাজি করা হয়েছিল। পিএমএল-এন দলের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছিল। সে সময় নওয়াজ শরিফের ১০ বছরের জেলের সাজা হয়।’ কুগেলম্যান মনে করেন ওই ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক সময়ের থেকে আলাদা।

পাকিস্তানের টিভি চ্যানেলগুলো পিএমএল-এন-এর পক্ষে ইমরান খানের প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ বা পিপিপি-র পক্ষে বিলাওয়াল ভুট্টোর নির্বাচনী সমাবেশের খবরাখবরে ভরপুর।

কুগেলম্যানের মতে, অনেক ভোটার মনে করতে পারে যে ভোট দেওয়ার কোনও অর্থ নেই কারণ তারা মনে করে পিটিআই এর জয়ের কোনও উপায় নেই। পিটিআই-এ এমন কিছু লোক আছে যারা মনে করে, তারা যদি নির্বাচন পর্যন্ত যেতে পারে এবং ভোটারদের উপস্থিতি যদি যথেষ্ট বেশি হয় তবে তারা দলের পক্ষে ভোট টেনে অলৌকিক বিজয় অর্জন করতে পারবে।

তথ্য সূত্র: বিবিসি

ইত্তেফাক/এসএটি