অন্য আর সব দেশের মতোই বাংলাদেশও ব্যাপক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিপালনের স্বপ্ন দেখে আসছে। সম্প্রতি দেশের স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায় একে একটি ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। দেশের একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী এবং অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাতির কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে আসছে। অন্য কথায়, জাতির সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়নে, দেশের অন্যতম সক্রিয় অঙ্গ হিসেবে নৌবাহিনীর একটি পরিকল্পনা এবং সুবিবেচনাপ্রসূত অভিলাষ রয়েছে।
বাংলাদেশ আইএমও-ঘোষিত একটি ‘সাদা তালিকাভুক্ত’ জাতি এবং এর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর সীমানা। তারপরও সমুদ্রনির্ভর জাতি (মেরিটাইম নেশন) হিসেবে এখন পর্যন্ত বিশেষ সফলতা অর্জন করতে পারেনি। তাই বাংলাদেশকে এর অর্থপূর্ণ সফলতা তুলে ধরতে হবে। সঠিক চেতনা লালনের মাধ্যমে, একটি সমুদ্রনির্ভর জাতি হিসেবে বাংলাদেশ তার সকল সম্ভাবনাকে বিকশিত করে তুলতে পারে। এটা বলা যায় যে, বাংলাদেশ নৌবাহিনী সকল সুবিধা থাকার কারণে বাংলাদেশকে সমুদ্রসম্পদের সমৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম।
অঢেল অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ, উচ্চযোগ্যতাসম্পন্ন এবং পেশাদার অফিসারগণ তাঁদের পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে অবসর গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু সমুদ্র খাতটিতে অংশগ্রহণ তথা বৃহত্তর অর্থে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখায় তখনো তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও দৈহিক সক্ষমতা বজায় থাকে। এক পর্যায়ে এই সম্ভাব্য কর্মদক্ষতা যথাযথ কর্মমঞ্চ বা সুযোগ না থাকার কারণে বিকশিত হতে পারে না; ফলে তাদের উদ্যম বিনষ্ট হয়ে যায়।
বহুদিন থেকেই এটা অনুভূত হয়ে আসছে যে, জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং একইসঙ্গে সমুদ্র চিন্তাবিদদের বিকাশে একটি কর্মমঞ্চ সৃিষ্টর জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি গবেষণা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা করা সমীচীন। সময় গড়িয়ে গেলেও নানাবিধ কারণে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এখনো এ ধরনের একটি কর্মমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে উঠতে পারেনি। বিগত দশক জুড়ে, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এর আকার ও আকৃতি উভয় দিক দিয়েই প্রবলভাবে বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষ করে, সমুদ্রসীমা বিরোধের চূড়ান্ত রায়ের পর নৌবাহিনীর দিগন্ত অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে। একটি গবেষণা কেন্দ্র গঠন ও কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যত্ লক্ষ্য নির্ধারণ অধরাই থেকে গিয়েছিল। এটি অনস্বীকার্য যে, সমুদ্র সক্ষমতা উন্নয়নে গবেষণা মঞ্চসমূহ বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কেবল সীমিত সময়ের জন্য নয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে গবেষণাকর্ম সব সময়ই উপেক্ষিত হয়ে এসেছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে যথেষ্ট সহযোগিতার প্রয়োজন। এক পর্যায়ে একটি সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনার লক্ষ্যে নৌবাহিনী মনস্থির করে। এই উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশে অবস্থিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকাণ্ড আমলে নিয়ে একটি সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনে ঐকান্তিকভাবে প্রত্যাশিত কাজটি শুরু করে। এরপর কালক্ষেপণ না করে নৌ সদর দপ্তরের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য অর্জনে ২০১৮ সালের ৩ জুলাই উদ্ভাবনকুশলতা দেখিয়ে সর্বপ্রথম একটি সমুদ্র গবেষণা এবং উন্নয়ন সংস্থা—‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিমরাড)’ স্থাপন করে। বিমরাড সর্বস্তরের সমুদ্র চিন্তাবিদদের জন্য একটি প্ল্যাটফরম বা মঞ্চ। সর্বস্তরের পেশাদার ব্যক্তিবর্গ, যাঁরা সমুদ্রবিদ্যায় অঢেল অভিজ্ঞতাসহ অবসর গ্রহণ করেছেন এবং যাঁদের মধ্যে এখনো এ বিষয়ে অবদান রাখার সম্ভাবনা বিরাজ করছে; পাশাপাশি, সমুদ্র অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমুদ্র চিন্তাবিদদের জন্যেও এটি উন্মুক্ত।
বিগত বছরগুলোতে, সরকারি ও ব্যক্তিগত—এই উভয় পর্যায়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন সমুদ্রসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। তবে জাতির প্রতি সেসবের অঙ্গীকারের কার্যকারিতা নিয়ে যে-কারো প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এর ইতিবাচক দিক হলো এই যে, দেশে এখন সমুদ্র খাত নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী বহু মানুষ রয়েছে।
অজস্র পদক্ষেপ সত্ত্বেও, এখনো বাংলাদেশকে পুরোপুরি বিকশিত একটি সমুদ্রনির্ভর জাতি হিসেবে যথেষ্ট উন্নীত হতে হবে। একসময় বাংলাদেশ একটি সমুদ্রনির্ভর জাতি হিসেবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে থাকলেও পরবর্তী পর্যায়ে ত্রুটিপূর্ণ যাত্রার মাধ্যমে পুরো খাতটিকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এককালে জাহাজ নির্মাণ শিল্পও ছিল সমৃদ্ধ। তবে বর্তমানে খুব একটা সফলতা ছাড়াই খাতটি এগিয়ে চলেছে এবং বিদেশ থেকে জাহাজ নির্মাণের বিরল কিছু ফরমায়েশ ছাড়া এটি কেবল দেশীয় চাহিদাই পূরণ করে যাচ্ছে। মত্স্যশিল্প, বিশেষ করে গভীর সাগরে মত্স্য শিকার আরো একটি খাত, যা জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালনে সক্ষম হতে পারছে না। উপযুক্ত যন্ত্রপাতি সজ্জিত পর্যাপ্তসংখ্যক মাছ ধরার জাহাজের অভাব এবং বঙ্গোপসাগরের মত্স্য শিকার এলাকা নিয়ে যথোচিত গবেষণার অপ্রতুলতার কারণে এখনো সমুদ্রনির্ভর অন্যান্য জাতি থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো সমুদ্র পর্যটন যা এখনো পর্যন্ত খুব বেশি উন্নতি লাভ করতে পারেনি। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে প্রচুর পরিমাণে অনাবিষ্কৃত প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদ আবিষ্কার ও আহরণের জন্য প্রয়োজন সুসমন্বিত একটি সযত্ন পরিকল্পনা। এসব সম্পদ উত্তোলন ও একইভাবে এসবের সংরক্ষণের জন্যেও ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে।
দেশের সমুদ্রসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, বিশেষজ্ঞগণ এবং সুশৃঙ্খল বাহিনীর মধ্যে সাধারণ একটি কর্মক্ষেত্র বা প্ল্যাটফরম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সূক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা পূরণের দীর্ঘদিনের অনুভূত আবশ্যকতা থেকেই বিমরাড-এর সূচনা। বিমরাড তার অভীষ্ট লক্ষ্যসমূহ অর্জনে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে প্রকাশনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সমুদ্র-সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে নিয়মিত একটি দ্বিভাষিক পত্রিকা ‘পাল’ প্রকাশ করে আসছে। এছাড়াও একটি গবেষণা জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে চলতি মাসের (জুলাই) শুরুতেই। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে ‘মেরিটাইম গুডগভারনেস টুওয়ার্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শিরোনামে বিমরাড আধুনিকতম একটি সেমিনারের আয়োজন করে। এই সেমিনারে আমেরিকা, ভারত, মালায়েশিয়া এবং শ্রীলঙ্কা থেকে আগত সম্মানিত বক্তাগণ সফলতার সঙ্গে তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বিমরাড-ও ইতিমধ্যে ভারতে অনুষ্ঠিত দুটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছে। এছাড়াও সমুদ্রসংশ্লিষ্ট প্রকল্প, বঙ্গোপাগরের যোগাযোগ বৃদ্ধি, উপকূলীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, এ ধরনের আরো অনেক বিষয় বিমরাড-এর গবেষণার কর্মকাণ্ডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রথম বর্ষপূর্তির কালে সমুদ্র অর্থনীতির লাভালাভকে বঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবার লক্ষ্য নিয়ে বিমরাড কাজ করে যাচ্ছে।
বিপুল জনসংখ্যার বোঝা এবং স্থলসম্পদের অপ্রতুলতার কারণে আজ হোক বা কাল হোক, একসময় আমাদের বিকল্প সম্পদের উত্স হিসেবে সমুদ্রের দিকে তাকাতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সম্পদকে অবশ্যই আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে যেতে হবে। এ কারণেই আমাদের এই সামুদ্রিক খাত বিষয়ে যথাযথ একটি গবেষণা প্ল্যাটফরমের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
n লেখক : নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং সমুদ্রসংক্রান্ত গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বিমরাড-এর মহাপরিচালক
