মাদকের দাবানল গুঁড়িয়ে দিতে হবে

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৯, ২১:৪৫

বর্তমানে যে সমস্যাগুলো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে সমাজকে দিনে দিনে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে   সেগুলোর অন্যতম হলো মাদক সমস্যা।

আর এ মাদকাশক্তির করাল গ্রাস এখন শহরাঞ্চল থেকে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে গেছে। মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইদানীং যেটি সবচেয়ে বেশি প্রকট আকার ধারণ করেছে সেটি হলো ইয়াবা ট্যাবলেট। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ইয়াবা ট্যাবলেট অবৈধভাবে পাচার হয়ে বাংলাদেশে আসে এবং সেগুলো এ দেশে গোপন ব্যবসার পণ্যে পরিণত হয়েছে এবং এ সমাজকে এক প্রকার পঙ্গু করে দিচ্ছে।

দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা কত তা নিয়ে কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক অধ্যাপক এমদাদুল হক ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় বলেছেন দেশে প্রায় ৭০ লক্ষ মাদকাসক্ত রয়েছে এবং যার সত্তর থেকে আশি শতাংশ হলো ইয়াবা সেবনকারী।

বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার ও ভারতে মাদক উত্পাদনকারী অনেক কারখানা রয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তানও খুব দূরের দেশ নয় যেখানে প্রচুর মাদক উত্পাদন হয় এবং বলা হয়ে থাকে যে ল্যাটিন আমেরিকার পর এসব জনপদেই সবচেয়ে বেশি মাদক উত্পন্ন হয়। আর এসব দেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে প্রচুর মাদকদ্রব্য বিশেষ করে প্রচুর পরিমাণে ইয়াবা বাংলাদেশে আসে এবং বাংলাদেশ এর করাল গ্রাসে পরিণত হয়েছে। এই ইয়াবা ব্যবসায়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে, নানা পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী, ছাত্রছাত্রী এমনকি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মীরাও জড়িয়ে পড়ছে। আবার অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কিছু কিছু সদস্যও অর্থের বিনিময়ে এর সঙ্গে জড়িত থেকে এই চোরাচালানে সহযোগিতা করছে। এভাবে রক্ষকই যখন ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে তখন শেষ ভরসাটুকুও হারিয়ে যায়। যার প্রমাণ গত ১৫ জুন চট্টগ্রামে ১০,০০০ ইয়াবাসহ এক পুলিশ সদস্য আটক হওয়ার ঘটনা থেকে বুঝতে পারি। এ রকম অহরহ ঘটনা ঘটতেই থাকে। যার কোনো সুরাহা মিলছে না। সাধারণত সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে এর প্রকোপ বেশি দেখা যায় কিন্তু বর্তমানে তা দেশব্যাপী প্রায় প্রতিটা গ্রামে ছড়িয়ে গেছে।

তাছাড়া দেশের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েরাও এই মাদকের দিকে খুব বেশি ঝুঁকে পড়ছে যেমনটি আগে খুব একটা ছিল না। এতে করে যুবসমাজের একটা বিশাল অংশ অচিরেই ঝরে পড়ছে। হারিয়ে ফেলছে তাদের কর্মক্ষমতা, সৃজনশীল শক্তি, এমনকি একটা পর্যায়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

অনেকক্ষেত্রে মাদকসেবিরা জানেই না তারা কেন এটি সেবন করছে। দেখা যায় ভালোমন্দের বিচার না করে বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে কৌতূহলবশে অথবা ফ্যাশন মনে করে এগুলো সেবন করছে। সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের অভাব এর জন্য কম দায়ী নয়। যেসব পরিবারে বাবা-মা সন্তানের ভালোমন্দ বিষয়ে উদাসীন মনোভাব পোষণ করে এবং মৌলিক চাহিদা মেটানোর পরও অবৈধ উপার্জনের অর্থ সন্তানকে অঢেলভাবে দিয়ে থাকে। যার ফলে মাদকে আসক্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি ঘটে থাকে এবং এর পরিণাম যে কতটা ভয়ানক আকার ধারণ করতে পারে তা আমরা দেখতে পাই ২০১৩ সালে ঢাকার চামেলীবাগে পুলিশ কর্মকর্তার মাদকাসক্ত মেয়ে ঐশির হাতে বাবা-মায়ের খুন হওয়ার ঘটনা থেকে।

আমি মনে করি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বপ্রথম যা দরকার তা হলো জনসচেতনতা। আর এ সচেতনতা শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। কেননা শুধু সরকার অথবা এনজিও এর মাধ্যমে মাদকের এত ব্যাপক বিস্তৃতি ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রতিটি পরিবারে বাবা-মায়ের উচিত হবে সন্তানের খোঁজ-খবর নেওয়া।

যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তা হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। মাদকের কুপ্রভাব সম্পর্কে সকলকে অবহিত করতে হবে এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই এই মাদকের ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস

ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়