বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

মামলার তদন্ত ও বিচারে সময় পার করার নেপথ্যে কী? 

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২৩:০৩

আলোচিত সগিরা মোর্শেদ হত্যার বিচার পেতে ৩৫ বছরের অপেক্ষা আরো বাড়লো। বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) রায়ের কথা থাকলেও বিশেষ দায়রা জজ মোহাম্মদ আলী হেসাইন ২০ ফেব্রুয়ারি নতুন তারিখ দিয়েছেন।

বাদীর আইনজীবী ফারুক আহমেদ জানান, ‘রায় প্রস্তুত না হওয়ায় বিচারক সময় নিয়েছেন। আমরা ৩৫ বছর অপেক্ষা করেছি। আরো কয়েকটা দিন না হয় অপেক্ষা করব।’ 

এমন আরো অনেক মামলার বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এর কারণ কী?

সগিরা মোর্শেদ হত্যার তদন্তে ৩১ বছর
১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে মেয়েকে রিকশাযোগে আনতে গিয়ে অজ্ঞাত ঘাতকদের গুলিতে নিহত হন তিনি। তারপর দীর্ঘ সময় এই মামলার তদন্ত চলে ভিন্ন পথে। তদন্তকারীরা ধারণা করেছিলেন, তিনি মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। পুলিশ ওই মামলায় মন্টু ও মারুফ রেজা নামে দুজনকে শনাক্ত করে। আবাসন ব্যবসায়ী মারুফ রেজা তখনকার এরশাদ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানের ভাগ্নে হওয়ায় তাকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দেওয়া হয়। আদলতে মামলার সাক্ষ্য চলাকালে মারুফ রেজার নাম আসায় অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। আর সেই আদেশ নিয়ে আইনি লড়াই শেষে ২০১৯ সালের জুন মাসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব দেয় হাইকোর্ট। পিবিআই ঘটনার দিন সগিরা মোশের্দকে বহনকারী সেই রিকশাচালককে ৩০ বছর পর খুঁজে বের করে হত্যাকাণ্ডের জট খোলে। ২০২০ সালের ১৬ জানুয়ারি তারা আদালতে চার্জশিট দেয়। জানা যায়, নিজ পরিবারের কয়েকজন তাকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করিয়েছে। এই মামলার আসামিরা হলেন—সগিরা মোর্শেদের ভাসুর ডা. হাসান আলী চৌধুরী, জা সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহিন, শ্যালক আনাছ মাহমুদ রেজওয়ান, মারুফ রেজা ও মন্টু ৷ স্ত্রীর কথায় প্ররোচিত হয়ে ছোট ভাইয়ের বউকে শায়েস্তা করার জন্য ২৫ হাজার টাকায় সে সময় বেইলি রোড এলাকার ‘সন্ত্রাসী’ মারুফ রেজাকে ভাড়া করেছিলেন ডা. হাসান। মারুফকে সহযোগিতার জন্য স্ত্রীর ভাই রেজওয়ানকে তিনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন। 

আরো কয়েকটি উদাহরণ
সগিরা মোর্শেদ হত্যার বিচার পেতে ৩৫ বছরে অপেক্ষা। এরমধ্যে তদন্তেই কেটেছে ৩১ বছর। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। তিনবার তদন্ত সংস্থা বদলের পর একযুগ ধরে মামলাটির তদন্ত করছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। এ পর্যন্ত ১০৭ বার সময় নিয়েও তারা কোনো তদন্ত অগ্রগতি রিপোর্ট দিতে পারেনি। চিহ্নিত করতে পারেনি হত্যাকারীদের। বিচার তো অনেক দূরে, একযুগে তদন্তই শেষ হয়নি। আইনমন্ত্রী বলেছেন, এই মামলা তদন্তে ৫০ বছর সময় লাগলেও তা দিতে হবে। আইনমন্ত্রীর কথার জবাবে সাগরের মা সালেহা মুনির বলেছেন, ‘৫০ বছর পর আমরা কেউই থাকব না। যারা হত্যা করেছে তারাও থাকবে না। তাহলে কার বিচার করা হবে? কার জন্য বিচার করা হবে?’ 

২০০০ সালের ১ জুলাই ঢাকার পশ্চিম হাজীপাড়ার বাসায় খুন হয়েছিলেন সিটি কলেজের অনার্সের ছাত্রী রুশদানিয়া ইসলাম বুশরা। ওই মামলায় ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর পুলিশ চার্জশিট দেয়। ২০০৩ সালের ৩০ জুন মামলার রায়ে বুশরার সৎ ভাই কাদের, শ্যালক শওকত ও কবিরকে মৃত্যুদণ্ড এবং কাদেরের স্ত্রী রুনুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু আপীলে ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে আসামীরা সবাই খালাস পান। এর প্রতিক্রিয়ায় বুশরার মা লায়লা ইসলাম তখন বলেছিলেন, ‘এখন মনে হয়, বুশরা বলতে কেউ জন্মগ্রহণই করেনি। বুশরা নামে কেউ ছিল না, কেউ খুনও হয়নি।’

শুধু এই তিনটি ঘটনা নয়—হত্যাকাণ্ডের মতো ফৌজদারি অনেক মামলাই তদন্তের নামে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। আর তদন্ত শেষে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর দেখা যায় অধিকাংশ মামলায়ই আসামিরা খালাস পেয়ে যান।

কক্সবারের চকরিয়া উপজেলার বিএস চর বেতুয়া গ্রামে শিশু রিপা মনিকে হত্যা করা হয় ২০০১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। ওই মামলায় দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হলেও গত ২১ বছর ধরে চলছে তন্তের বৈধতা নিয়ে লড়াই। এখন ওই লড়াই চলে গেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। আর এই লড়াইয়ের কারণে মামলাটির বিচার শুরু হচেছ না। 

তদন্ত ঠিক সময়ে ঠিক মতো কেন হয় না
মামলার তদন্ত, বিচার, সময়ক্ষেপণ এবং দুর্বল তদন্ত নিয়ে তদন্তকারী, সাবেক বিচারক, আইনজীবী ও অপরাধ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে সাধারণ কিছু কারণ আছে। আর তা হলো—তদন্তকারীদের অদক্ষতা, তদন্তে মনোযোগ দিতে না পারা এবং বিচারকের সংকট। তবে এর বাইরে রয়েছে সরকারের প্রভাব, অর্থের প্রভাব, দুর্নীতি এবং আইনের নানা প্যাঁচ। শেষের সব কারণগুলোই ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীরা ব্যবহার করতে পারে। তাদের লক্ষ্য থাকে, মামলা তদন্ত পর্যায়েই শেষ করে দেয়ার। সেটা না পারলে তদন্ত দীর্ঘায়িত করা। তদন্ত দীর্ঘায়িত হলে মামলা দুর্বল হয়ে যায়। আলমত নষ্ট হয়ে যায়, সাক্ষী পাওয়া যায় না। ফলে বাদী বিচারে তার পক্ষে রায় পান না। আসামিরা ছাড়া পেয়ে যান। আবার সেটা না পারলে দুর্বল চর্জশিট দাখিল করানো হয়। তাতেও আসামি সুবিধা পান।

প্রতিবেদনে যে চারটি মামলার কথা বলা হয়েছে, তাতে ওই কারণগুলোর প্রভাব স্পষ্ট। সাংবাদিক সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মুনির মনে করেন, ‘এই সরকার সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত চায় না বলেই হত্যাকারীরা চিহ্নিত হচ্ছে না। মামলা তদন্তও শেষ হচ্ছে না।’ তাই তিনি মনে করেন, তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করেও কোনো লাভ হবে না।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাসহ অনেক জটিল মামলার তদন্তকারী সিআইডির সাবেক ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ বলেন, ‘তদন্ত যত দেরি হবে, বিচার পাওয়াও তত কঠিন হবে। কারণ তদন্তে দেরি হলে আলামত, সাক্ষ্য প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। সাক্ষীরাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।’

তার কথা, ‘সিআইডি এবং যারা বিশেষভাবে তদন্তে নিয়োজিত, তারা যত গভীরভাবে কাজ করেন—থানা পুলিশ সেভাবে করে না। একজন সাব ইন্সপেক্টর তদন্ত করেন ওসি সাহেব দেখে দেন। কিন্তু তদন্ত করে যদি সঠিকভাবে সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ না করা হয়, তারপর সেটা ঠিকভাবে আদালতে উপস্থাপন না করা হয়—তাহলে বিচারে গিয়ে ফল পাওয়া যায় না। ফলে অনেক মামলায় শেষ পর্যন্ত শাস্তি হয় না। রুশদানিয়া ইসলাম বুশরা হত্যায় সব আসামির খালাস পাওয়ার কারণ দুর্বল তদন্ত হতে পারে।’

তার কথা, ‘অদক্ষতা তো আছেই, তার সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত না করার বিষয়ও থাকে। আধুনিক তদন্তের সব সুবিধা সিআইডিতে আছে। থানা পুলিশ চাইলে তাদের সহায়তা নিতে পারে। তবে খুব একটা নিতে দেখিনি।’

সংকট কোথায়
বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলায় সর্বোচ্চ ১৫ ভাগে আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা যায় এবং শাস্তি হয়। আর সর্বোচ্চ আদালতসহ সব আদালত মিলে ৪০ লাখ মামলা বিচারের অপেক্ষায় আছে। নতুন কোনো মামলা বিচারের জন্য না গেলেও যে বিচারক আছেন, তাদের এই মামলা নিষ্পতি করতে ১৬ বছর লাগবে। দেশের নিম্ন আদালতে ২০ বছর ধরে ঝুলে আছে এমন মামলার সংখ্যা ২০২২ সালে ছিল ছয় হাজার ৬৮১টি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রজমান কার্জন বলেন, ‘আদালতের পিপিরা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পান। তাদের বড় একটি অংশ অদক্ষ এবং দুর্নীতিপরায়ণ। আর তদন্তকারীরাও অদক্ষতার পাশাপাশি দুর্নীতিগ্রস্ত। অনেক সময়ই এই দুই পক্ষ মিলে অর্থের বিনিময়ে মামলা দুর্বল করে দেয়। অথবা ঝুলিয়ে রাখে। আর আইনজীবীরা প্রভাবশালীদের পক্ষ নিয়ে আইনের নানা ফাঁক খুঁজে তদন্ত আটকে দেয়, দীর্ঘায়িত করে। আবার তারা বিচারও দীর্ঘায়িত করে। মামলা নিয়ে তখন বাদীকে বিভিন্ন আদালতে ঘুরতে হয়।’

তার কথা, ‘পুলিশে যারা তদন্ত করেন, তাদের এর বাইরেও অনেক কাজ করতে হয়। সে কারণেও তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে চলে। আইনে মামলার তদন্ত শেষ করার জন্য সময় নির্ধারিত থাকলেও তা মানা হয়না। আর বিচারকের সংখ্যা কম বলে মামলা জট লেগে যায়।’

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের। 

ইত্তেফাক/ডিডি