বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ

সাগরিকার বাবার সব রাগ মুছে গেছে

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬:৩৯

সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী বাংলাদেশ দলের স্ট্রাইকার সাগরিকার বাবা লিটন, মা আঞ্জু আরা বেগম কমলাপুর স্টেডিয়ামে ফাইনাল দেখতে হাজির। মেয়ের খেলা দেখতে এসেছেন, কিন্তু মেয়ে জানেন না। সাগরিকার বাবা-মায়ের জমানো স্মৃতির কথা। তারা দুজনে একমাত্র ছেলে সাগরকেও জানাননি যে তারা ঢাকায় যাচ্ছেন। সাগরিকাদের বাড়িতে টিভি নেই, অন্যজনের কাছ থেকে টিভি এনে খেলা দেখেন। ওয়ালটন গ্রুপ সাগরিকার বাবা-মাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানায়। সেই সুবাদে ঢাকায় আসা। একটা টিভি উপহার দেওয়া হয়েছে সাগরিকার বাবা-মায়ের হাতে।

সাগরিকাদের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলের বঙ্গটুলি গ্রামে। সেখান থেকে বুধবার রাতে ট্রেনে পীরগঞ্জে গিয়ে ১০ মিনিট আগে ট্রেনে ওঠেন। সিট নেই। এক যাত্রী চালের বস্তা রেখেছিলেন, সেটার ওপর সাগরিকার মা বসেছেন, আর বাবা সারা রাত দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাতে ঘুম হয়নি। ক্লান্ত শরীরে বাবা-মা কমলাপুর স্টেডিয়ামে  গেলেন, মেয়ের খেলা দেখতে। খেলা শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টা আগে কোচ সাইফুল বারী টিটুর সঙ্গে পরিচয় হলেও বাবা-মা অনুরোধ করেন সাগরিকাকে যেন না বলা হয় তারা মাঠে খেলা দেখছেন।

বাবা লিটন বড় রাস্তায় চায়ের দোকান নিয়ে বসেন। ফুটবল খেলতে দেননি। গ্রামের মানুষ আজেবাজে কথা বলত। কেন মেয়ে ফুটবল খেলছে? বিয়ে দেওয়া যাবে না। মানসম্মান নষ্ট করছে। বাবা এসব কথা বাসায় ফিরে বলেছেন। কড়া আইন—ফুটবল খেলা যাবে না। তার পরও মেয়ে ফুটবল খেলছে। সাগরিকা বিকেএসপি থেকে ফিরে এসেছিল বলে সাগরিকার বাবা রাগ করেছিলেন মেয়ের ওপর। কেন চলে এসেছে, তা নিয়ে এক মাস মেয়ের সঙ্গে কথা না বলে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন।

 

মা আঞ্জু আরা বেগম বলেন, ‘মেয়ে ঢাকায় জাতীয় দলে খেলতে চায়। ঠাকুরগাঁওয়ে ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম রাঙ্গাটুলি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি গড়েন। তিনি সাগরিকাকে ঢাকায় ক্লাবে খেলানোর উদ্যোগ নেন। সেখান থেকে জাতীয় দলে সুযোগ পায় আমার মেয়ে।’ সাগরিকার মা বলেন, ‘আমার মেয়ে তখন ঢাকায় খেলে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছে। আর গ্রামের লোকজন বলছে, “খোঁজ নিয়ে দেখো তোমার মেয়ে কোনো ছেলের সঙ্গে ভেগে গেছে।” আমি বললাম, ফোনে খেলা দেখা যায়, দেখুন আমার মেয়ে খেলছে (কথা বলতে বলতে চোখ মুছছিলেন সাগরিকার মা আঞ্জু আরা বেগম)। ঢাকায় যাওয়ার আগেও ফোন করে বাবাকে সাগরিকা বলেছিল, বাবা মাফ করে দিও, ঢাকায় চলে যাচ্ছি।’ এফসি বি-বাড়িয়া দলে খেলে ১০ গোল করেছিলেন সাগরিকা। তার পরই জাতীয় দলের ক্যাম্পের দরজা খুলে যায় সাগরিকার জন্য।

মা আঞ্জু আরা বেগম বললেন, ‘আমার মেয়ে আমাকে বলেছিল, ফুটবল খেলতে প্রয়োজনে ঘর ছাড়বেন। সেটাই করেছিল।’ সাগরিকা এবার অনূর্ধ্ব-১৯ নারী সাফে ৩ গোল করেছেন। জোড়া গোল করেছেন নেপালের বিপক্ষে। ভারতের বিপক্ষে সাগরিকার একমাত্র গোলে জিতেছিল বাংলাদেশ। সাগরিকার বাবা অন্যজনের জমিতে দোকান বসিয়ে চা বিক্রি করেন। মা বললেন, ‘যার জমিতে দোকান করি, সেই মালিক বলে দেখো দেখো, পত্রিকায় তোমার মেয়ের ছবি ছাপা হয়েছে।’ সেই জমির মালিক পাত্রিকা এনে চায়ের দোকানের অন্যদের সাগরিকার ছবি দেখান। ছবি দেখেন বাবা-মা, কিন্তু পড়তে পারেন না। মেয়ে সাগরিকা পড়েছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। বাবার সব রাগ মুছে গেছে। 

ইত্তেফাক/জেডএইচ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন