বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

নওয়াজ, ইমরান দুই জনেরই বিজয় ভাষণ

পাকিস্তানে সরকার গঠন কোন পথে

  • পিপিপির সঙ্গে জোট করতে চান নওয়াজ, নীরব বিলাওয়াল
  • প্রেসিডেন্ট আমাদেরকেই সরকার গঠনে ডাকবে: পিটিআই চেয়ারম্যান
  • ফল প্রকাশে দেরি, আজ পিটিআইয়ের বিক্ষোভ
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:০০

জোর করে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এমন কোনো বিদ্বেষমূলক আচরণ নেই যা ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের প্রতি করা হয়নি। ইমরান খানকে কারাগারে ঢোকানোসহ তার দলের নেতাদের একের পর একে গ্রেফতার, উপর্যুপরি মামলাসহ সবই করা হয়েছে। এমনকি পিটিআইয়ের নির্বাচনি ‘ব্যাট’ প্রতীকও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ইমরান খানের সমর্থকরা। তবে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকটের সমাধান কোথায় তা নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

কোন দল কত পেয়েছে?

পাকিস্তানে সরকার গঠন করার জন্য কোনো দলকে ন্যূনতম ১৩৪টি আসনে জয়লাভ করতে হবে। কিন্তু দেশটির নির্বাচন কমিশন গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত ২৫৫টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করেছে, তাতে দেখা যায় যে কোনো দলই এককভাবে এত বিপুল সংখ্যক আসন পায়নি। এমনকি বাকি ১০টি আসনের ফলাফলও যদি কোনো একক দলের পক্ষে যায়, তারপরও তা সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক আসন হবে না। এখন পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আসনের দিক থেকে এগিয়ে। এদের মধ্যে ইমরান খানের দল পিটিআই সমর্থিত প্রার্থীই বেশি। ভোটের ১০ ঘণ্টা পর ফলাফল ঘোষণায় নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেছে পিটিআই। শনিবার মধ্যরাতের মধ্যে পুরো ফল না পাওয়া গেলে আজ রবিবার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন ইমরান খান।

পাকিস্তানের জিও টিভি জানিয়েছে, নির্বাচনে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্ররা ১০০টি আসনে জয়লাভ করেছেন। যদিও পিটিআই চেয়ারম্যান গহর আলি খান বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত নিশ্চিতভাবে দাবি করছি যে এই মুহূর্তে পিটিআই ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ১৭০টি আসনে জয় পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে ৯৪টি আসনে জয়ের কথা ইসিপি স্বীকার করছে এবং ফরম-৪৭ (অস্থায়ী ফলাফল) জারি করেছে। গহর আরও বলেন, ফর্ম-৪৫ অনুসারে ২২টি আসন তথা ইসলামাবাদের তিনটি, সিন্ধুর চারটি এবং পাঞ্জাবের আসনগুলোসহ পিটিআই জিতেছিল। কিন্তু সেগুলোতে পিটিআই প্রার্থীদের পরাজয় দেখানো হয়েছে। পিটিআই কেন্দ্র, খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং পাঞ্জাবেও বিজয় দাবি করেছে। বেসরকারি ফলাফল অনুসারে, পাকিস্তান মুসলিম লিগ (নওয়াজ) পিএমএলএন ৭৩ আসন জিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পেয়েছে ৫৪ আসন। অন্যান্য দল পেয়েছে বাকি আসন।

পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের মোট আসনসংখ্যা ৩৩৬টি। তার মধ্যে ২৬৬ আসন হলো সাধারণ আসন, যেগুলোতে সরাসরি ভোট হয়। বাকি ৭০টি আসন সংরক্ষিত। সেগুলোর ৬০টি নারীদের ও ১০টি অমুসলিমদের। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ আসনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসন হলো পাঞ্জাবে, ১৪১টি। সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখাওয়া, বেলুচিস্তান ও ফেডেরাল ক্যাপিটালে আছে যথাক্রমে ৬১টি, ৪৫টি, ১৬টি ও তিনটি।

নওয়াজ-ইমরান উভয়েরই বিজয় দাবি

নির্বাচনের রাতেই আসন সংখ্যার দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বলছেন, তার দলই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় দল। এই কারণে তিনি অন্যদেরও তার সঙ্গে যোগ দিয়ে সরকার গঠন করার আহ্বান জানিয়েছেন। আবার কারাবন্দি ইমরান খান ১৬তম সাধারণ নির্বাচনে তার দলের প্রার্থীরা এগিয়ে থাকায় তিনি তার ভেরিফায়েড এক্স (বর্তমানে টুইটার) অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশ সময় শনিবার মধ্যরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা এক ভিডিও বার্তা পোস্ট করেন। এক্সে পোস্ট করা সেই ভিডিওতে তিনি দাবি করেন যে তার দল পিটিআইয়ে ওপর শত দমন-পীড়ন চলা সত্ত্বেও তারা এই নির্বাচনে ‘ভূমিধস বিজয়’ অর্জন করেছেন। তার দল সমর্থিত প্রার্থীদেরকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার জন্য তিনি ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি সেখানে নওয়াজ শরিফকে একজন ‘দুর্বল নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেন যে পাকিস্তানি নাগরিকরা তাকে চায় না।

সরকার গঠন কোন পথে

নওয়াজ শরিফের দল পিএমএএল-এন দাবি করেছে, তারা পিপিপির সঙ্গে জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এর আগে নওয়াজ শরিফ শুক্রবার রাতেই তার ভাই শাহবাজ শরিফকে পিপিপি এবং ছোট দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান। যদিও পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো বলেছেন, তাদের সঙ্গে কোনো দলেরই আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তিনি দাবি করেন, তার দল ছাড়া কেন্দ্র, পাঞ্জাব এবং বেলুচিস্তানে কেউ সরকার গঠন করতে পারবে না। তার বাবা আসিফ আলি জারদারির সঙ্গে পিএমএল-এন প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরিফের সঙ্গে কেনো বৈঠক হয়েছে কি না সেই বিষয়ে তিনি ‘না’ সূচক জবাব দিয়েছেন। কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী এমনকি পিটিআই সমর্থিতদের সঙ্গেও তাদের কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান বিলাওয়াল। পিপিপির চেয়ারম্যান বলেন, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত জয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে। বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আমাদের আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’ এর আগে বিলাওয়াল দাবি করেছিলেন, নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি সেই সরকারে যোগ দেবেন না। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হবেন না।

এদিকে পিটিআই চেয়ারম্যান গতকাল ইসলামাবাদে গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। গহর আলি বলেন, ‘আমরা কারো সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাব এবং সরকার গঠন করব।’

পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান আরো বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন। পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তাই থাকবেন। গহর বলেন, সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া। পিটিআই চেয়ারম্যান জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। গহর বলেন, দলের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ। পিটিআই চেয়ারম্যান গহর বলেছেন, জোট সরকার গঠনের বিষয়ে ইমরান খানই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তার সঙ্গে আলোচনা করেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কী করতে পারেন

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পাকিস্তানি গণমাধ্যম ডন। সাংবাদিক উসাতুল্লাহ খান মনে করেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পার্লামেন্টে না এলে তাদের জন্য ফল ভালো হবে না। তার ধারণা, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সবাই মিলে একটি দল গঠনের চেষ্টা করবেন।

এ বিষয়ে আইনজীবী আবদুল মইজ জাফেরি বলেন, নির্বাচনে পিটিআই তার প্রতীক না পেলেও দলটি কিন্তু বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তিনি জানান, এর মধ্যেই পিটিআই সমর্থিত প্রার্থী সালমান আকরাম রাজা নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা না করে পিটিআই দলের প্রার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়েছেন। রাজার যুক্তি, দলীয় প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া না হলেও পিটিআইয়ের অস্তিত্ব ও কর্মকাণ্ডের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি। সাংবাদিক জারার খুহরো বলেন, স্বতন্ত্রদের সঙ্গে জোট করতে এখন অনেকেই চাইবে। তবে সেটা আসলেই ঘটবে কি না, তা বলা কঠিন। তবে অঞ্চলভেদে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

সাংবাদিক শাহজেব জিলানি আইনের বরাত দিয়ে জানান, নির্বাচিত হওয়ার পর জয়ী স্বতন্ত্ররা কোনো দলকে সমর্থন করবেন, নাকি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোনো দলে যোগ দেবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তারা ৭২ ঘণ্টা সময় পাবেন। তাই পিটিআই সমর্থিতদের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে চাইলে বিদ্যমান কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মজলিশ ওয়াহদাত-ই-মুসলিমিনের (এমডব্লিউএম) নাম শোনা যাচ্ছে, যেটি একটি নিবন্ধিত দল। এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই দুই দল জোট গঠন করেছিল। স্বতন্ত্ররা কোনো দলে যোগ দিলে সংরক্ষিত আসনও পাবেন। এতে তাদের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। দল গঠন করলে পার্লামেন্টে না যেতে চাইলে স্বতন্ত্ররা বিরোধী নেতাও নির্বাচিত করতে পারবেন।

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভোটের সময় নির্বাচনি স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, অবাধ তথ্য প্রাপ্তির সুযোগের মতো মৌলিক মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখার জন্য যুক্তরাজ্য পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছে। এক বিবৃতিতে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে এই নির্বাচনে সব দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার পানিস্তানের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। তবে তারা যে কোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন ম্যাথিউ মিলার। —ডন, আলজাজিরা ও বিবিসি

ইত্তেফাক/এমএএম