সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

জাপায় নেতারা বিচ্ছিন্ন, নিষ্ক্রিয়

  • নির্বাচনের পর থেকে তেমন কেউ দলীয় কার্যালয়ে যান না
  • রওশনকে সামনে রেখে ৯ মার্চ কাউন্সিলের চেষ্টা
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:০০

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য ঝড়ের পর এবার ‘নীরব বিদ্রোহ’ চলছে জাতীয় পার্টিতে (জাপা)। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির প্রক্রিয়া, কেন্দ্র থেকে দলীয় প্রার্থীদের খোঁজ না রাখা এবং নির্বাচনে দলের ফলাফল নিয়ে দলটিতে ক্ষোভ-অভিমানের পারদ ঊর্ধ্বমুখী। ক্ষোভে-অভিমানে নির্বাচনের পর থেকে দলের নেতাদের বেশির ভাই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। নির্বাচনের এক দিন আগেও রাজধানীর বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয় এবং কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতা-কর্মীদের বেশ পদচারণা থাকলেও এখন যেন ভাঙা হাট।

বলতে গেলে জাপার প্রেসিডিয়াম, দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ভাইস চেয়ারম্যানসহ দলটির বেশির ভাগ নেতা এবং নির্বাচনে পরাজিতরা নির্বাচনের পর থেকে দল থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে মাত্র ১১টি আসন পাওয়া জাপা শেষ পর্যন্ত সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসলেও এবং পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বিরোধীদলীয় নেতা হতে পারলেও এই নির্বাচন দলটিকে একদিকে যেমন ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, অন্যদিকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়ে অবিশ্বাসও গেড়ে দিয়েছে। ‘তারা ১১ জন’ (দলীয় এমপি) নিয়মিত সংসদে গেলেও দলটির রাজনীতির ছবিটা একেবারেই ভিন্ন। ঘূর্ণিঝড়ের পর চারদিকে যেমন ক্ষত আর একধরনের নীরবতা নেমে আসে, নির্বাচনের পর জাপার বর্তমান দৃশ্যটা অনেকটা তেমন।

নির্বাচনের আগে পর্যন্ত জাপা চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত ছিল দলের কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম, লিয়াকত হোসেন খোকা, সুনীল শুভ রায়, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, হাজি সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন ও ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এবং ভাইস চেয়ারম্যান আহসান আদেলুর রহমানের (এরশাদের ভাগিনা)। নির্বাচন-পরবর্তী দলে বিক্ষোভের ঘটনায় দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে কাজী ফিরোজ রশীদ, সুনীল শুভ রায় ও শফিকুল ইসলাম সেন্টুকে। তবে উল্লিখিত এই নেতাদের অন্যরাও এখন আর দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না। প্রেসিডিয়ামের দুই-চার জন ছাড়া আর কাউকেই এখন বনানী বা কাকরাইলের কার্যালয়ে আসতে দেখা যায় না।

সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা গতকাল শনিবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বললেন, ‘দলের প্রতিষ্ঠা থেকেই এই দলে আছি। কিন্তু, এবার নির্বাচনে আসন সমঝোতা থেকে শুরু করে সবকিছু কেমন যেন হয়ে গেল। আমরা সবাই যেন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। সময় তো এভাবে যাবে না। ব্যক্তির চেয়ে দল, দলের চেয়ে দেশ বড়।’

আগে তো প্রায় প্রতিদিনই আপনাকে বনানী অফিসে দেখা যেত, কিন্তু নির্বাচনের পর আর দেখা যাচ্ছে না, কারণ কী? এই প্রশ্নের জবাবে এরশাদের ভাগিনা আহসান আদেলুর রহমান হাসতে হাসতে ইত্তেফাককে বলেন, ‘এমনিই। ভোট করলাম তো। হেরে গেছি। মনটাও খারাপ। একটু রেস্টে আছি। আর পরশু বনানী অফিসে গিয়েছিলাম। এই তো!’ উল্লেখ্য, আদেলুর রহমান একাদশ সংসদে নীলফামারী-৪ আসনের এমপি ছিলেন। এবার সেখানে জয়ী হয়েছেন জাপা থেকে বহিষ্কৃত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা সিদ্দিকুল আলম।

বহু নাটকীয়তা শেষে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর নির্বাচনে থাকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু জানিয়েছিলেন, ২৮৩টি আসনে দলের প্রার্থীরা ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে, ২৬ জন ঐ দিনই নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ফলে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে বাস্তবে জাপার প্রার্থী ছিলেন ২৫৭ জন। এই ২৫৭ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন-সমঝোতায় জাপার যেই ২৬ জন প্রার্থীর আসনে ‘নৌকা’র প্রার্থী ছিলেন না, তারা ছাড়া অবশিষ্ট ২৩১ জনের মধ্যে প্রায় ২০০ জনই নির্বাচনের আগে এবং ভোটের দিন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। সব মিলিয়ে জাপার ৯০ শতাংশ প্রার্থীই এবারের নির্বাচনে জামানত হারিয়েছেন। আর এরশাদের ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে ১৯৯১ সালের পর এবারই সবচেয়ে কম আসন পেয়েছে জাপা। যদিও জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের দাবি, যেই নির্বাচন হয়েছে, তাতে তো একটি আসনও পাওয়ার কথা ছিল না। 

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ২৬টি আসনে সমঝোতা করে নির্বাচনে যাওয়া, সেই ২৬টির মধ্যে ১১টি আসনে জয়ী হওয়া, দলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েক নেতার আসনে সমঝোতা করতে না পারা এবং সমঝোতার বাইরে যারা দলীয় প্রার্থী ছিলেন, তাদের খোঁজ না রাখাসহ কয়েকটি কারণে দলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ গত ১০ জানুয়ারি বিক্ষোভ করে বনানী কার্যালয়ে। এর জের ধরে জাপা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে কাজী ফিরোজ রশীদ, সুনীল শুভ রায়, শফিকুল ইসলাম সেন্টু ও ইয়াহ্ইয়া চৌধুরীকে। আরও কয়েক জনকেও দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

দলের বিরাজমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের গত ৩ জানুয়ারি দলীয় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘এবারের নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনে (ইসি) দেওয়া চিঠিতে জাপাকে ‘জোট’ হিসেবে উল্লেখ করা—এটা আওয়ামী লীগ ইচ্ছা করে করেছে অথবা ভুলক্রমে করেছে। এর মাধ্যমে আমাদের চরম ক্ষতি করেছে।’ তিনি এ-ও বলেছেন, ‘এবারের নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ একটা বিভ্রান্তিকর বিবৃতি দিয়েছে যে, তারা ২৬টি আসন ছেড়ে দিয়েছে জাপার ফেভারে। বাস্তবতা হলো, তারা একটা সিটও জাপার ফেভারে ছাড়েনি। সব জায়গায় তাদের লোক দিয়ে রেখেছিল। অনেক জায়গায় আমাদের লোকদের পরাজিত করা হয়েছে। বিভ্রান্ত করা হয়েছে, আমাদের প্রার্থীও বিভ্রান্ত হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে এটাকে মহাজোট বলেছেন, অনেকে সিট ভাগাভাগি বলেছেন। আমি প্রথম দিন থেকে বলেছি, এটা মহাজোট হয়নি, সিট ভাগাভাগিও হয়নি।’

চলমান পরিস্থিতিতেই জাপায় নতুন সংকট দেখা দিয়েছে সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে দলের মনোনয়ন নিয়ে। ১১ জন এমপির বিপরীতে আনুপাতিক হারে জাপা এবার দুটি সংরক্ষিত মহিলা আসন পাবে। জাপার কো-চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম (যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান) এবং পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের স্ত্রী শেরীফা কাদের এ দুটি আসনে দলের মনোনয়ন পাচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছিল। তবে, দলের ভেতরে এ নিয়ে আপত্তি উঠেছে। ফলে, জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জাতীয় সাংস্কৃতিক পার্টির সভাপতি শেরীফা কাদেরের এবারও সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

অভ্যন্তরীণ এই সংকটের মধ্যেই দলের নেতাদের একাংশ সামনে নিয়ে এসেছেন জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদকে। তাকে সামনে রেখে দলের কাউন্সিল আয়োজনেরও তোড়জোড় শুরু করেছেন তারা। রওশন গতকাল তার গুলশানের বাসার নিচে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আগামী ৯ মার্চ জাপার কাউন্সিল হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

সামগ্রিক বিষয়ে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ইত্তেফাককে বলেন, চলতি মাসের শেষ দিকে দলের প্রেসিডিয়াম বৈঠক বা যৌথ সভা ডাকার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাভাবিক ও যৌক্তিক কারণেই অনেকের মান-অভিমান বা ক্ষোভ থাকতে পারে। আশা করছি, একত্রে বসে সবাই কথা বললে বিষয়গুলো ঠিক হয়ে যাবে।

ইত্তেফাক/এমএএম