সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি পাকিস্তান

বিভাজন আরও বাড়াতে পারে ভোটের ফলাফল

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:২৮

পাকিস্তানে নির্বাচনের ফল পেছানোর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রথম বারের মতো নির্বাচনের দিন ও পরের রাতে সারা দেশে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হয় এবং ২৪ ঘন্টা পরও পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ফলে গত দুই দিনের ঘটনাবলি দৃশ্যত বিদ্যমান বিভাজন ও রাজনৈতিক ফাটলকে আরো গভীর করেছে। পরবর্তী সরকার কোন দল গঠন কবে, তা নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি রয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারকে একদিকে নির্বাচন কমিশন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করতে দেখা গেছে, অন্যদিকে সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগকেও এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। তবে এই বিভাজন, বিভ্রান্তি ও জনরোষের ফল কী হবে-এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন।

নির্বাচনের প্রথমিক ফল সবাইকে অবাক করে, কারণ প্রত্যাশার বিপরীতে পাকিস্তান তেহরিক-ই- ইনসাফ সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে ছিলেন। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফল আসা বন্ধ হয়ে যায়। এ নিয়ে সামাজিক ও মূলধারার গণমাধ্যমে ছিল বিতর্ক, যাতে ছিল নানা প্রশ্ন ও সংশয়। মানুষের চোখ ছিল পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের দিকে, কিন্তু তাদেরও অসহায় দেখাচ্ছিল। রাত ১২টায়ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক চালু হয়নি এবং ভোট গণনার ফলও বের হচ্ছিল না।

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের ও সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বিজয়ী ঘোষণা করেন এবং ফল বিলম্বকে 'কারচুপির চেষ্টা' বলে অভিহিত করেন। একপর্যায়ে আধা ঘন্টার মধ্যে ফল আসতে শুরু করার কথা বলা হলেও রাত ৩টা পর্যন্তও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত কিছু আসেনি। সকলে আবার ঘোষণা দেওয়া হয়, ১০টার মধ্যে ফল দেওয়া হবে, কিন্তু তা-ও করা হয়নি। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য জাতিকে অভিনন্দন জানাতে দেখা গেছে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকে।

মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায়, ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায়- ফল সংগ্রহের জন্য তৈরি করা নতুন ব্যবস্থায় কাজ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এই বিবৃতির আগে নির্বাচন কমিশনেই ঘোষণা করেছিল যে ইন্টারনেট ছাড়াও নতুন ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে। অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ক্যাম্পাসে ছিল সম্পূর্ণ নীরবতা। তবে মধ্যরাতে প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ও অসমাপ্ত ফলাফলেও দেখা যায়, সবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ নিজেও পিটিআইয়ের আটক ইয়াসমিন রশিদের চেয়ে বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলেন।

এগিয়ে ইমরানের পিটিআই, তবু সরকার গঠনে অনিশ্চয়তা

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থিত প্রার্থী ও দলীয় সমর্থকেরা নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় কারচুপির অভিযোগ করে আসছেন। ইসলামাবাদ থেকে পিটিআই সমর্থিত প্রার্থী শোয়েব শাহিন বলেন, বিচার বিভাগ, যারা যে কোনো ঘটনার বিষয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে নজর দিতে পারে, তারা মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধের বিষয়টি খেয়াল করেনি এবং কেন ফল এত দেরিতে আসছে সেটাও খেয়াল করেনি। রাত পর্যন্ত তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন বলে দাবি করলেও সকালে তিনি পরাজিত হন।

গত দুই দিনের এসব ঘটনার পর ইতিমধ্যে বিদ্যমান বিভাজন ও রাজনৈতিক ফাটল আরো গভীর হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক আসমা শিরাজি বলছেন, অতীতের ভুল থেকে এবারও রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো শিক্ষা নেয়নি। তিনি বলেন, 'আমরা ভেবেছিলাম এখনই সবকিছু ঠিক হবে, আমরা অতীতের ভুল থেকে শিখব। তিনি বলেন, এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে যে, 'জনমত পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে এমন শক্তি কারা? আর এটা একবার বা দুবার নয়, ৭৫ বছর ধরে হয়ে আসছে।

ওয়াশিংটনের উইলসন সেন্টার থিংক ট্যাংকের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, 'আমি মনে করি, এই আশঙ্কার কারণ খুবই পরিষ্কার যে কেন সামরিক বাহিনী তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য শেষ মুহূর্তে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করবে এবং সেই স্বার্থ হচ্ছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে সরাসরি ক্ষমতায় আসা থেকে বিরত রাখা।'

মাইকেল কুগেলমান বলছেন যে নির্বাচনের ফলাফলের সময়, পিটিআইয়ের সাফল্যের প্রাথমিক লক্ষণ এবং তার পরে দীর্ঘ সময় ধরে ফলাফল ঘোষণা, নির্বাচন কমিশনের সম্পূর্ণ নীরবতা, সবই শেষ মুহূর্তের কারচুপির পূর্বাভাস দেয়। তিনি বিশ্বাস করেন, পাকিস্তান এমন একটি ফলাফলের দিকে যাচ্ছে, যা জনগণের ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করে না। এটি পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতন্ত্রের জন্য আরেকটি আঘাত হবে।

এই নির্বাচনের পর দেশে স্থিতিশীলতা আসবে তো?

এই মুহূর্তে, এটি কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলো এখনও বিভক্ত বলেই প্রতীয়মান। আসমা শিরাজির মতে, স্থিতিশীলতা আসা উচিত। সবাইকে বসার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাঞ্জাবে একটি কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, তবে এটিও সত্য যে একটি পক্ষ জিতছে। তবে এখন আমাদের সংলাপে যাওয়া উচিত। যদি তা না হয়, তাহলে এটি চলতে থাকবে এবং আমরা সেভাবেই চলতে থাকব। এখন ইমরান খানের ও কথা বলা উচিত... জনগণ যদি ফল মেনে না নেয় এবং রাস্তায় নামে।

মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, 'আমি মনে করি না এই নির্বাচন পাকিস্তানে স্থিতিশীলতা আনবে। তারা ইতিমধ্যে মেরুকৃত দেশকে আরো বিষক্ত করবে। পাকিস্তান শুধু চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখিই নয়, সন্ত্রাসবাদও আবার বাড়ছে। বিশ্ব কীভাবে একটি অস্থিতিশীল পাকিস্তানকে দেখবে এবং বিশ্বশক্তির কাছে এর অর্থ কী, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এটি লক্ষ করা উচিত যে পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং এটি এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যা আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে, সম্প্রতি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও পাকিস্তানের পালটা হামলা দেশটিকে আবারও বিশ্বের মানাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। একদিকে সন্ত্রাসবাদ বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে এবং চীন পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আসমা শিরাজির মতে, বাকি বিশ্বের পাশাপাশি পাকিস্তানের জনগণেরও নিজের দেশকে শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, পাকিস্তান এমন একটি দেশ, যার সীমান্ত এলাকা শান্তিপূর্ণ নয়। পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক শক্তি রয়েছে, যা পশ্চিমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা জরুরি।

মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, এটি এমন একটি দেশ, যেখানে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। এই দেশের সীমান্তে সংঘাত অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ বাড়ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের। মধ্যে রয়েছে গভীর বিভাজন। এই নির্বাচনি সংকট দেশের সমস্যা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফল থেকে মনে হচ্ছে যে দেশের পরবর্তী সরকারও জোট দলগুলোর দ্বারা গঠিত হবে এবং কোনো একক দলের আধিপত্য থাকবে না।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর একসঙ্গে বসার ও আলোচনা এবং আসন্ন নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি ব্যবস্থা তৈরি করার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

ইত্তেফাক/এনএন