শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

৪০ বছরের পুরোনো জনবল কাঠামোতেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪:০৭

৪০ বছরের পুরনো জনবল কাঠামোতেই চলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নতুন প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম অধিদপ্তর থেকে তিন দফা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। অর্থাৎ গোড়ায় গলদ। ১৯৮৪ সালের অর্গানোগ্রাম দিয়ে চলার কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে।

এদিকে, ১৯৮৪ সালে সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে বেড ছিল ৪ হাজার। বর্তমানে বেড সংখ্যা ৭১ হাজার। সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো চলছে ২০০৮ সালের অর্গানোগ্রামে। এ কারণে ডাক্তার-নার্সদের উপরে চাপ পড়ছে অনেক বেশি। ভেজাল খাবার ও পরিবেশসগত কারণে প্রতিদিনই ক্যান্সার, কিডনিসহ মরণব্যাধী রোগী ব্যাপক হারে বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় ডাক্তার-নার্সের সংখ্যা সীমিত। ভুল চিকিত্সায় রোগীর মৃত্যু, সুচিকিৎসা নিশ্চিত না হওয়া, কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে ডাক্তারদের অনেক দোষ ধরা হয়। কিন্তু তাদের সুযোগ-সুবিধা কতটুকু দেওয়া হচ্ছে সেটা দেখা হয় না। বেতন-ভাতা ও পদোন্নতি নিয়ে চিকিৎসক-নার্সদের মধ্যেও রয়েছে চরম ক্ষোভ। স্বাস্থ্য খাতের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য যে জনবল দরকার যেটা বাস্তবায়নে বড় বাধা হলো মন্ত্রণালয়।   

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, এ ব্যাপারে অব্যশ্যই কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমান সরকার দেশের স্বাস্থ্য সেক্টরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যখন যা প্রয়োজন তাই করেছে। কিন্তু তা সঠিকভাবে পরিচালনা হচ্ছে না। বিশেষায়িত বিভাগ যাদের দায়িত্বে তারা সাবজেক্ট সম্পর্কে জানে না। এ কারণে যে চাহিদা দেওয়া হয়, তা বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়। অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী জনবল ১০ জন চাইলে দেওয়া হয় ১ জনকে। তাহলে ১০ জনের কাজ একজন কিভাবে করবে? সারাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে পুরনো অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী যে জনবল থাকার কথা, তার তিন ভাগের এক ভাগও নেই। তাহলে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সরা রোগী সামাল দিবে কিভাবে? এ কারণেই সুচিকিৎসা সেবা থেকে বেশিরভাগ রোগী বঞ্চিত হচ্ছেন। 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, পুরনো অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতালগুলো চলতে থাকলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হবে। মানুষ সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে। যাদের টাকা আছে তারা বিদেশমুখী হবে। দেশের চারটি বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল হলো, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ণ এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট এন্ড হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল ও চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। সেখানেও রয়েছে চাহিদা অনুযায়ী জনবল সংকট। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহিঃবিভাগে প্রতিদিন ১০ হাজার রোগী আসেন। একজন ডাক্তার দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী দেখেন। সারাদেশ থেকে রোগী এখানে আসছে। জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় কয়েক হাজার রোগী আসেন। সীমিত জনবল দিয়ে তা সামাল দেওয়ার দুঃসাধ্য। কিন্তু তা কতক্ষণ সম্ভব হবে? অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে রোগীর চাপে চিকিৎসা সেবার অনুরূপ অবস্থা। জেলা-উপজেলার হাসপাতালে অপারেশন করার জনবলসহ সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে রোগীরা এভাবে শহরমুখী আসতে হতো না। ডাক্তাররা এতো সার্ভিস দিয়েও বদনামের শিকার হচ্ছেন। অথচ পদোন্নতি পেতে ডাক্তারদের ভোগান্তির শেষ নেই। একজন মেডিক্যাল অফিসার থেকে কনসালটেন্ট কিংবা সহকারী অধ্যাপক হতে ১২ বছর লাগে। আবার সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক হতে একই সময় লাগে। সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হতেও এক যুগও লেগে যায়। এতো সার্ভিস দিয়ে আর্থিক সুবিধা-সুবিধা কম হওয়ার কারণে ডাক্তাররা প্রাইভেট প্রাকটিসসহ বিভিন্ন ইনকামের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। এ কারণে রোগীদের প্রতি বেশি মনযোগ দিতে পারছেন না। ইন্টার্নি ডাক্তারদের মাত্র ২৫ হাজার টাকা দেওয়া মাসে। তাও আবার ছয় মাসে একবার দেওয়া হচ্ছে। ইন্টার্নি ডাক্তাররা বেশিরভাগ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এ কারণে ডাক্তারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এসব কারণে মেধাবিরা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে নিরুত্সাহিত হচ্ছেন। তারা ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন পেশা এমনকি বিদেশে চলে যাচ্ছেন। একটি ক্যাডারের কাছে একটি বিশেষায়িত বিভাগের পদোন্নতিসহ বেশিরভাগ বিষয় নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ভবিষ্যতে চিকিত্সা সেবাসহ বিভিন্ন সাব স্পেশালাইজ বিভাগ পরিচালনার কারণে মেধাবী জনবলের বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে। জনগণ প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে এমন দুরবস্থা থাকলেও দুর্নীতির ক্ষেত্রে এই খাত সর্বাধিক। 

অর্থাৎ চিকিৎসা সেবা দিতে মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করছেন তারাই ভুক্তভোগী হচ্ছেন। পৃথিবীতে শিক্ষক, চিকিৎসক ও পুলিশ-এই তিন সার্ভিসের মানুষের সুযোগ-সুবিধা বেশি দেওয়া হয়। জরুরি সেবার ক্ষেত্রে পৃথিবীর কোথায় আপোষ করছে না। কিন্তু বাংলাদেশ চলছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। চিকিৎসকরা উপযুক্ত বেতনসহ সুযোগ-সুবিধা পেলে প্রাইভেট প্রাকটিসের দিকে ধাবিত হতো না। তারা চিকিৎসা পেশার উন্নয়নে মনোনিবেশ করতেন। বর্তমানে পুলিশ যে সার্ভিস দেয়, সেই তুলনায় তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা সীমিত। তারা উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে আইন-শৃঙ্খলা ভালো থাকবে, জনগণও সঠিক সেবা পাবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পুলিশের একজন ওসির পোস্টিং নিতে অর্ধ কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়। ওই ওসি থানায় গিয়ে কি সার্ভিস দেবে? এসব কারণে থানায় ঘুষ ছাড়া কোন সেবা মেলে না। এখন এ কথা মানুষের মুখে মুখে। শিক্ষকদের বেতন সর্বনিম্ন। কারণে তারা নিয়োজিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুশিক্ষা দিচ্ছেন না। তারা টিউশনি করার কাজে ব্যস্ত থাকেন। অথচ তার উপযুক্ত বেতন পেলে স্কুলেই শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা দিতেন। দেশের নার্সদের মধ্যে এমডি, এমএস, এমপিএইচসহ উচ্চতর ডিগ্রিধারী সহস্রাধিক নার্স রয়েছেন। কিন্তু তাদের পদ সিনিয়র স্টাফ নার্স। পদোন্নতিও নেই। তার উপর নার্সদের মধ্যে দুটি গ্রুপ বানানোর চেষ্টা করছে মন্ত্রণালয়। নার্সদের মধ্যে যে যে ডিগ্রির নিয়েছেন, তাদের সেখানে হাসপাতাল ও কলেজে পদায়ন করা উচিত। কিন্তু করা হচ্ছে উল্টোটা। প্রধানমন্ত্রী এন্ট্রি পয়েন্টে নার্সদের দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তার পদ মর্যাদা দিয়েছেন। এই অনুযায়ী তাদের পদোন্নতি পাওয়ার কথা। কিন্তু সবাই চলতি দায়িত্বে, নিজ বেতনে। নার্সিং সেবাও চলছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। অর্গানোগ্রাম পরিবর্তন করে নার্সদের দিয়ে অধিদপ্তর পরিচালনা করলেই সারাদেশে নার্সিং সার্ভিসটা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হবে অনেক চিকিৎসক জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেন, সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন যে জনবল কাঠামো প্রস্তুত করেছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। ১৯৮৪ সালের অর্গানোগ্রামে চলছি আমরা। তিন দফা নতুন অর্গানোগ্রামের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফেরত পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, নতুন অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী জনবল নিয়োগ এবং ডাক্তারদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বিএমএ এর পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে। ডাক্তারদের বেতন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। জনবল সংকট আছে। তারপরও অপারেশন করতে গিয়ে রোগীর মৃত্যু কখনোই কাম্য নয়। তিনি বলেন, আগে বিএমএ এর সঙ্গে সমন্বয় করে স্বাস্থ্য খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। কিন্তু এখন তা হয় না। এটা বড় ধরনের ঘাটতি।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব ডা. কামরুল হাসান মিলন বলেন, চিকিৎসকদের অর্জন অনেক। কিন্তু নেগেটিভ একটু কিছু হলে ব্যাপকভাবে তা প্রচার হয়। সীমিত জনবল দিয়ে ডাক্তাররা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছু দিন আগে একজন নারী চিকিৎসককে মারধর করা হয়েছে-এটা কাম্য নয়। একজন ডাক্তার কতক্ষণ পর্যন্ত সার্ভিস দেবে।

বিএসএমএমইউয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান বলেন, পেশাভিত্তিক প্রশাসন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব না। যে যে পেশার সেই পেশার দক্ষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতে হবে। আধুনিক যুগে পুরনো অর্গানোগ্রাম দিয়ে চলতে পারে না। 

ইত্তেফাক/এমএএম