সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

জীবনের জটিলতম জটিলতা 

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:০১

জ-তে জীবন, জ-তে জটিলতা। জীবন মানে যেন জটিলতা। তবে জ-তে তো জলও হয়। চাইলে জীবনটাকে জলের মতো স্বচ্ছ আর সরলও রাখা যায়।

জীবন সহজ নাকি জটিল, এ নিয়ে নানা জনের আছে নানা মত। জীবন কারো কাছে বড্ড জটিল অঙ্ক। আবার কারো কাছে খুব সহজ হিসাব। তবে যারা জীবনকে সহজ বলছেন, তারা কি অনায়াসেই সহজ জীবন পেয়ে গিয়েছেন, নাকি জীবনকে সহজ করে তুলেছেন? প্রশ্নটি জীবনঘনিষ্ঠ। তাই এর উত্তরও জীবনঘনিষ্ঠ হওয়া চাই।

আমাদের ধারণা পৃথিবীর সব ঘটনাই জটিল। আসলেই কি তাই? এমন হতে পারে না যে, যে-সকল ঘটনা আমরা জটিল মনে করি তাই জটিল, বাকিগুলো আমরা মনে করি সহজ তাই সহজ। তার মানে সব ঘটনাই সহজ-স্বাভাবিক। সব জটিল সমস্যারই একটি সহজ সমাধান থাকে। যার ঐ সহজ সমাধান জানা আছে তার কাছে ঐ ঘটনা সহজ, যার জানা নেই তার কাছে জটিল। সমস্যা সম্পর্কে জানতে এবং সমস্যার সমাধান বের করতে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। আর তার জন্য দৃষ্টিভঙ্গির দরকার হয়। তাছাড়া আর কিছুই না।

উদাহরণস্বরূপ, গণিতের অনেক শাখা আছে। এক-এক জনের এক-এক শাখা জটিল মনে হতে পারে। কারো হয়তো বা ত্রিকোণমিতি সহজ লাগতে পারে। আবার কারো ক্যালকুলাস। আবার যার ক্যালকুলাস সহজ লাগে তার কাছে ত্রিকোণমিতি কঠিন লাগতে পারে। মানে কী দাঁড়াল? দুটি ঘটনাই সহজ-স্বাভাবিক। কিন্তু জটিলতা এবং সরলতা নির্ভর করে কে কার জ্ঞান কে কোন দিকে বর্ধিত করেছে তার ওপর। এক্ষেত্রে আইনস্টাইন সঠিক। জটিলতা ও সরলতা আপেক্ষিক বিষয়। এক্ষেত্রে জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির সাপেক্ষে বিবেচনা করা হচ্ছে জটিলতা।

সকল জটিলতাকে জয় করতে হয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। চিন্তা চেতনা জ্ঞান দিয়ে। মানুষ তাই করে আসছে শত শত বছর ধরে। তাই করা উচিত নয় কি? ছোট শিশু যখন পেনসিল হারিয়ে কান্না শুরু করে দেয় (জটিলতার সূচনা), মা তখন সান্ত¡না দেন। বলেন, একটা পেনসিল গেছে, আরো পাওয়া যাবে। তেমনি জীবনে কত জিনিস আসবে-যাবে, এটাই জীবন। ছোটবেলাতেই খুব উচ্চ মানের ফিলোসফি কপচানো হয় জটিলতা দূরীকরণের জন্য। ছোট শিশুর জটিলতা ছোট। কিন্তু তা তার কাছে অনেক বড়ো। তার এই জটিলতা যদি দূর করা যায়, আমাদের জীবনের জটিলতা কেন দূর করে আমরা হাসিখুশি থাকতে পারি না?

সব মানুষই ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে ওঠে। একদিন মারা যায়। রয়ে যায় কিছু জটিলতা। কিছুকে হয়তো জয় করা হয়। কিছুকে হয়তো নয়।

আমাদের জীবনকে জটিল করে কে? উচ্চাশা? বলাটা হয়তো ভুল হবে না। উচ্চমানের ফিলোসফিগুলো কিন্তু একপ্রকার উচ্চাশার বাণীই। মায়ের কথাই ধরা যাক। শিশুকে বললেন যে, আরো পাওয়া যাবে। শিশু নতুন স্বপ্ন ও আশা নিয়ে বুক বাঁধে। উচ্চাশা চর্চা তাহলে জটিলতা দূরীকরণের মাধ্যমে শুরু হয় এবং তা দিয়েই নতুন জটিলতার সূচনা হয়।
অনেকেই আছেন, যাদের জীবনে উচ্চাশা নেই। আসলেই কি আছেন? হয়তো এটার ক্ষেত্রে আইনস্টাইনের থিওরি আনতে হবে। উচ্চাশা আসলেই আপেক্ষিক। কারো কাছে উচ্চাশা 'অর্থ', কারো কাছে 'বিদ্যা'। কিন্তু উচ্চাশা উচ্চাশাই। যা মূলত জটিলতার সূচনা।

এখন একটা প্রশ্ন। জীবনকে জটিল আসলে করে কোনটি?
১. দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞান
২. উচ্চাশা

অনেক জটিল প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে। তর্কবিদরা তর্ক করবেন হয়তো উচ্চাশা জীবনকে জটিল করে না। করে জ্ঞানের অভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু ওপরের লেখায় ক্ষীণ হলেও কি প্রমাণিত হয় না যে, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে উচ্চাশার অবতারণা জীবনকে আরো জটিলতার দিকে ঠেলে দেয়?

তাহলে সমাধান কী? জটিলতার সমাধান চাওয়া, আরো অনেক বড়ো জটিলতাকে ডেকে আনা নয় কি?

তারচেয়ে বরং, ঘুম আর নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট করে অর্থ উপার্জন নয়। সবচেয়ে বড়ো বিনিয়োগ হলো আত্ম-উন্নয়নমূলক বিনিয়োগ। আত্ম-উন্নয়নে যত বিনিয়োগ আছে, এর ভেতর সবচেয়ে ভালো হলো শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। আপনি যে রিকশায় করে অফিসে এলেন, সময়মতো নিরাপদে কর্মস্থলে নিয়ে আসার জন্য ভাড়ার সঙ্গে চালককে একটা ধন্যবাদ দিলে কী ক্ষতি! দৈনন্দিন জীবনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অনুশীলন করা উচিত। নিজেকে কখনো কোনো অবস্থায় অন্য কারো সঙ্গে তুলনা নয়। মনে রাখা উচিত, প্রত্যেক মানুষ স্বতন্ত্র। কারো সঙ্গে কারো তুলনা হয় না। কেবল নিজের সঙ্গে নিজের তুলনা চলে।

কখন থামবেন, এটা জানা খুবই জরুরি। যেকোনো কাজ, ব্যবসা, সম্পর্ক, সবকিছুরই একটা শেষ থাকে। কখন থামতে হবে, এটা বুঝতে পারা খুব দরকার। নিজের সুখের চাবিকাঠি যতটা সম্ভব নিজের কাছে রাখা দরকার। নিজের জন্য নিজে যথেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ব্যর্থতা, খারাপ সময়কে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে নেওয়া উচিত। পৃথিবীতে কোনো মানুষের জীবন কেবল সফলতা বা কেবল সুসময় দিয়ে লেখা হয় না। ভালো ও মন্দ উভয়ই জীবনের স্বভাবিক অংশ। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাটা বেশ প্রসঙ্গিক, ‘সত্যরে লও সহজে’।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন