বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

লেখকের ভাবনা

বইমেলা নিয়ে নানা মধুর স্মৃতি মনে বাজে

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫:৪২

মুক্তিযুদ্ধের ফসল ভাষাভিত্তিক আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ। একাত্তর আমাদের বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছে। বাহাত্তরে আমি এক টগবগে তরুণ। বাংলা ভাষায় কিছু লেখার জন্য মনটা মুখিয়ে ছিল। তাই আমি আর ইউসুফ হাবিবুর রহমান দুই বন্ধু মিলে লিখে ফেললাম বাংলাদেশের অর্থনীতি। ছোট্ট বই। নিউ মার্কেটে এক বইয়ের দোকানে দিলাম বিক্রির জন্য। সেই থেকেই বাংলায় অর্থনীতি লেখা শুরু করি।

দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক বাংলায় লিখতাম সেই  ছাত্র অবস্থা থেকেই। লিখতে হলে পড়তেও হয়। তার কিছুদিন পরেই ‘দৈনিক পিপল’-এ কাজ পেলাম। এর বাংলা সহযোগী গণবাংলাতেও লিখতাম। পাশাপাশি লিখতাম ইংরেজি পত্রিকা বাংলাদেশ অবজার্ভারে। লিখতে লিখতেই কবে যে লেখক হয়ে গেলাম তা বলা মুসকিল।

আমার লেখক পরিচয় পোক্ত হবার বহু আগেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার শুরু। চিত্তরঞ্জন সাহার মুক্তধারার সীমিত বই প্রদর্শনী থেকে চোখের সামনেই এই বইমেলার দ্রুত বিস্তার ঘটল। বছরে বছরে তার কলেবর বাড়ল। লেখকদের প্রাণবন্ত আড্ডার এক নিশ্চিত ঠিকানায় পরিণত হলো বাংলা একাডেমির এই বইমেলা। হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হকদের কল্যাণে তরুণদের অটোগ্রাফ নেওয়ার লাইন পড়ে যেতেও দেখলাম এই মেলায়। অন্যান্য কবি-লেখকদেরও মেলায় আসা এবং আড্ডা দেওয়ার মাধ্যমে বইমেলা এক নতুন মাত্রা পেল। মনে পড়ে কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী এবং মহাদেব সাহাদের মতো দেশ বরেণ্য কবিদের সঙ্গে প্রায়ই আড্ডা দিতাম বইমেলায়।

বইমেলা বাস্তবে প্রকাশকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফসল। শুধু লাভের জন্য তারা বই প্রকাশের এই গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন সেটা বললে পুরোটা বলা হবে না। এটা তাদের প্রাণেরও বিষয়। আর অনেক প্রকাশক রয়েছেন যারা প্রাণের তাগিদেই বই ছাপেন। সারা বছর মুখিয়ে থাকেন নতুন বই ছাপবেন বলে। হয়তো সব বই বিক্রি হয় না। তবু নিজের পুঁজি ভেঙে বই ছাপেন। আজকাল ডলারের দাম বেড়ে যাবার কারণে কাগজের দাম বেশ বেড়েছে। তবুও তাদের বই ছাপানোর চেষ্টার কমতি নেই।

বাংলা একাডেমিও নিয়ম কানুন জারি রেখে এবং প্রকাশক সমিতির সঙ্গে সমন্বয় করে এই মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল একাডেমি প্রাঙ্গণেই মেলাটি হতো। এরপর সামনের সড়কের দুই ধারে মেলা বসতো। অবশেষে তা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিস্তৃত হয়েছে। এখন মেলাটি বেশ খোলামেলা জায়গায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে প্রাণ খুলে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। লেখক ও পাঠকদের সত্যিকার প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে বই মেলাটি। শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট দিনে মেলাটি উত্সর্গ করায় তাদের মনের জানালা খুলে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকেও অনেক দর্শনার্থী ও বইয়ের ক্রেতা মেলায় আসেন নস্টালজিয়ার টানে। অনেক প্রবাসী বাঙালিও এই সময় দেশে আসেন বইমেলায় আনন্দ উপভোগের আশায়। সব মিলে বইমেলাটি আসলেই আমাদের সংস্কৃতির এক নয়া অনুসঙ্গে পরিণত হয়েছে।

বইমেলা নিয়ে লেখক হিসেবে কতো মধুর স্মৃতি আজও ঘুরে ফিরে মনে বাজে। যখনই নতুন কোনো বই বের হতো তখনই প্রকাশনা সংস্থার স্টলে যাওয়া এবং কেমন বিক্রি হচ্ছে তার খোঁজ নিতাম। এখন আর তেমন করে যাওয়া হয় না। তবে এখন নতুন বই বের হলে ছোটখাটো প্রকাশনা উত্সবের আয়োজন করে ফেলেন প্রকাশকরা। এ বছর আমার পাঁচ-ছয়টি বই বের হবার কথা। দুটো বের হয়ে গেছে। বই বের হলে সন্তান লাভের আনন্দের মতোই প্রাণে বাজে। এই বইমেলাতেই এক দিন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিয়েছিলাম। সেসব মধুর স্মৃতি বারে বারে মনে পড়ে।

বই কিনুক বা না কিনুক বইমেলাতে যেসব তরুণ আসে তারা নিশ্চয় বই ভালোবাসে। তারা বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। ডিজিটাল প্রযুক্তির চাপে হয়তো একদিন অনেক বই আর আজকের মতো ছাপা হবে না। কিন্তু তবু কাগজের বই সহসাই নিঃশেষ হবে না। নতুন বইয়ের গন্ধ নাকে নেওয়ার লেখক ও পাঠকের সংখ্যা একেবারে নগণ্য হয়ে যাবে আমার কিন্তু তা মনে হয় না। যন্ত্রের কাছে মানুষের আবেগ পুরোপুরি হেরে যাবে এ কথা বিশ্বাস হয় না।

ইত্তেফাক/এনএন