শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ক্ষুদ্ধ হয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও শিক্ষাসচিব সোহরাব হোসেন। গতকাল বুধবার প্রকল্পের মূল্যায়ন সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে গিয়ে তারা এ ক্ষোভের কথা জানান।
শিক্ষাসচিব বলেন, শিক্ষার অনেকগুলো প্রকল্পে অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে তা আমরা ধরেছি ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। তিনি বলেন, নিষেধ থাকা সত্ত্বেও একজন প্রকল্প পরিচালক বিল পরিশোধ করেছেন। তাকে বলা হয়েছিল ঠিকাদারের কাছ থেকে মালামাল ঠিকমতো বুঝে পেয়েছেন কি-না, কার্যকর আছে কি-না তার পর যেন তিনি বিল পরিশোধ করেন। কিন্তু তিনি তা না করেই বিল পরিশোধ করেছেন।
তিনি বলেন, প্রকল্প পরিচালক যে না বুঝে করেন তা নয়। তারা বুঝে শুনেই অনিয়ম দুর্নীতি করছেন। এসব তথ্য প্রমাণ আমার কাছে আছে। আমাদের সব বিষয়ে স্বচ্ছ হওয়া উচিত। কোনো বিষয় বাধা থাকলে শিক্ষামন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী আছেন। তা না করে আইনের বাইরে গিয়ে জোর করে করা ঠিক নয়। তিনি অভ্যন্তরীণ অডিট করার কথা বলেন।
গতকাল শিক্ষার ১৫ প্রকল্প নিয়ে মনিরটিং রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। কিন্তু মনিটরিং রিপোর্টে শুধুই সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অন্য কোনো বিষয় তুলে ধরা হয়নি। এ বিষয়ে শিক্ষাসচিব বলেন, পরিবীক্ষণে প্রকল্পের এসব অব্যবস্থাপনা অনিয়ম উঠে না আসে তাহলে এভাবে মনিটরিং করে কোনো লাভ নেই। এগুলো শুধুই আনুষ্ঠানিকতা। বছরে একবার প্রকাশ করা হবে। কয়েকজন ঢাকায় থাকার সুযোগ পাবে । রিপোর্টে তা তুলে ধরা না হলে সব চাপা পড়ে যাবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
সচিব বলেন, মনিটরিং হতে হবে নিখুঁত। শুধু টাকার খরচের হিসাব তুলে ধরলেই হবে না। এই টাকা খরচের ক্ষেত্রে সকল নিয়ম কানুন মতো হয়েছে তাও তুলে ধরতে হবে। যথাসময়ে হয়েছে কি-না। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ হলে নানা সুবিধার কথা তুলে ধরেন সচিব। এদের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হলে যারা অনিয়মের সাথে যুক্ত থাকে তাদের চিন্তা করতে হবে।
আর অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, একই ব্যক্তি একই প্রকল্পে থাকলে কাজের গতি কমে যায়। এছাড়া প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষ ও অভিজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি প্রকল্পের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার সাথে কাজ করার নির্দেশ দেন।
শিক্ষার মানোন্নয়ন সংক্রান্ত ১৫টি প্রকল্প চালু আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের অধীনে। কিন্তু এর মধ্যে ১৩টি প্রকল্পের ওপর মূল্যায়ন করা হয়। দুটি প্রকল্পের অগ্রগতি খুবই নগণ্য হওয়ায় মন্ত্রী-সচিবের সামনে এই দুটি প্রকল্পের মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রচলন (পর্যায়-২) প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০১৬ সালে নেওয়া এ প্রকল্প ২০২০ সালে শেষ হওয়ার কথা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ওই প্রকল্পের অগ্রগতি দশমিক ৩ শূন্য ভাগ। প্রকল্পের মূল কাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। কিন্তু মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম কিনতে গিয়ে আর্থিক নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন প্রকল্পেও সাবেক পরিচালক ও বর্তমান পরিচালক।
ন্যাশনাল একাডেমি ফর অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিস-এবিলিটিস প্রকল্পের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বেতন ভাতাসহ ওই প্রকল্পে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে। প্রকল্পের মূল কাজ ছিল একটি অটিস্টিক একাডেমি স্থাপন করা। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। এরপর মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানো হয়। এ সময়েও ব্যর্থ হওয়া প্রকল্পের মধ্যে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ সময়ে এসে শুধু জমি অধিগ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ, যদিও এ প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে। তাতেও কাজে গতি আসেনি।
নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য প্রকল্প-টিকিউআই, উপবৃত্তি প্রকল্প, সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রকল্প, তথ্য প্রযুক্তিও সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজসমূহের উন্নয়ন প্রকল্পেও।
মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন একই সঙ্গে একটি প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। জেনারেশন ব্রেক থু্র নামের ওই প্রকল্পের অগ্রগতি কাগজে কলমে ৯১ ভাগ দেখালেও বাস্তবে মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তা তুলতে গিয়ে কমিশন গুনতে হয়েছে শিক্ষকদের।
শিক্ষামন্ত্রী একই সঙ্গে এক ব্যক্তিকে একাধিক পরিচালক না হতে নির্দেশ দিয়েছেন। ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া মাউশি অধিদপ্তরের আওতাধীন ১৫টি প্রকল্পে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
