সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্রলীগের সংঘাতের নেপথ্যে কিছু শিক্ষকের স্বার্থ

  • দুই গ্রুপের সংঘর্ষে প্রক্টরসহ ১৫ জন আহত
  • স্থানীয় দুই নেতা নিয়ন্ত্রণ করেন দুইটি গ্রুপ
  • দুই যুগ ধরে চলছে এই হানাহানি
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:২৫

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় দুই শীর্ষ নেতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও গ্রুপ আছে। তারা ছাত্রলীগের ঐ দুই গ্রুপকে ব্যবহার করেন। এসব কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ বন্ধ হচ্ছে না। কয়েক যুগ ধরে চলছে এই হানাহানি। পূর্বশত্রুতার জেরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুই উপগ্রুপ বিজয় ও সিক্সটি নাইনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরসহ উভয় গ্রুপের অন্তত ২২ নেতকর্মী আহত হয়েছেন। বর্তমানে একটি গ্রুপ ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ভীতসন্ত্রস্তের মধ্যে অবস্থান করছেন। পড়ালেখার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিয়ে সম্ভব না। সুষ্ঠু পরিবেশ ও লেখাপড়ার বৃহৎ স্বার্থে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অভিযোগ আছে, এই ছাত্রলীগ গ্রুপের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ রাজনীতির একক আধিপত্য। তবে ১৫ বছর আগে এখানে শিবিরের একক আধিপত্য ছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রায় দিনই ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। ঐ সময় হতাহতের ঘটনা ছিল সর্বাধিক। বর্তমানে শিবির চক্র ক্যাম্পাস ছাড়া। অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি একেবারেই দুর্বল। ফলে ছাত্রলীগ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ক্যাম্পাস রাজনীতি। অথচ এই ছাত্রলীগ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিষফোড়ায় পরিণত হয়ে আছে। সংঘর্ষ, হত্যা, দলাদলি, গ্রুপিংসহ নানা কারণে এই ছাত্রলীগ গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত হয়ে অছাত্রদের সমন্বয়ে ক্যাম্পাস জুড়ে অসুস্থ রাজনীতির বিষবাষ্প ছড়িয়ে যাচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীর জীবন অনিশ্চয়তায় পড়ছে, তেমনি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনছে।

ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপই বিভিন্নভাবে চাঁদাবাজির ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। যেহেতু স্থানীয় দুই শীর্ষ নেতা দুই গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তাই তাদের কিছুই হয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, বিভিন্ন সময় সংঘর্ষের ফলে মামলা দিলেও ঐ দুই শীর্ষ নেতার কারণে চার্জশিট দেওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেকায়দায় রয়েছে। মামলা দিলেও ফলাফল শূন্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়টি পড়েছে হাটহাজারী থানা এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসি পাহাড় ঘেরা।  সংঘর্ষ হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ততক্ষণে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা পাহাড়ে চলে যান। পরে তারা সেখান থেকে পুলিশের ওপর পালটা হামলা করে। গত ১৫ বছরে দুই গ্রুপের মধ্যে কমবেশি সংঘর্ষ চলে আসছে। তবে ১৫ বছর আগে শিবির নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পাস থাকায় প্রায় দিনই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। ঐ সময় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এই প্রশাসনের পক্ষে এই সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। দুই গ্রুপের শিক্ষকরাই নেপথ্যে তাদের স্বার্থে নানাভাবে ব্যবহার করে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রলীগের লেখাপড়া ও নিরাপত্তার স্বার্থে মঞ্জুরি কমিশন কিংবা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না।

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুী নওফেল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যারা সংঘর্ষে লিপ্ত হবে, মাস্তানি করবে তাদের টিসি দিয়ে বের করে দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলেছেন। এটাও বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এ ব্যাপারে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি নূরে-আলম মিনা বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যা যা করার আমরা করে যাচ্ছি।’

চট্টগ্রাম জেলা এসপি এস এম শফিউল্লাহ বলেন, সংঘর্ষের পর সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হাটহাজারি থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, গতকালের সংঘর্ষের ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। তবে আগের সংঘর্ষের ঘটনায় একটি মামলা রয়েছে।

আমাদের চবি সংবাদদাতা বলেন, ইট-পাটকেল ও দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে আহত নেতাকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিত্সা দেওয়া হয়। এদের মধ্যে চার জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায়  চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে বিবাদে জড়ায় গ্রুপ দুটি। এ সময় লাঠিসোঁটা, রামদা ও কিরিচসহ দেশীয় অস্ত্রের মহড়া দেয় নেতাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরের সামনে বিজয় গ্রুপের নেতা-কর্মীদের মারধর করেন সিক্সটি নাইনের কর্মীরা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সংঘর্ষ শুরু হয় দুই গ্রুপের মধ্যে।  এ বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের বিজয় গ্রুপের একাংশের নেতা সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী রাশেদকে আগের ঘটনার জের ধরে চলমান পিঠা উৎসবে তারা মারধর করে। সেই মারধর থেকে রূপ নেয় সংঘর্ষে। সিক্সটি নাইন গ্রুপের নেতা ও সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সাঈদুল ইসলাম সাঈদ বলেন, ‘বিজয় গ্রুপের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের অনুপ্রবেশকারী কেউ থাকতে পারে। কারণ বারবার তাদের পক্ষ থেকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। আমরা এখন সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে এনেছি। তবে দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকায় এ ধরনের সংঘর্ষ বারবার হচ্ছে।’

প্রক্টর অধ্যাপক ড. নুরুল আজিম সিকদার বলেন, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। এখন দুই পক্ষকেই হলে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম