মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মাদকাসক্তদের অন্ধকার জীবনে আলো ফেরাচ্ছে ‘ওয়েসিস’

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৩৮

রাজধানীর বারিধারায় বাড়ি। টাঙ্গাইলে রয়েছে পৈতৃক তেলের মিল। ব্যবসা-বাণিজ্য করে বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভালোই সুখে কাটছিল ফাইয়াজ হোসেনের (ছদ্মনাম)। করোনার লকডাউনের আগে দেশের বাইরে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে যান। লকডাউনে আটকে গেলে সেখানেই কাটিয়ে দেন প্রায় পাঁচ মাস। এরই মধ্যে বন্ধুদের নিয়ে ঐ দেশে মাদক সেবন শুরু করেন। একটা পর্যায়ে ঢাকা থেকে তার কাছে টাকা পাঠানো হতো। ঐ টাকা দিয়ে দিনরাত মাদক সেবন করতেন। দেশে ফিরে এলে তার মাদক গ্রহণের মাত্রা বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে মাদক সেবন করতে করতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামে। সংসারে বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। মাদকের টাকা না পেলে বাবা-মা ও স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালান। মাদকের পেছনে টাকা খরচ করতে গিয়ে ফাইয়াজ নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ী শফিকুর রহমান (ছদ্মনাম) পড়াশোনার জীবন  শেষ করে নিজেই হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তা। নিজ এলাকায় গড়ে তোলেন গরুর খামার। এরপর শুরু করেন জমি ইজারা ব্যবসা। বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা আয় করতে থাকেন শফিক। এক পর্যায়ে স্থানীয় ‘বড় ভাইদের’ মাধ্যমে প্রথমে  ফেনসিডিল সেবন শুরু করেন। এরপর হেরোইন। মাদক থেকে ফেরানোর জন্য পরিবার বিয়ে দেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তও অকার্যকর প্রমাণিত হয়। মাদক নিয়ে ব্যস্ত থাকায় শফিকের গরুর খামার ও জমি ব্যবসায় লালবাতি জ্বলে।

জীবনের মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে শফিকের ভুল ভাঙে। আর অতীতের জন্য আক্ষেপ করেন ফাইয়াজ। মাদকের গ্রাসে বুঁদ হয়ে অন্ধকারে পথে হারানো ফাইয়াজ ও শফিক ফিরতে চান আলোর পথে। সুস্থভাবে সমাজে বসবাস করতে চান। তাই তারা দুজনেই বাংলাদেশ পুলিশের উদ্যোগে নির্মিত ‘ওয়েসিস মাদক নিরাময়, পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্রে’ যান। মাদকের অন্ধকার জগতে পা বাড়ানো মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আড়াই বছর আগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার আড়াই বছরে এমন অনেক  মানুষকে চিকিত্সাসেবা দিয়ে যাচ্ছে ‘ওয়েসিস’।

‘ওয়েসিস’ এর বাংলা হলো মরূদ্যান, অর্থাত্ রুক্ষ বৃক্ষহীন মরুভূমিতে এক টুকরো সবুজ। দেশে যখন মাদকাসক্তির চিকিত্সা ও পুনর্বাসনে খাঁ খাঁ অবস্থা, তখন ঊষর মরুভূমির মধ্যে সবুজ আর বারিবিন্দু নিয়ে মাদকাসক্তদের সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০২১ সালের অক্টোবর মাসে পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে রাজধানীর অদূরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘ওয়েসিস’। অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ও নান্দনিক পরিবেশে উন্নত ব্যবস্থাপনায়  দেশের সবচেয়ে অত্যাধুনিক মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র এটি। এখানকার চিকিত্সা পদ্ধতি, পরিবেশ এবং পরিচর্যাকারীদের আন্তরিকতা খুবই চমত্কার। দেশের মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলো নিয়ে যখন একের পর এক অভিযোগ শোনা যায় তখন ওয়েসিস থেকে দুই শতাধিক নারী-পুরুষ সুস্থ হয়ে কর্মজীবনে ফিরে গেছেন।

সম্প্রতি ওয়েসিসের কার্যক্রম দেখতে যান এই প্রতিবেদক। কথা হয় সেখানে চিকিত্সা নিতে আসা এক মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী ফরিদের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। যাত্রাবাড়ী এলাকায় বাড়ি ঐ শিক্ষার্থীর। বন্ধুদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে গিয়ে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে নিজে ইয়াবা বিক্রি করতে থাকেন এবং এর পাশাপাশি সেবনও করেন। এক পর্যায়ে তিনি মেডিক্যাল কলেজ থেকে ড্রপআউট হয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা যখন বুঝতে পারেন ফরিদ ভয়াবহভাবে মাদকে জড়িয়ে পড়েছে তখন একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সেখান থেকে ফিরে তিনি পুনরায় মাদক  সেবন ও বিক্রিতে জড়িয়ে পড়েন। এভাবে একাধিক নিরাময় কেন্দ্রে তাকে চিকিত্সা করানো হলেও কোনো সুফল পাননি তারা। সর্বশেষ তাকে ‘ওয়েসিসে’ ভর্তি করানো হয়।

মাদকের ফাঁদে পা দিয়ে জীবনের ভুলের জন্য অনুতপ্ত ফরিদ বলেন, ‘এবার তিনি অতীতের করে আসা সব ভুল বুঝতে পারছেন। এখানে ভর্তি হওয়ার পর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছেন, হাদিসের বই পড়েন, জিম করেন, বিকালে ছাদে হাঁটাহাটি করেন। ওয়েসিসের খাওয়ার মানও অনেক উন্নত। যার ফলে তার কাছে মনে হয়, তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই বসবাস করছেন।’

ওয়েসিসের সাততলা ভবনের নিচতলায় নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষ। যেখানে পুলিশ সদস্যরা শিফট ভেদে ডিউটি করেন। এর পাশেই আউটডোরে রোগী দেখার রুম। পাশেই নিজস্ব রান্না ঘর।  সেখানেই প্রতিবেলায় রোগীদের রান্নার কাজ চলে।

ভবনের এক তলা থেকে তিন তলা পর্যন্ত মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের আবাসিক ব্যবস্থায় চিকিত্সাসেবা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ভবনটিতে রয়েছে সর্বাধুনিক প্যাথলজি ল্যাব। এসি ফ্লোর, জেনারেল বেডের ওয়ার্ড, ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা, বিশেষ কেবিন ও ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা। শুধু খেলাধুলাই নয়, পড়ালেখার জন্য লাইব্রেরির সুব্যবস্থাও আছে। এছাড়াও রয়েছে নার্সিং স্টেশন। এর ঠিক ওপরেই গড়ে তোলা হয়েছে সুসজ্জিত বাগান। প্রাকৃতিক পরিবেশে বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোগীদের জন্য ইয়োগা ও মেডিটেশন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বাগানে। ছাদবাগানের পাশেই রয়েছে ব্যায়ামাগার। এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াও বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিত্সক, সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, ইয়োগা এক্সপার্ট এবং অভিজ্ঞ অ্যাডিকশন কাউন্সেলরদের মাধ্যমে সেবা পাচ্ছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।

প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকেই এখানে কাজ করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোর্তজা হাসান। তিনি বলেন, ‘এখানে যেসব রোগী আসেন তাদের বেশির ভাগ  হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ হরেক মাদকে আসক্ত। এক্ষেত্রে প্রকারভেদে তাদের বিভিন্ন চিকিত্সা দেওয়া হয়।’

প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ পরিদর্শক সুশান্ত নারায়ণ দে বলেন, ‘ওয়েসিসে একসঙ্গে ৪৬ জন পুরুষ ও ১৪ জন নারী মিলিয়ে মোট ৬০ জনকে একসঙ্গে চিকিত্সা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এছাড়া বহির্বিভাগে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া হয়। ওয়েসিসের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ওয়েসিসে চিকিত্সার মান ও পরিবেশ আন্তর্জাতিক মানের গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে চিকিত্সা নেওয়ার পাশাপাশি অনেকে বিসিএস পরীক্ষারও জন্য পড়াশোনা করছেন। নারীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।’

ওয়েসিসের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বড় পরিসরে করার জন্য মানিকগঞ্জে একটি জায়গা নেওয়া হয়েছে। সেখানে রিসোর্ট টাইপের নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। সেখানে  গেলে মনে হবে, মানুষ ঘুরতে এলে যেমন বিনোদনের জন্য আসে সেখানকার পরিবেশও তেমনই থাকবে। খেলার মাঠ, উমুক্ত জায়গা থাকবে। পাশে কালীগঙ্গা নদীতে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। সেখানকার যে চিকিত্সা পদ্ধতি থাকবে তা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের।’

 

 

ইত্তেফাক/এনএন