বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

প্রতিদিনেই পালটাচ্ছে রাজনীতিকদের চরিত্র

পাকিস্তানে সরকার গঠন নিয়ে যত সংকট

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:৫৩

পাকিস্তানে গত ৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতিমধ্যে ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলে সরকারের এক সিনিয়র কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। এই ভোট ডাকাতির অভিযোগের মধ্যে প্রধান বিচারপতি এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারও পড়ে গেছেন। 

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) জোট সরকার গঠনের ঘোষণা এলেও বারবার দুই দলের মধ্যে আলোচনা স্থগিত করা হচ্ছে। এমনকি নওয়াজের দলের মধ্যেই বিভক্তি দেখা দিয়েছে। চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশে ফেরা নওয়াজ শরিফের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এর কারণ হিসেবেও নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে দেশটিতে। শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন হলে সেই সরকারই বা কতদিন টিকবে তা নিয়ে তো সংশয় রয়েছেই। সরকার গঠন নিয়ে প্রতিদিনই রাজনীতিকদের চরিত্র বদলাচ্ছে যা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত দেশটিকে নতুন সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সরকার গঠন নিয়ে যত নতুন তথ্য: বিবিসি পাকিস্তানে সরকার গঠন নিয়ে চারটি বিকল্পের কথা বলেছিল। প্রথমত, স্বতন্ত্র হয়ে নির্বাচন করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। দলটি মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টের সঙ্গে জোট করতে পারত। কিন্তু তারা জোট করলেও প্রয়োজনীয় ১৩৪ আসন তাদের হবে না। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান মুসলিম লীগ-এন এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি। এই দুটি দলসহ ছয়টি দল নির্বাচনের দুদিন পরই জোট সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং আসিফ আলি জারদারি প্রেসিডেন্ট হবেন। আর নওয়াজের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হবেন এই সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু হঠাত্ করেই নওয়াজ দলের সিনিয়র নেতারা বিভক্ত হয়ে পড়েন। তারাই সরকার গঠন না করার পক্ষে মত দেন। কারণ দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি এবং পিটিআইকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ফলে দল দুটির জোট শেষ পর্যন্ত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তৃতীয় বিকল্প ছিল পিপিপির সঙ্গে পিটিআই-র জোট। কিন্তু পিটিআই বলে দেয় যে, তারা এমডিএম সরকারে থাকা পিপিপির সঙ্গে জোট করবে না। যদিও পিপিপি জানায়, সব দলের জন্য তাদের দরজা খোলা। চতুর্থ বিকল্প ছিল পিপিআই-র বিরোধী দলে থাকা। শুক্রবার পিটিআই সেটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জানায়, বিরোধী দলে থেকেই দেশকে সংকট থেকে মুক্ত করবেন এবং নির্বাচনি জালিয়াতির বিরুদ্ধে লড়াই করবেন।  

রাজনীতিতে নতুন মোড়: ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানায়, পাকিস্তানে সরকার গঠন নিয়ে সক্রিয় হয়েছে দেশটির গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজকে (পিএমএলএন) ঠেকাতে ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-এ-ইনসাফ (পিটিআই) এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) হাত মেলাতে পারে বলে জল্পনা শুরু হয়েছে। সূত্রের দাবি, জেলেই ইমরানের সঙ্গে গোপন বৈঠক হয়েছে আইএসআইয়ের কর্মকর্তাদের। এরপর থেকেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। তবে কি ফের এবার ক্ষমতায় বসতে চলেছে ইমরানের দলই। সেই জোট সরকারে একদা ইমরানঘনিষ্ঠ মুত্তাহিদ কওমি মুভমেন্ট পাকিস্তান (এমকিউএমপি) যোগ দিতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আরেকটি নতুন মোড় দেশটির রাজনীতিতে। ইমরান খান অভিযোগ করেছিলেন, ২০২২ সালের এপ্রিলে তাকে ক্ষমতাচ্যুতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল। যদিও ওয়াশিংটন বারবার সেই অভিযোগ নাকচ করেছিল। সম্প্রতি জেইউআই-এফ-এর ফজলুর রহমান ক্ষমতাচ্যুতির জন্য তত্কালীন সেনাপ্রধান জেনারের কামার জাভেদ বাজওয়াকেই দায়ী করেছেন। শনিবার পিএমএল-এন নেত্রী এবং সাবেক তথ্যমন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব বলেছেন, ইমরান খানের দল পিটিআই নির্বাচনি ফলাফলে জালিয়াতি হয়েছে বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও নির্বাচনে কারচুপির তদন্ত দাবি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পিটিআইয়ের কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, সেটা নিয়েও নানা গুঞ্জন রয়েছে। তবে সরকার গঠনের সবকিছুই নির্ভর করছে দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কী চায় তার ওপর।

নির্বাচনি ফলাফলে বিলম্ব ও কারচুপি: পাকিস্তানের ইলেকশন অ্যাক্ট, ২০১৭ এর ১৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। এরপর রাত ২টার মধ্যে নির্বাচনের পুরো ফলাফল ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু এবারের ফলাফল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাত ৩টার দিকে কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম মাত্র ১০ শতাংশ পোলিং স্টেশনের বরাত দিয়ে ফলাফল ঘোষণা শুরু করে। আর পুরো ফল পেতে দুই দিনেরও বেশি সময় লাগে। এতেই অভিযোগ আসতে শুরু করে যে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। এর প্রথম প্রকাশ ঘটান দেশটির জামাতে ইসলামির নেতা হাফিজ নাঈম উর-রহমান। তার দাবি, তিনি ২৬ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। আর তার বিরোধী পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফ বারি ৩১ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। অথচ তাকে ৩১ হাজার ভোট দিয়ে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি এই আসন ছেড়ে দেন। এরপর দলটির আরেক প্রার্থীও একই দাবি করে আসন ছেড়ে দেন।

শনিবার কারচুপির বোমাটি ফাটান রাওয়ালপিন্ডির কমিশনার লিয়াকত আলি চাতা। শনিবার রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, রাওয়ালপিন্ডিতে ১৩ জন প্রার্থীকে জোর করে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। ৫০ হাজার ভোটে ব্যবধানে পরাজিত হওয়া প্রার্থীকে ভোট বেশি দেখিয়ে আমরা জয়ী করেছি। তিনি নিজের এবং এর সঙ্গে যুক্ত প্রধান বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যদের বিচার দাবি করেন।

নওয়াজ বাদ যাওয়ার যত কারণ: ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএলএন)-এর নির্বাচনি স্লোগান ছিল ‘পাকিস্তান কো নওয়াজ দো’, অর্থাত্ ‘পাকিস্তানকে নওয়াজ দাও’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন নওয়াজ শরিফের ভাই শাহবাজ শরিফ। নওয়াজ শরিফের জনপ্রিয়তার কারণে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে এমন আশাই ছিল সামরিক বাহিনীর। কিন্তু সেটা হয়নি। বিভিন্ন মামলায় তড়িঘড়ি করে মুক্তি দিয়ে নির্বাচনের সুযোগ করে দেওয়া নওয়াজকে আবার প্রধানমন্ত্রী করা হলে নানা সমালোচনা হতে পারে। সরকারের স্থায়িত্ব নিয়েও সংশয় তৈরি হবে। তাই সামরিক বাহিনী ৭৪ বছর বয়সি নওয়াজকে দুটি বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়। প্রথমত, তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে তার মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ কোনো পদ পাবেন না। আর ভাই ৭২ বছর বয়সি শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী করলে তার মেয়ে মরিয়ম নওয়াজকে ১২ কোটি মানুষের প্রদেশ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী করা হবে। নওয়াজ সেই প্রস্তাবই মেনে নেন। এভাবেই কৌশলে নওয়াজকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

পাকিস্তানের সরকার গঠন প্রক্রিয়া: পাকিস্তানে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকার গঠনের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছে দেশটির সংবিধান। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ১৪ দিনের মধ্যে নির্বাচনি ফলাফল সংক্রান্ত গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন। এরপর ভোটের দিন থেকে ২১ দিনের মধ্যে নতুন পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন ডাকতে হয়। অর্থাত্ ২৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পার্লামেন্ট অধিবেশনের আগে সরকার গঠনের সব প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। নবনির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে সদস্যরা শপথ নেবেন, শপথের পর ডেপুটি স্পিকার ও পরে স্পিকার নির্বাচিত হবেন। এরপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হয়, তাই সম্ভবত পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে বা মার্চের প্রথম সপ্তাহে শপথ নেবেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি