বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

নতুন কোম্পানি খুলবেন যেভাবে

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২০:১২

স্বাধীনচেতা যেকোনো উদ্যোক্তার পছন্দ কারও অধীনে না থেকে নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং নিজে স্বাবলম্বী হওয়া। অনেকেই ভাবেন হয়তো নতুন কোম্পানি খুলতে অনেক আইনগত ও আর্থিক ঝুঁকি-ঝামেলা পোহাতে হয়। কিন্তু ব্যাপারটি আদৌ তেমন নয়। দেশে প্রচলিত ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের বিধি-বিধান পরিপালন সাপেক্ষে একজন বিজ্ঞ অ্যাডভোকেটের সহযোগিতায় সহজেই একটি নতুন কোম্পানি খুলে একদিকে যেমন বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়, তেমনিভাবে উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে ব্যাপকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন। বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা ছাড়া নতুন কোম্পানি খুলতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হতে পারে।

নতুন কোম্পানি খোলার পরিকল্পনা মানেই যেখানে কোনো একক ব্যক্তি বা বেশ কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে মূলধন বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করা। এজন্য কোম্পানি গঠনের আগে প্রাথমিক ধাপেই উদ্যোক্তদের মাথায় রাখতে হবে কী ধরনের কোম্পানি গঠন করতে চাইছেন। সেই পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে বেশ কিছু কার্য সম্পন্ন করতে হয়।

এখানে বলে রাখা ভালো, পার্টনারশিপ কোম্পানি হলে পছন্দকৃত নামের শেষে মের্সাস থাকবে, প্রাইভেট কোম্পানির শেষে লিমিটেড এবং পাবলিক কোম্পানির ক্ষেত্রে পিএলসি লেখা থাকবে। তবে বিগত ২০২০ সালে সরকার কোম্পানি আইন সংশোধন শেষে এক ব্যক্তি কোম্পানি খোলার মতো একটি মাইলফক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা কার্যকর করেন।

এই একক ব্যক্তি কোম্পানির (ওপিসি) নিবন্ধন আইনি ও অন্যান্য দিক থেকে সহজ করে দেওয়া হয়েছে। এটার মূল লক্ষ্যেই হলো যেন একজন উদ্যোক্তা তার অর্জিত সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত ও ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে আরও বেগবান করতে পারেন। কিন্তু দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে একক ব্যক্তি কোম্পানির (ওপিসি) এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সাড়া মিলছে না। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত একক ব্যক্তির নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা আড়াই শতাধিকের কম। একক কোম্পানির এমন নাজেহাল পরিস্থিতির জন্য বেশ কিছু কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। সরকারের রোডম্যাপের ও সঠিক মনিটরিংয়ে অনীহা; একক কোম্পানির সুফল সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ও জোরালোভাবে প্রচার-প্রচারণার অভাব; মাত্র ৫ শতাংশ করর্পোরেট কর ছাড় দেওয়া; আরজেএসসি একক কোম্পানির ক্ষেত্রে নিয়মিত নিরীক্ষার নামে প্রতিষ্ঠানের আলাদা খরচ করার অভিযোগ; এই একক কোম্পানির প্রতিষ্ঠানে যিনিই পরিচালক তিনিই এমডি আবার উনিই চেয়ারম্যান অর্থাৎ সবকিছুই একই ব্যক্তি। যার ফলে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিড়ম্বনার শিকার; ওপিসির নূন্যতম ২৫ লাখ ও সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের সীমা বেঁধে দেওয়ার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা; সকল দায় ও ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতি এককভাবে মালিকের কাঁধে আসার ঝুঁকি নিতে ভয় পাওয়াকে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।

আমারা যদি নিবিড়ভাবে এই একক ব্যক্তি কোম্পানির সামগ্রিক দিক (ওপিসি) নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করি, তবে অনেক সুফল ও লাভবান দিকগুলো চোখে পড়বে। কোম্পানি আইনে ওপিসির অন্তর্ভুক্তি একটি মাইলফলক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপও বটে। একক মালিকানাধীন এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে কর্পোরেশনের মতোই সকল ধরনের সুবিধা যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনিভাবে দায় সীমিত হওয়ায় সুবিধাজনক। এটি এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে একজন ব্যক্তিই কোম্পানির মালিকানায় থাকেন এবং নমিনি ও শেয়ারহোল্ডারও হন একজন। আবার প্রাইভেট ও পাবলিক কোম্পানি গঠনে আইনগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা থাকলেও উদ্যোক্তা চাইলে সব ডকুমেন্টস প্রস্তুতসাপেক্ষে মাত্র ২৪ ঘণ্টা সময়ের মধ্যেই এই কোম্পানি গঠন করা যাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ওপিসি বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত অনলাইনকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি মাইলফলক হতে পারে।

যাইহোক, একটি নতুন কোম্পানি গঠনে প্রথমেই যেটি করতে হয়, তা হলো কোম্পানির একটি নতুন নাম পছন্দ করা। নতুন কোম্পানির জন্য প্রাথমিক ধাপই হচ্ছে একটি নতুন নাম। পছন্দকৃত নামটি যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) নিজস্ব ওয়েবসাইটে গিয়ে সার্চ দিতে হবে। ওই নামে ইতিমধ্যে কোনো কোম্পানির নিবন্ধন না হয়ে থাকলে এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ না থাকলে কিংবা আইনগত জটিলতা না থাকলে আরজেএসসি কর্তৃপক্ষ নামের ছাড়পত্র বা নেম ক্লিয়ারেন্স দেবেন। অবশ্য এই নেম ক্লিয়ারেন্সের জন্য আরজেএসসির ওয়েবসাইটে (www.roc.gov.bd) গিয়ে একাউন্ট খুলে আবেদন করতে হয়। নির্ধারিত ফি ৬০০ টাকার সাথে ১৫ শতাংশ মূসক ফি প্রদান করতে হয়। পরবর্তীতে ওই ওপেন হওয়া একাউন্ট লগ-ইন করে নামের ছাড়পত্র পাওয়া যাবে। এই ছাড়পত্র আরজেএসসি কর্তৃপক্ষের কাছে ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে। চাইলে ৬ মাস শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই আরজেএসসি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন সাপেক্ষে সময় বাড়ানো যায়।

নামের ছাড়পত্রের পর কোম্পানি গঠনে আগ্রহী ব্যক্তিরা বা (প্রমোটরস) নিম্নলিখিত পর্যায়গুলো পার করে কোম্পানির নিবন্ধন করতে আরজেএসসির ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি জমা শেষে নিম্নবর্ণিত দলিলপত্র প্রণয়ন করতে হবে।

মেমোরেন্ডাম বা সংঘ-স্মারক প্রণয়ন। এই সংঘ-স্মারককে কোম্পানির সংবিধান বা দলিলপত্র বলা হয়ে থাকে। এই দলিলপত্রের মাধ্যমেই কোম্পানির সামগ্রিক কার্যাবলী নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। সংঘ-স্মারকে প্রস্তাবিত কোম্পানির ব্যবসার নাম, ঠিকানা, ব্যবসার ধরণ, কোম্পানির গঠনকাঠামো ও উদ্দেশ্যাবলী, মূলধন, সদস্যদের দায়, কোম্পানির ক্ষমতার সীমা, কোম্পানির কার্যক্রমের পরিধি বিস্তরভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে।

এই মেমোরেন্ডাম কোম্পানির মৌলিক হওয়ায় কোম্পানির পরিচালকরা কিংবা সকল সদস্য একমত হয়েও আদালতের বিনা অনুমতিতে সংঘ-স্মারক বহির্ভুত কিছু করতে বা পরিবর্তন করতে পারবেন না। এজন্য এই সংঘ-স্মারক প্রণয়নে বিজ্ঞ অ্যাডভোকেটের সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ধাপে অগ্রগতি হলে আর্টিকেলস বা সংঘ-বিধি প্রণয়ন করতে হয়।

আর্টিকেলস বা সংঘ-বিধিতে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কার্যপরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক নিয়ম-কানুন লেখা থাকে। এই বিধিতে কোম্পানির পরিচালক পর্ষদের নির্বাচন, কোম্পানির সদস্যদের পারস্পারিক সম্পর্ক, অধিকার, লভ্যাংশ বণ্টন, নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি ও অন্য কোনো সদস্যকে বহিষ্কারসহ কোম্পানির সাধারণ ও বিশেষ সভা ইত্যাদি বিষয়ে লেখা থাকে। মূলত এই সংঘবিধি মেমোরেন্ডামের একটি অনুপন্থী বিধিপত্র হলেও আদালতের অনুমতি ছাড়াই এটি সহজে পরিবর্তন করা যায়। এই সংঘ-স্মারক ও সংঘবিধি কর্তব্যরত রেজিস্ট্রারের নিকট দাখিল হলে এবং দাখিল হওয়ার পর তিনি যদি আইনানুগ মনে করেন, তবে তিনি আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধিত করে প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেন। আর নিবন্ধন না করে থাকলে যে কারণে নিবন্ধন করা হয়নি, তার কারণ ওই মেয়াদের পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে কোম্পানিকে অবহিত করার বিধান আছে।

এছাড়া কোম্পানি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যায় বা পদক্ষেপ আছে। ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বিস্তরভাবে লেখা থাকতে হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম পর্যায়গুলো হলো- ক. পরিচালকদের মনোনয়ন; পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার স্বীকৃতিপত্র ও যোগ্যতাসূচক শেয়ার ক্রয়ের অঙ্গীকারপত্র ইত্যাদি। অবশ্য প্রাইভেট কোম্পানির ক্ষেত্রে এগুলোর প্রয়োজন নেই। খ. অনুমোদিত মূলধনের একটি বিবৃতি প্রস্তুত থাকতে হয়, যেখানে মূলধনের কত সংখ্যক শেয়ারে বিভক্ত এবং প্রতিটি শেয়ারের মূল যত হয়, তার একটি বিবৃতিপত্র। গ. কোম্পানির গঠন কাঠামোকার্যে নিয়োজিত একজন বিজ্ঞ অ্যাডভোকেট কর্তৃক একটি সংবিধিবদ্ধ ঘোষণা থাকতে হবে যে, দেশে প্রচলিত কোম্পানি আইনের সকল শর্ত পালন করা হয়েছে।

উপর্যুক্ত প্রয়োজনীয় সবকিছুর দলিল-দস্তাবেশ ও কাগজপত্রাদি প্রস্তুত সাপেক্ষে আরজেএসসির নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে নিবন্ধনের আবেদনপত্র ডাউনলোভ করতে হবে। ডাউনলোভ করা ওই আবেদনপত্রের প্রত্যেকটি ধাপ পূরণ করতে হবে। পূরণ করা ওই ডাউনলোভ কপির সঙ্গে কোম্পানির সংঘ-স্মারক ও সংঘবিধির মূল কপির সাথে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফটোকপি, নেইম ক্লিয়ারেন্স সনদ বা নাম ছাড়পত্র সনদ, কোম্পানির পরিচালকবৃন্দের তালিকা, পরিচালকদের যোগ্যতা সূচক শেয়ারসহ সম্মতিপত্র ও প্রয়োজনীয় ফিসহ আরজেএসসি বরাবর দাখিল করতে হয়।

আরজেএসসির কাছে দাখিল করা এসব ডকুমেন্টস যাচাই-বাছাই ও আইনের বিধানমতে সকল শর্ত প্রতিপালিত হলে কর্তব্যরত কর্তাব্যক্তিরা নিবন্ধনপত্র (Certification of incorporation) প্রদান করবেন। এই নিবন্ধনপত্র প্রদানের সময় থেকে কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়। তবে এমন অবস্থায় প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি তাদের কার্যক্রম আরম্ভ করতে পারলেও কোম্পানি আইনের ১৫০ ধারার বিধানসাপেক্ষে পাবলিক কোম্পানি কার্যারম্ভের পত্রও সংগ্রহ করতে হয়।

ইত্তেফাক/এএএম