গত সপ্তাহে ছোট মেয়ে নাজলার দ্বিতীয় জন্মদিন ছিল। কিন্তু গত ৮ ডিসেম্বর নিজের স্ত্রী ও তিন মেয়ে তালা, লানা ও নাজলাকে হারান আহমদ আল-গুফেরি। ইসরায়েলি বাহিনীর এক হামলায় মা, চার ভাই ও তাদের পরিবার, ডজন চাচা-চাচী ও তাদের ছেলে মেয়েসহ মোট ১০৩ জন মারা যায়।
প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি যখন তার বাড়ির দরজায় আঘাত হানে, বাড়ির লোকজন দৌড়ে কাছেই চাচার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। ১৫ মিনিট পর বিমান থেকে চাচার বাড়িতেও বোমা ফেলা হয়। গুফেরির পরিবারের নিহত সদস্যদের মধ্যে ৯৮ বছর বয়সী তাদের দাদী থেকে শুরু করে মাত্র নয় দিন আগে জন্ম গ্রহণ করা একটি শিশুও ছিলেন বলে জানা গেছে। সে সময় তিনি গাজা থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে অধিকৃত পশ্চিম তীরের শহর জেরিকোতে আটকে ছিলেন।
৭ অক্টোবর হঠাৎ করেই হামাস যখন ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে আক্রমণ করে, তখন দেশটির রাজধানী তেল আবিবে একটি নির্মাণক্ষেত্রে কাজ করছিলেন গুফেরি। ওই দিনই যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় ইসরায়েলি সেনাদের বাধার মুখে গাজায় রেখে যাওয়া স্ত্রী আর তিন মেয়ের কাছে ফেরা হয়নি এই ফিলিস্তিনির।
প্রতিদিন একই সময়ে স্ত্রী-সন্তান এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন গুফেরি। তিনি জানান, ‘সে জানতো, সে মারা যাবে। কখনো আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে থাকলে তার জন্য সে বার বার তাকে মাফ করে দেওয়ার কথা বলত। আমি তাকে বলেছিলাম, এসব বলবে না। সেটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা।’
গুফেরি বলেন, ‘একশ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে। হামলার পর দুই মাস কেটে গেছে। এখনও বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে কারো কারো লাশ চাপা পড়ে আছে।’
গুফেরি এখনও চেষ্টা করছেন এত বড় ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে। তিনি তার সন্তানদের মৃতদেহ কবর দেওয়ার, এমনকি ছুঁয়ে দেখার সুযোগও পাননি। নিজের ফোন ও ল্যাপটপ থেকে মেয়েদের ছবি মুছে ফেলেছেন তিনি। এখনও মেয়েদের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তিনি। তাই এমনভাবে কথা বলেন যেনো তারা বেঁচে আছে।
গুফেরি বলেন, ‘আমার মেয়েরা আমার কাছে ছোট্ট পাখির মত। মনে হয়, আমি কোনে দুঃস্বপ্ন দেখছি। আমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’
গুফেরির বেঁচে যাওয়া এক স্বজন হামিদ আল-গুফেরি বিবিসিকে বলেন, হামলা শুরু হওয়ার পর যে কয়েকজন পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যেতে পেরেছিল কেবল তারাই বেঁচে গেছে। যারা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল তারা সবাই মারা গেছে।
“সেখানে আগুনের বেল্ট তৈরি হয়েছিল। ১০ মিনিট অন্তর অন্তর তারা আমাদের আশেপাশের আরো চারটি বাড়িতে আঘাত হানে। সেখানে গুফেরির পরিবারের ১১০ সদস্য ছিল- আমাদের বাচ্চারা, স্বজনরা। হাতেগোণা কয়েকজন ছাড়া সবাই নিহত হয়েছে।”

গুফেরি বলেন, ‘গাজায় আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। আমি কার জন্য ফিরে যাব? কে আমাকে বাবা বলে ডাকবে? কে আমাকে প্রিয়তম বলে ডাকবে? আমার স্ত্রী আমাকে বলত আমি তার পুরো জীবন ছিলাম। এখন আমাকে এসব কে বলবে?’
সূত্র: বিবিসি
