আমার মায়ের স্মৃতি

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৯, ১৯:৪৫

আমার তরুণ বয়সে ভাবনার জগতের অন্যতম বিস্ময় ছিল আমার বাবা-মায়ের নিষিদ্ধ প্রেমের কাহিনি। বাবা আর মায়ের মুখে বহু বহুবার গল্পটা শোনা হয়েছে আমার। কখনো মা, কখনো বাবা, আবার কখনোবা মা-বাবা দুজন মিলেই গল্পটা ওরা বলেছে আমাকে। তেইশ বছর বয়সে যখন প্রথম উপন্যাসটা বেরিয়ে আসে আমার হাত দিয়ে ততদিনে এ গল্প চিরকালের মতো খোদাই হয়ে গেছে আমার হূদয়ে। চমত্কার গল্প বলিয়ে ছিল তারা দুজনই। স্মৃতি ঘেঁটে পুরনো দিনের কথা বলতে দারুণ ভালো লাগত তাঁদের। এসব ঘটনারও বহুদিন বাদে যখন পঞ্চাশ উত্তীর্ণ হয়েছে আমার বয়স আর তাঁদের এ কাহিনি অবলম্বনে লিখতে শুরু করেছি ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’ সত্যি বলতে, জীবন আর কবিতার মধ্যে ফারাক করে দেখার মতো কোনো সামর্থ্যই ছিল না আমার।

মায়ের মুখ থেকে শোনা গল্প অনুসারে, এক শোক আয়োজনে মা আর তাঁর বন্ধুরা মিলে যখন গাইছিল সমবেত গান, আচমকা কোত্থেকে এক পুরুষকণ্ঠ এসে যোগ দেয় ওই কোরাসে। কারো বাড়ি ছোট্ট কোনো শিশু মারা গেলে পরিবারের শোক নিরাময়ের জন্য প্রেমের গানের মধ্য দিয়ে আয়োজিত হতো ওই অনুষ্ঠান। আচমকা পুরুষকণ্ঠ শুনে সবগুলো মেয়ে ফিরে তাকাল দেখার জন্য—কে এই নবাগত। আর প্রত্যেকেই চমত্কৃত হয়ে গেল তরুণ যুবার রূপ দেখে। হাততালি দিয়ে উঠল সবাই আর ফিসফিসিয়ে বলাবলি করল, আমরা সবাই একেই বিয়ে করতে চাই। যদিও আমার মাকে তেমন প্রভাবিত করতে পারল না তরুণ যুবার ওই রূপ। ‘আমার চোখে সে তখনো কেবলই এক অচেনা মানুষ। তরুণের নাম গ্যাব্রিয়েল এলিজিও গার্সিয়া। এর আগেকার বাস কার্তাজোন দ্য ইন্ডিয়ায়। অর্থের অভাবে ডাক্তারি আর ওষুধপত্র নিয়ে পড়াশোনা মাঝপথে বাতিল করে দিয়ে নিকটবর্তী এক শহরে টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে শুরু করেছে কাজ।’

বাবার তখনকার তোলা এক ফটোতে দেখেছি গরিবির মধ্যেও গাঢ় স্যুট, চার বোতামঅলা জ্যাকেট, উঁচু কলারের জামা, চওড়া টাই আর খড়ের হ্যাট পরা তাঁর আকর্ষণীয় চেহারা থেকে কী প্রবলভাবে ঠিকরে বেরুচ্ছে আভিজাত্য। তরুণের চোখে ছিল নকশা করা চিকন ফ্রেমের গোল চশমা। কঠোর পরিশ্রম আর নারীসঙ্গপ্রীতির জন্য পর্যাপ্ত কুখ্যাতি ছিল তার সেই সময় থেকেই যদিও এসবের জন্য জীবনে কখনো এক শলা সিগারেট কিংবা এক পাত্র মদ্যপান করতে হয়নি তাকে।

সেদিনই প্রথমবারের মতো মায়ের নজরে আসে সে। যদিও মাকে সে দেখেছিল এরও আগের রোববার গির্জার সাপ্তাহিক প্রার্থনাসভায়। সেদিন মায়ের সঙ্গে ছিলেন ফ্রান্সিসকা সিমোদোসিয়া মেজফা নামে আমার আরেক চাচী। পরবর্তী মঙ্গলবার আবারও মাকে দেখে  সে বাড়ির সামনে বৃক্ষছায়াতলে বসে সেলাইরত অবস্থায়। আর শোক নিরসন নিমিত্ত গানের আয়োজনের রাতেই বাবা জেনে যায় তার মন উচাটন করে দেওয়া মেয়েটি আর কেউ নয়, খোদ কর্নেল নিকোলাসের মেয়ে। অবশ্য কর্নেলের সঙ্গে আগে থেকেই আনুষ্ঠানিক পরিচয় ছিল তার। ওই রাতের পর মা-ও জেনে যায় তরুণ যুবা সম্পর্কে, যেমন—সে অবিবাহিত। মুখিয়ে আছে প্রেমে পড়ার জন্য। কথাবার্তায় অসম্ভব চৌকষ। কবিতা লিখতে পারঙ্গম। নাচের ফ্লোরে দুর্দান্ত আর অসাধারণ বেহালা বাজিয়ে যে কারো হূদয় পুড়িয়ে দিতে সক্ষম। মায়ের ভাষায়, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে তার বেহালা শুনলে আপনাআপনি ভিজে আসে চোখের পাতা। হূদয় ভরিয়ে দেওয়া এতগুলো প্রতিভা আর মানুষকে চমত্কৃত করে দেবার মতো গুণাবলির জোরে সহজেই কর্নেলের বাড়ির পারিবারিক ভোজসভায় নিয়মিত আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে উঠতে খুব বেশি দেরি হলো না তার। চাচীর দেশের বাড়ি সিয়েন্স। যুবকেরও জন্ম সেখানে শুনে বিনাদ্বিধায় টেনে তাকে বুকের কাছে নিয়ে গেলেন ফ্রান্সিসকো চাচী। পারিবারিক এসব ভোজসভায় বাবার প্রধান লক্ষ্যই থাকত নিজের কলাকৌশল দেখিয়ে মাকে পটানো, যদিও মায়ের কোনো ধারণাই ছিল না তখন যে এতসব কীর্তিকলাপ ছেলেটি যে করে চলেছে, সে কেবল তারই মন জোগানোর জন্য। অথচ মাকে সে গল্প বানিয়ে বলত তার অন্য এক সহপাঠীর সঙ্গে তার প্রেমের কথা, যে আলাপের ভান করে মাকেও রাজি করিয়েছিল তাদের বিয়ের সময় অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য। একই কারণে পরস্পকে তারা ডাকাডাকিও করত ‘ধর্ম-মা’ আর ‘ধর্ম-পুত্র’ হিসেবে। ফলে মায়ের পক্ষে হতভম্ব হয়ে যাওয়াটা তো অতি স্বাভাবিক যখন এক রাতে নাচের পর নিজের বাটনহোল থেকে একটি গোলাপ মায়ের হাতে তুলে দিয়ে সাহসী টেলিগ্রাফ অপারেটর তাকে জানিয়ে দিল, এই গোলাপের মাঝেই আমার জীবনটা আমি তোমাকে দিলাম।

অনেকবার গল্প বলার সময় আমাকে বলেছে বাবা, ওইসব ঘটনার কোনোটার মধ্যেই আসলে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা বলে কিছু ছিল না কখনো। যদিও এর আগেই আরো অনেক মেয়ের সঙ্গে মেলামেশার পর তার কেন জানি হঠাত্ মনে হয়েছিল, না, আর কেউ নয়, লুইসা সান্টিয়াগাই সেই মেয়ে, যাকে সে খুঁজে ফিরেছে এতকাল ধরে। গোলাপ প্রদানের ঘটনাটাকে অবশ্য তেমন একটা পাত্তা দিতে চায়নি মা। ভেবেছে অন্য মেয়েদের সঙ্গে যেমন করে থাকে এটাও তেমনি সাধারণ কোনো একটা ভঙ্গিমা। এমনকি এ চিন্তা থেকে ওই রাতে নাচের পরপরই গোলাপটার কথা পুরোটাই ভুলে গিয়েছিল মা। অথচ মনে মনে যা-ই থাক, ওই রাতের পর থেকে ওই ছোট্ট গোলাপটাই হয়ে দাঁড়াল তার একমাত্র চিন্তা আর ব্যাখ্যাতীত গোপন এক ক্রোধের কারণ। অনেক অনেকদিন পর, ততদিনে বেশ কয়েকটা ছেলেমেয়ের মা হয়ে গিয়েছে আমার মা, কথায় কথায় বিষয়টি স্বীকার করে আমাকে বলেছিল, ওকে নিয়ে চিন্তা করতে হতো বলে রাতে এক ফোঁটা ঘুমাতে পারতাম না আমি। আর ঠিক একারণেই ভয়ানক রাগ হতো আমার। আর মজাটা হলো, যত রাগ বেড়ে যেত আমার ততটাই আরো বেশি বেশি চিন্তা করতাম ওকে নিয়ে। তার সঙ্গে দেখা হবে কি হবে না এই চিন্তায় ভয়ানক যন্ত্রণায় কেটে যেত গোটা সপ্তাহ। এক বিকেলে বাড়ির সামনে গাছের নিচে বসে সেলাইয়ের একপর্যায়ে চাচী তাকে ঠাট্টা করে বলেই ফেললেন, ওরা বলছে কে জানি একটা গোলাপ দিয়েছে তোমায়। মায়ের মনের ভেতর যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে এটা যে অন্যদের অনেক আগেই জানা হয়ে গেছে, সে বিষয়টি খোদ মা-ই কিনা জানতে পারল সকলের শেষে।

অনুবাদ : মিলটন মোললা