লোভের আঁতুড়ঘরে আমাদের জন্ম। তাই চোখে সবসময় কোনো কোনো রঙিন চশমা চড়ে যায়। কাজেই সত্য আমাদের চোখের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়—এটাই স্বাভাবিক। নির্মোহ আহমদ ছফা এই বাতিক থেকে মুক্ত। তাই সত্যকে সহজভাবে নেওয়া এবং উপস্থাপন করাই তাঁর একমাত্র নিয়তি।
অলাতচক্র সেই নিয়তির এক বিষবৃক্ষের ফল। যেখানে ঘটনাবহুল মুক্তিযুদ্ধের নিনাদ স্রোতে প্রকাশিত আমাদের সামাজিক সময়। নতুন পুরাতন দুই মেয়াদে ‘অলাতচক্র’কে সংস্কার করা হলেও মূলত এর গল্পের কঙ্কাল একই কথা কয়। যেমন—১. তনুর প্রতি লেখকের আসক্তি, ২. আশ্রয়শিবিরে বাঙালির নৈতিক চিত্র এবং ৩. ভারতীয়দের রাজনৈতিক অবস্থান।
গল্পের কঙ্কালে অলাতচক্র :
১. নিরাভরণ জগত্সংসারের জোয়ালটানা তনু (নতুন সংস্করণে নাম তায়েবা) এ উপন্যাসের প্রবেশপৃথিবী। যাকে আশ্রয় করে আহমদ ছফা তাঁর পুরো পরিক্রমণকে পরিণতি দিয়েছেন। তনু দানিয়েলের এক পবিত্র আসক্তি। যদিও অপ্রকাশিত এই নিনাদ উপন্যাসের কোনো অংশেই দুই তরফা বিনিময় হয়নি। তবু ঘটনার স্রোত এই সত্যকে স্বীকার করে।
বুদ্ধিজীবী দানিয়েল ভারতীয় ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের মতন উদোম সংসারের কেউ নন। তিনি হোস্টেলে আশ্রয় নেওয়া একজন ভিন বরনের এলিট প্রেমিক! দানিয়েল হাসপাতালে ক্যানসার আক্রান্ত তনুর করুণ অবস্থার জন্য ভাইবোনদের প্রতি অতিরিক্ত দায়িত্ববোধকেই দায়ী করেন। অর্থাত্, প্রিয়জনের বিদায়পূর্ব বিরহ ঠেকাতে কৌশল হিসেবে লেখক ক্ষুব্ধতার ছলনাকে উসকে দিয়েছেন।
২. জাগতিক কোনোকিছুই সর্বজনীন নয়। সে হিসেবে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধও এর আওতাধীন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই মহত্ প্রতিরোধ-বিসর্জনের আড়ালে একটা ক্ষুদ্র অংশ যে কিছু নামের ওপর ভর করে ব্যাংকের লকার ভাঙার মতো কাজ ঘটিয়েছে এটা অস্বীকারের কিছু নাই এবং আরো বলতে হয় এই সত্যকে অস্বীকারের চেষ্টায় যারা ‘অলাতচক্র’কে খারিজ করতে চাইবেন তাঁদের ভেতরটাও একবার খুলে দেখা দরকার।
৩. সদ্য স্বাধীন ভারতের সামনে আঞ্চলিক জাতিবিদ্বেষ দমনসহ প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান এবং পার্শ্ববর্তী চীনের চ্যালেঞ্জ। এর মাঝে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার চেষ্টা। যাকে বলে ভারতের যথার্থ সুযোগ। কারণ স্বাধীনতা অর্জনে আমাদের সহযোগিতা করলে একদিকে পাকিস্তান যেমন ভৌগলিক এবং জনসংখ্যায় দুর্বল হয়ে পড়বে, অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশের যুদ্ধাবস্থাকে পুঁজি করে ভারত সরকার জাতীয় ঐক্যের ডাক দিতে পারবে। যার আড়ালে চাপা পড়ে যাবে বিরোধী এবং বিদ্রোহী শক্তি। অর্থাত্, ভারত সরকার যে আমাদের একেবারে নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতা করেনি এ উপন্যাস সেটাকে ইঙ্গিত করে।
ভারতীয় মুসলমানদের ভাবনায় বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ:
রাজনীতি সামাজিক সময়ের একটা মাপজোখ। সে হিসেবে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী তনুর পরিবার সেই সামাজিক সময়ের একটা দেয়ালচিত্র। যেখানে এক পিঠে তনু লড়াই করছে বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে অন্য পিঠে তারই ভারতীয় পূর্বপুরুষ উর্দুকে ধরে আছেন মুসলমানত্বের অলঙ্কার হিসেবে এবং ভাবছেন এ যুদ্ধ ভারতীয় হিন্দুয়ানি উস্কানির ফল। অর্থাত্, বাঙালির সংস্কৃতির লড়াইকে তখন পর্যন্ত ভারতীয় মুসলমান দেখেছেন বাঁকা চোখে।
বাঙালির মর্মবেদনায় প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গ :
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ সংস্কৃতি রক্ষায় সংগঠিত। আর এই সংস্কৃতির সঙ্গে প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের ভাষাগত দিকসহ আরো কিছু দিকে মিল ছিল। যার কারণেই প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের বেদনা তাদের শিরায় প্রবাহিত হয়েছিল সহজে। যার উল্লেখ্য প্রমাণ তনুর পুরো চিকিত্সাব্যবস্থায় ডা. মাইতির সহযোগিতা এবং দানিয়েলকে সুনন্দার সহযোগিতা। ভিন্নভাবে পশ্চিমবঙ্গের স্থলেই যদি ভিন সংস্কৃতির অন্য কোনো ভারতীয় রাজ্য থাকত সেক্ষেত্রেও হয়তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়টা আরো কঠিন হতো।
স্বার্থপর ও ভোগবাদী চরিত্রের আনাগোনা :
দানিয়েলের মতো চরিত্রগুলো কলকাতায় এটাওটা কর্ম করে নিজেরটা জুটিয়ে নিলেও কখনোই শরণার্থী শিবিরমুখী হননি। অর্থাত্, নিজেরা শুধু নিজেরটা নিয়ে হোস্টেলে নিদ্রা দিয়েছেন। বাকি সব অন্ধকার!
আবার জাহিদুল চরিত্র স্ত্রী ভাগার অজুহাতে তনুর তরুণী বোনকে বাগিয়ে বিয়ে করেছেন। এখানে তামাশা হলো যৌবন বিসর্জন দিয়ে দেশে তরুণেরা মুক্তির সংগ্রাম করছেন, আর এদিকে জাহিদুলের মতো বুড়ারা বিয়ে-সাদি করে ভদ্র কায়দায় জল খসিয়ে চলছেন।
বৃহত্ বিসর্জন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিসর্জনের কাঁধে ভর দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সে হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে আহমদ ছফার ‘অলাতচক্র’ নায়ক দানিয়েলের বিসর্জন শূন্য। আর এ কারণেই লেখক সৃষ্টি করেছেন তনুর চিরবিচ্ছেদ। তবে এখানকার মূল তামাশা হলো ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী তনুর জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে সুবিধাবাদী দানিয়েলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সদয়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
অর্থাত্, নারীর (তনু) বিসর্জনে পুরুষকে (দানিয়েল) মুক্তি দেওয়া হয়েছে! তবে এরপরও আহমদ ছফার প্রতি কৃতজ্ঞতা। কারণ এর মধ্য দিয়ে হলেও মুক্তিযুদ্ধে এই আত্মকেন্দ্রিক শ্রেণির অবস্থানটা আমাদের কাছে উন্মোচিত হয়েছে।
