বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

‘সেনাবাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব নয়’ নীতিতে শাহবাজ শরিফের রাজনৈতিক সফলতা

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪, ২২:২৮

পাকিস্তানের নির্বাচন পরবর্তী অচলাবস্থা কাটিয়ে অবশেষে ২৪তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন শাহবাজ শরিফ। তিনি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীও বটে। তার আরেকটি পরিচয় হলো তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভাই।

২০২২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হন। সে সময় ইমরান খানের পিটিআই ছাড়া বাকি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যোগ দেন শাহবাজ শরিফ এবং ইমরান খানের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন তিনি। এতে পতন হয় পিটিআই সরকারের।

ইমরান খানের জায়গায় পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট বা পিডিএম শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করে। পিডিএমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিলাওয়াল ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টিসহ (পিপিপি) কয়েকটি দল। ওই জোটে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রথমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন শাহবাজ শরিফ।

১৯৯৭ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন শাহবাজ শরিফ। ছবি: সংগৃহীত

পিডিএম সরকার ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পেয়েছিল মাত্র ১৬ মাসের মতো। এরপরই, ২০২৩ সালের আগস্টে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে। শাহবাজ শরিফ তথা পাকিস্তানের শরিফ পরিবারের ইতিহাসে সামরিক সংস্থার সঙ্গে দ্বন্দ্বে না জড়ানো নীতি ছিল স্পষ্ট।

১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত যতবার নওয়াজ শরিফের দল ক্ষমতায় এসেছে ততবারই দেশের বাইরে ছিলেন তিনি। আর প্রতিবারই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নওয়াজ। তবে এবার কিছু ব্যতিক্রম ঘটেছে।

আগের প্রতিটা জয়ের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নওয়াজ। আর শাহবাজ শরিফ হয়েছেন পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব শাহবাজ পালন করেছেন প্রায় ১৩ বছর। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দশ বছরের শাসনামলে একজন ‘কঠোর প্রশাসক’ হিসেবে পরিচিতি পান শাহবাজ শরিফ।

নওয়াজ শরিফের সঙ্গে শাহবাজ শরিফ। ছবি: সংগৃহীত

শাহবাজ শরিফের ক্যারিয়ার শুরু হয় পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরার মাধ্যমে। ১৯৮৫ সালে লাহোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হন তিনি। নওয়াজ শরিফ ও তার দলের রাজনীতির প্রচারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন শাহবাজ।

ব্যবসা সম্প্রসারণের পর পাকিস্তানের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৯৮৮ সালে প্রথমবার পাঞ্জাব অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন শাহবাজ শরিফ। এরপর ১৯৯০ সালে তিনি পার্লামেন্টের সদস্য ও ১৯৯৩ সালে ফের পাঞ্জাব পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর তিনি প্রাদেশিক পরিষদের বিরোধী দলীয় নেতাও হন।

প্রথমবার ১৯৯৭ সালের নির্বাচনের পর পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন শাহবাজ শরিফ। ভালো প্রশাসক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেন। পাশাপাশি পাঞ্জাবে একটি ভালো দলও গড়ে তোলেন।

১৯৯৯ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফ সামরিক আইন জারি করলে পিএমএল-এন সরকার অকালে ক্ষমতাচ্যুত হয়। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে গ্রেপ্তার হন শাহবাজ শরিফ। কিন্তু শাহবাজের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ায়নি শরিফ পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

তবে কখনোই সংঘর্ষে জড়াতে চাননি তিনি। শাহবাজ শরিফ বরাবরই ছিলেন ‘সামরিক সংস্থাসহ সবাইকে নিয়ে একযোগে কাজ করা উচিত’ নীতিতে বিশ্বাসী। পাকিস্তানি সাংবাদিক মুজিবুর রহমান শামির মতে, একটি অনুষ্ঠানে খোদ পারভেজ মোশাররফও বলেছিলেন যে ‘তিনি (শাহবাজ শরিফ) প্রধানমন্ত্রী হলে ভালো হত।’

২০০০ সালে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে শরিফ পরিবারের একটি কথিত চুক্তি হয়েছিল। এরপর শাহবাজ শরিফ নির্বাসনে যান ও সৌদি আরবে চলে যান। কিন্তু শাহবাজ শরিফের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তখনো প্রমাণিত হয়নি। তিনি কখনো দেশ থেকেও নির্বাসিত হননি। এমনকী তাকে যেন বিতাড়িত করা না হয় সে বিষয়েও খুব আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা কিংবা তাদের সঙ্গে কোনোরকম দ্বন্দ্বে যেন না যায় তা নিয়ে বড় ভাই নওয়াজকে বেশ কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন শাহবাজ। তিনি যখন জেলে ছিলেন তখন চিঠিগুলো লিখতেন বলে জানা গেছে। এমন কয়েকটি চিঠির কথা নিশ্চিত করেছেন পাকিস্তানের আরেক সাংবাদিক সালমান ঘানি।

তবে রাজনীতিতে নওয়াজের তুলনায় সবসময় গৌণ ভূমিকা পালন করতেন শাহবাজ। নওয়াজ শরিফ যতবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, ততবারই শাহবাজ হয়েছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী। শরিফ ভাইরা কখনো ‘অপ্রয়োজনীয় সংঘর্ষে’ জড়াতে চাননি। বরং তারা প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গেও তাল মিলিয়ে চলতে চেয়েছেন।

ইত্তেফাক/এএএম