সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতির পর প্রথম ইফতার

দরজায় কড়া নাড়ছে সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র মাহে রমজান। এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ইফতার। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে মুখে ইফতারের খাবার তুলে রোজা ভাঙেন মুসলমানেরা। ইফতার শুধু রোজা ভাঙার উপলক্ষই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের কাছে একটি ঐতিহ্যও। গত বছরের ৬ ডিসেম্বর এ ইফতারকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। এই স্বীকৃতির পর এবারই প্রথম ইফতার করবেন মুসলিমরা। এদেশের ইফতার-ঐতিহ্য নিয়ে লিখেছেন তাহমিদ আহমেদ শুভ্র

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ০৭:৫৫

বাংলাদেশের ইফতারের বিদেশি বৈচিত্র্য
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে ইফতারে যেসব খাবার খাওয়া হয়, তার বড় অংশ এসেছে পার্সিয়ান বা মুঘল খাবারের তালিকা থেকে। এক সময় মুঘলরা ভারতবর্ষ শাসন করত। তারা যখন ঢাকা শাসন করেছেন, তাদের সেই খাদ্য তালিকা তখনকার ঢাকার লোকজন গ্রহণ করেছেন। এরপর সেটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখনকার ইফতারে আমাদের প্রধান খাদ্য ছোলা-মুড়ি। এই ছোলা মূলত আফগানদের খাবার; কাবুলিওয়ালাদের হাত ধরেই তা বাঙালি মুসলমানের ইফতারে জায়গা করে নিয়েছে। তবে ভারত বা বাংলাদেশে এসে সেটা আরো মশলা, পেঁয়াজ ইত্যাদি দিয়ে মুখরোচক করে রান্না করা হয়ে থাকে। সেটার সঙ্গে মুড়ি খাওয়ার চলও এই অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব উদ্ভাবন।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) ইফতারের সময় খেজুর খেতেন। ফলে ইফতারের সময় খেজুর খাওয়াকে সুন্নত বলে মনে করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই রীতিটি সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিহাসবিদ এ কে এম খাদেমুল হক বিবিসিকে বলেন, ‘হজরত মোহাম্মদ (সা.) রোজা  খোলার সময় খেজুর খেতেন। সে কারণে মনে করা হয় এটা ভালো অনুষঙ্গ। সেজন্যই বাংলাদেশের মানুষ মনে করেন ইফতারিতে সুন্নত খেজুর খাওয়া।’

মির্জা নাথান বা হেকিম হাবিবুর রহমানের বর্ণনায় ইফতারে মুঘল ও বাংলার নবাবদের যেসব খানাপিনার কথা জানা যায়, তার মধ্যে ছিল শরবত, নান, কাবাব, বিরিয়ানি, কোফতা, কোরমা, হালিম, জিলাপি, নিমকপারা ও সমুচার মতো কিছু ভাজাপোড়া। এসব দেখে এই অঞ্চলের বনেদি মানুষজনও খেতে শুরু করেন।

এখনো ইরান, আরব আমিরাত, সৌদি আরব ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশে ইফতারির সময় কাবাব সহযোগে বিরিয়ানি বা পোলাও খাওয়ার চল রয়েছে। পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ এটা উত্তর ভারত থেকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের খাবারে ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা ইসলামী ইতিহাসবিদদের।

ইফতারে শরবত খাওয়ার রীতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়াও আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে রয়েছে। পানির পিপাসা থেকে স্বাদ, মিষ্টি ও সুগন্ধি শরবত খাওয়ার চল চালু হয়েছে বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলামে ইফতারির সময় কয়েকশো বছর পূর্বের বর্ণনাতেও এরকম ভাজাপোড়া খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় না। সুতরাং বলা যায়, কয়েকশো বছর আগেও এগুলো ছিল না।’

 

উনিশ শতকের ইফতার
হাজার বছর আগে বাঙালির ইফতারে এত বিচিত্রতা ছিল না। রোজার দিনে পানিতে চাল ভিজিয়ে রাখা হতো। গ্রামবাংলার সাধারণ মুসলমানেরা সেই ভেজানো চাল মুখে দিয়ে রোজা খুলতেন। সেই আদিকালে ইফতার করাকে বলা হতো ‘রোজা খোলাই’। এখনো পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় রোজা খোলাই শব্দটির প্রচলন রয়েছে।

চাল, ভাত, খই-চিড়ার জায়গায় মাখানো ছোলা-মুড়ি উনিশ শতকের দিকেই মূলত বাঙালি মুসলমানের ইফতারির মূল উপকরণ হয়ে ওঠে। তাও গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে এসব পদ পৌঁছাতে সময় লেগেছে বহু বছর।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক তার ছেলেবেলার স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ‘ইফতার মানে একমুঠো চালভাজা পাঁচজনে ভাগ করে চিবিয়ে খাওয়া, সঙ্গে বিচিঅলা আঁটিয়া কলা জুটল তো সেই কলা একটি, আর কুয়োর লাল পানি।’

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, শবে বরাতের পর থেকেই শুরু হয়ে যেত রমজানের আয়োজন। পরিষ্কার করা হতো পানির পাত্রগুলো। কেনা হতো নতুন সরা, মাটির হুঁকা ইত্যাদি। সেগুলোকে বাসায় এনে সুরভিত করা হতো সুগন্ধি দিয়ে। গরমের দিনে পানি ঠান্ডা রাখার জন্য আনা হতো বালুর তৈরি সুরাহি। সেভাবে রাখা পানিকে সুগন্ধি করার জন্য দেওয়া হতো গোলাপ ও কেওড়া। খাবার গ্রহণের মাধ্যমে হতো রোজা খোলা বা ভাঙা। আর এই রোজা খোলাইয়ের আয়োজন বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয়ে যেত জোহরের পর থেকেই।

বাড়ির নারীরা রান্নাঘরে যেতেন। আগে থেকে ভেজানো ছোলা, মুগডাল বের করা হতো। ডাল বেঁটে তৈরি করা হত ফুলুরি। যথাযথ চেষ্টা করা হতো ইফতারের সময় সেটা যেন গরম গরম পরিবেশন করা যায়। আজান শোনার পর ইফতার শুরু হতো জমজম কূপের পানি মেশানো শরবত দিয়ে। আর শরবতের মধ্যে থাকত ফালুদা, তোকমার শরবত, বেলের শরবত, বেদানার শরবত, লেবু ও তেঁতুলের শরবত। তোকমার শরবতের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল তাখসে রায়হান।

শরবতের পর সওয়াবের কাজ হিসেবে খোরমা খাওয়া হতো। এর পরই রোজাদার চলে যেতেন ইফতারের মূল পর্বে। আর সেটার জন্য পরিবারের ছোট-বড় সবাই হাজির হতেন দস্তরখানায়। ঘরে বানানো মুড়ির বিভিন্ন পদ, মিষ্টি ও নোনতা সমুচা, কাঁচা ও ভাজা ডাল, ফল-ফলারি, পেঁয়াজু, ফুলুরি প্রভৃতি বাজার থেকে কিনে আনা হতো। ছিল ‘গোলাপি ঊখরা’ নামের মিষ্টি মিশ্রিত একধরনের খাবার। এছাড়া ভুনা চিড়া, দোভাজা, টেপি ফুলুরি, মাষকলাইয়ের বড় ডাল-বুট, বাকরখানি, কাবাব ইত্যাদি হাজির থাকত দস্তরখানায়।

ঘরে বিভিন্ন ধরনের ইফতারি বানানো হলেও পুরান ঢাকাবাসী প্রতিদিন চকবাজার থেকে কিছু না কিছু ঠিকই আনতেন। ধনী-গরিব সবাই আসতেন চকে। তখন ঢাকায় বিভিন্ন মহল্লার মসজিদেও ইফতারের আয়োজন হতো। মহল্লার মসজিদে ইফতারি পাঠাতেন এলাকার ধনী ব্যক্তিরা। এই সময় বিশ শতকের প্রথম দিকেও ঢাকায় ইফতারির বাজার বলতে শুধু চকবাজারকে বোঝাত।

তবে চল্লিশের দশকে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। মহল্লায় মহল্লায় গড়ে উঠতে থাকে ইফতারির অস্থায়ী দোকান। এটা অবশ্য চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকার মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইফতারির সঙ্গে যোগ হয় গ্রামবাংলার পিঠা-পুলি। এর পর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে রমজান ও ইফতারের আয়োজন ও বৈচিত্র্য বেড়ে যায় অনেক গুণ।

ইত্তেফাক/এসটিএম