ছোটোখাটো অনিয়ম পৃথিবীব্যাপী রহিয়াছে, যদিও কোনো অনিয়মই কাঙ্ক্ষিত নহে। কিন্তু কোনো কোনো অনিয়ম আমাদের শিহরিত করিয়া তোলে। তাহা যদি আবার জনগণের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহা হইলে দুশ্চিন্তা ভর করে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজার এলাকায় চুড়িহাট্টায় এক ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডে ৭১টি তাজা প্রাণ পুড়িয়া কয়লায় পরিণত হইয়াছিল, যাহা আমাদের নিকট চকবাজার ট্র্যাজেডি হিসাবে পরিচিতি লাভ করিয়াছে। আগুন কোথা হইতে লাগিয়াছিল, কেন লাগিয়াছিল তাহা আমাদের বর্তমান বক্তব্যে প্রাসঙ্গিক নহে। প্রাসঙ্গিক হইল, ঐ অগ্নিকাণ্ডে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল বহুতল ওয়াহেদ ম্যানশন। এই ভবনটির প্রথম চারতলা পর্যন্ত সম্পূর্ণ পুড়িয়া গিয়াছিল, যাহা ছিল ব্যবহার অনুপোযোগী। সেই ভবনটিই এখন মালিকপক্ষ সংস্কার করিতেছেন। এই সংস্কারকাজ সম্পর্কে সম্প্রতি সহযোগী একটি দৈনিকের রিপোর্ট বলা হইয়াছে যে, মালিকপক্ষের সংস্কারে প্রকৌশলীদের দেওয়া নির্দেশ যথাযথভাবে মানা হইতেছে না। এমনকি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের টাঙানো ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবন’ সাইনবোর্ডটিও তাঁহারা (মালিকপক্ষ) নিজেরাই সরাইয়া ফেলিয়াছেন।
ওয়াহেদ ম্যানশনটি শুরুতেই সিটি করপোরেশনের কমিটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যবহারের অনুপযোগী বলিয়া ঘোষণা করিয়াছিল। ইহার পর একাধিক কমিটি ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যাহাতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সিটি করপোরেশন এবং বুয়েটের প্রতিনিধিরা। ইহার মধ্যে সিটি করপোরেশন এবং বুয়েটের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ওয়াহেদ ম্যানশনের কাঠামো প্রতিবেদন এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান করিয়া প্রতিবেদন তৈরি করে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও বুয়েটের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছিল, ৪৫ দিনের মধ্যে ভবনটির ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করিতে হইবে। সেই ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবনটি পাঁচ মাসের মধ্যে নূতন করিয়া মজবুতের কাজ করিতে হইবে। বলা হইয়াছিল, বিস্ফোরণ ও আগুনের কারণে কলাম ও বিমের যেই সকল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে বা পুড়িয়া গিয়াছে, সেই অংশ পরিপূর্ণভাবে ফেলিয়া দিতে হইবে। বিমগুলিকে মোটা করিতে হইবে এবং পর্যাপ্ত রড সিমেন্ট ব্যবহার করিতে হইবে। শুধু কোনো প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত তদারকিতে ইহা সংস্কার করা ঠিক হইবে না, সেই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির সহায়তা লইতে হইবে।
আমরাও চাই ভবনটি আবার গড়িয়া উঠুক। কিন্তু ভবনটি সংস্কারে যদি ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্টের প্রদত্ত প্রতিবেদনের নির্দেশাবলি অনুসরণ করা না হয়, তাহা হইলে ঝুঁকি থাকিয়াই যাইবে। সেই ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আবারও কোনো বড়ো দুর্ঘটনা ঘটিলে তাহার দায় লইবে কে? সুতরাং সংস্কারকার্য চলাকালেই যাহাতে নির্দেশাবলি শতভাগ অনুসরণ করা হয় সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হইতে হইবে। সিটি করপোরেশনের উচিত হইবে বিষয়টিতে নজরদারি করা। অন্ততপক্ষে ভবন মালিককে সতর্ক করিয়া দেওয়া। আমরা চকবাজার ট্র্যাজেডি বা বড় কোনো দুর্ঘটনা আর দেখিতে চাই না।
