পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল এগারোটায় সপার্ষদ গিয়েছিলেন শ্রীরামপুরে। মাহেশের রথযাত্রার রশিতে টান দিয়ে মাহোত্সবের সূচনা করতে। শ্রীরামপুরে হেলিকপ্টার থেকে নেমেই জগন্নাথ মন্দির দর্শনে হাজির তিনি। তারপর উপচে পড়া ভিড়ের তুমুল হর্ষধ্বনির সঙ্গে মাহেশের রথে তাঁর টান। রথযাত্রা উপলক্ষে মমতার শ্রীরামপুর সফরকে ঘিরে উত্সাহ যেমন জোয়ার তুলল, তেমনি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও কঠোর হয়ে উঠল। জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন স্নানপিঁড়ি মাঠে বিশাল ব্যারিকেড। নিরাপত্তার তদারকিতে ছুটে বেড়াচ্ছেন পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবীর, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মর্যাদার সাত কর্মকর্তা। মাহেশের রথযাত্রার সূচনা করেই মুখ্যমন্ত্রী ফিরে এলেন কলকাতায়। উদ্ধোধন করলেন ইসকনের রথযাত্রা। এখানে তাঁর সঙ্গী সাংসদ-অভিনেত্রী নুসরত জাহান। এদিনই সন্ধ্যায় সদ্যবিবাহিত নুসরত আর তাঁর জীবনসঙ্গী নিখিল জৈন তাঁদের বিয়ে উপলক্ষে অতিথি আপ্যায়নে আয়োজন করেন। এরকম ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও ইসকনের রথ টানলেন নুসরত।
ইসকনের উত্সব ৪৮ বছরে পা দিয়েছে। তাঁদের সদর দপ্তর অ্যালবার্ট রোড থেকে শুরু হয় যাত্রা। সঙ্গে ঢেউ জাগাল জনসমুদ্র। শরত্ বসু রোড, হাজরা রোড, আশুতোষ মুখার্জি রোড ও জওহরলাল রোড ধরে ইসকনের রথ ময়দানে পৌঁছায়। শ্রীরামপুরের মাহেশের রথের বয়স আনুমানিক ছয়শো। দীর্ঘ ইতিহাসকে স্পর্শ করে পথে নামল রথ। গোড়া থেকেই এই রথযাত্রাকে ঘিরে সাধারণ ভক্তের উচ্ছ্বাস আর আনন্দ বাঁধ ভেঙে দেয়। বিশেষের সঙ্গে মিশে যায় নির্বেশ। এই ছবি কখনও ম্লান হয়নি। সেই ট্রাডিশন আজো চলছে। ঐতিহ্য আর বয়েসের দিক থেকে মাহেশের রথ পুরীর প্রায় সমতুল্য। পুরী যাওয়ার পথে শ্রীরামপুরের জগন্নাথ মন্দিরে এসেছিলেন শ্রী শ্রী চৈতন্য। শ্রীহট্টের রক্তবাহী মানবপ্রেমের প্রবক্তা। চৈতন্যদেব মাহেশের নাম দিয়েছিলেন ‘নব নীলাচল’। এ রথের মেলায় শরিক হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণও। ৬০০ বছর আগে প্রথম রথটি তৈরি করেছিলেন একজন মদক। ১৮৮৪ সালে রথযাত্রার মুহূর্তে কাঠে তৈরি রথটি পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। ১৮৮৫ সালে লোহার কাঠামোয় এখনকার রথটি নির্মিত হয়। কৃষ্ণচন্দ্র বসুর নির্দেশ ও অর্থসাহায্যে। খরচ হয়েছিল ২০ লক্ষ। মাহেশের উত্সবের চেহারা বদলেছে। বদলে গেছে তার সাজসজ্জা। প্রতিবছরই তাকে ঘিরে বহুমুখী, বহুধর্মীয় জনতার উত্সাহের ঢল নামে। রথউত্সবে মেতে উঠল কলকাতার নানা প্রান্ত। নিউটাউন থেকে একটি মহারথ গৌরাঙ্গনগর সেতুতে পৌঁছায়। পানিহাটিতেও বেরোয় আরেক রথ।
রথের দিন থেকেই ফি বছরের মতো গ্রামে-শহরে শুরু হয়েছে রথের মেলা। সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্ক, কলকাতার মৌলালি সংলগ্ন পার্ক এবং দক্ষিণ পূর্ব কলকাতার বহু খোলা মাঠে মেলার আয়োজন আর বৈচিত্র্য নজরে পড়ছে, ছোটবড়ো মেলার উদ্ভাস। উত্তর দমদমের বণিক মোড় থেকে বিরাটী পর্যন্ত ‘মহাজাতিনগরের রথ’—সমীরেশ্বর ব্রহ্মচারী মন্দিরের রথযান, দুর্গানগরের সমারোহ, নাগের বাজারের বড়োরথের অভিনব যাত্রাকে ঘিরেও ছড়িয়ে পড়ে খেলার আর মেলার উত্সাহ।
এদিকে পুরীতেও ভক্তদের ঢল রথের দিন। লাখ লাখ মানুষের ভিড়। বিশেষ ধরনের কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছে তিনটি রথ—জগন্নাথদেবের নন্দীঘোষ, বলভদ্রের তালধ্বজ আর সুভদ্রার রথ দর্পদলন। পহণ্ডি মন্দির থেকে শোভাযাত্রা করে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রাকে রথে নিয়ে আসেন ভক্তবৃন্দ। ওড়িশা ভাষার এই রীতির নাম পহণ্ডি। পহণ্ডির অনুষ্ঠান শেষে তিন বিগ্রহকে রথে তোলা হয়। এবারও পুরীর রাজা সোনার ঝাঁটা দিয়ে রাস্তা পরিস্কার করে ‘ছেড়াপহরা’ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। খিচুড়ি ভোগ খেয়ে দুপুর তিনটে নাগাদ মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা। গোটা দেশজুড়ে উত্তর পূর্ব থেকে পশ্চিমে, মধ্য ভারতে ব্যাপক সমারোহে রথযাত্রা উদযাপিত হচ্ছে। তোমার ধর্ম তোমার, উত্সব সবার—এই প্রবচন আর সংস্কৃতির বহুত্বকে গুরুত্ব দিয়ে বরণ করল, আনন্দে ভাসল সমাজের অশেষ। রথ, মহারথ মিলিয়ে দিল ভারতের চতুষ্কোণকে। বাংলাদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে শুনলাম, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে বের হয়েছে রথের ঐতিহ্যবাহী বর্ণোজ্জ্বল মিছিল। তার মানে, যে কোনো উত্সব ও উত্সবের গণউদযাপন সীমা ও কালের উর্দ্ধে। সে মুছে দেয় অনায়াসে, বিভাজনের যাবতীয় রেখা।
n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সমপাদক আরম্ভ পত্রিকা
