গত ১১ মার্চ ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘উমরাহ টিকিট-সংকট, ফ্লাইট ভাড়া দ্বিগুণ’ রিপোর্টটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আসলে ইদানীং উমরাহ নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝে আগ্রহ আরো বেড়ে গেছে। হজের খরচ বৃদ্ধির কারণে এমনটি হতে পারে। তবে বিষয়টি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু উমরাহের টিকিট পেতে বিড়ম্বনাসহ যেসব সমস্যা রয়েছে, তার সমাধান একান্ত কাম্য। সার্বিকভাবে ওমরাহ ব্যবস্থাপনার উন্নতির মাধ্যমে আমরা সম্মানিত উমরাহ যাত্রীদের বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে পরি।
অনেক সময় উমরাহ কীভাবে করতে হয় এবং এজন্য কী কী প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন, তা না জানার কারণেও আমরা সচরাচর নানা সমস্যায় পড়ি। আসলে ওমরাহ একটি নফল এবাদত হলেও এর প্রতি মুসলমানদের গভীর আকর্ষণ রয়েছে। কেননা এই এবাদতের মাধ্যমে সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের বহু কাঙ্ক্ষিত ও লালিত স্বপ্ন মহান আল্লাহতায়ালার ঘর কাবা শরিফ এবং বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক তথা মদিনা শরিফ জিয়ারতের দুর্লভ সুযোগ লাভ করা যায়। বিশেষ করে রমজান মাসে ওমরাহ পালন করার মধ্যে একটি বিশেষ গুরুত্ব এবং ফজিলত রয়েছে। রমজানে একটি নফল এবাদত একটি ফরজ এবাদতের সমতুল্য এবং একটি ফরজ এবাদত সত্তরটি ফরজের সমান সওয়াব লাভ করার সুযোগ রয়েছে। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে যে, রমজানে ওমরাহ করা বিশ্বনবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে হজ করার সমতুল্য। এ কারণে এ সময় ওমরাহ টিকিটের চাহিদা বেশি থাকে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলির সম্যক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, মাহে রমজানে ওমরাহ পালন করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের একটি সুন্দর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। আমরা যে কোনো ওমরাহ এজেন্সির নির্ধারিত প্যাকেজ পছন্দ করে এজেন্সির কাফেলার সঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে ওমরাহ পালন করতে পারি। তবে প্যাকেজ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাপ্য সুবিধাদির বিষয় এজেন্সির সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে বিস্তারিত লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে; যাতে করে সফরে যাওয়ার পর এ নিয়ে কোনো অসন্তুষ্টি না থাকে। ওমরাহ ভিসা, বিমান টিকিট, সউদি আরবে সব ট্রান্সপোর্টেশন, খাবার, গাইড, জিয়ারাহ বা দর্শনীয় স্থানসমূহ পরিদর্শন ইত্যাদি এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। মক্কা-মদিনার হোটেলের মান, দূরত্ব ও প্রতি রুমে কতজন অবস্থান করবেন, এর ওপরই মক্কা-মদিনার হোটেলের মূল্য নির্ভর করে। মদিনায় হোটেল মারকাজিয়ার (সেন্ট্রাল এরিয়া) ভেতরে হওয়া উত্তম। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। এসব বিষয় স্পষ্ট না থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে এবাদতের একাগ্রতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ইচ্ছে করলে এজেন্সির নিকট থেকে ওপরে উল্লিখিত হোটেল, ভিসা, টিকিট, ট্রান্সপোর্ট খাবার, গাইড, জিয়ারাহসহ কমপ্লিট প্যাকেজ নেওয়া যায়। তা নাহলে শুধু ভিসা-টিকিট এজেন্সির মাধ্যমে সংগ্রহ করে নিজে বা পরিচিত কারো মাধ্যমে হোটেল ভাড়া করা যেতে পারে। এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ বা নতুন হলে পুরো প্যাকেজ নেওয়াটাই উত্তম। এসব নিয়ম অনুসরণ করলে ওমরাহ নিয়ে অন্যান্য সংকট ও ঝামেলা মোকাবিলা করা সম্ভব।
বাংলাদেশ থেকে পবিত্র মক্কায় পৌঁছার পর ওমরাহ পালন করাই সর্বপ্রথম কাজ। সেক্ষেত্রে সউদি আরবে প্রবেশের আগে মিকাত অতিক্রম করার আগে এহরামের কাপড় পরিধান করতে হবে, দুই রাকাত নামাজ পড়তে হবে এবং নিয়ত করতে হবে। ওমরাহর নিয়তের পর তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টির উদ্দেশে ওমরাহর ভ্রমণ শুরু করা যায়। এখানে একটি জরুরি বিষয় হলো, সফরে যাওয়ার এয়ারলাইন্স যদি ডিরেক্ট বা সরাসরি হয়, তাহলে এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগে বাসা থেকে এহরাম বেঁধে যাওয়াটাই ভালো। অনেকে ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, তারা এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষ করে এয়ারপোর্টের মধ্যেই দ্বিতীয় তলায় মসজিদ রয়েছে, সেখানে গিয়ে এহরাম বেঁধে নিতে পারেন। মোট কথা মিকাত অতিক্রমের আগে এহরাম বাঁধলেই চলবে। তবে যারা বিমানে বসে এহরাম বাঁধতে চান, সেখানে কিছু প্রতিকূলতা আছে। বিমানে জায়গার স্বল্পতা, অজু করা যায় না, কিবলামুখি হয়ে নামাজ পড়া অনেক সময় সম্ভব হয় না। তাই বিভিন্ন কারণে ফ্লাইটে স্বাচ্ছন্দ্যে এহরাম বাঁধা সম্পন্ন করা সম্ভব না-ও হতে পারে। আর ট্রানজিট ফ্লাইট হলে, যে দেশে ট্রানজিট হবে, সময় থাকলে সেখানকার এয়ারপোর্টে অপেক্ষমাণ সময়ের মধ্যে এহরাম বেঁধে নেওয়া যায়। মক্কা শরিফে পৌঁছার পর ওমরাহ সম্পন্ন করাই হলো সর্বপ্রথম কাজ। প্রয়োজনীয় জরুরি কাজ শেষ করেই দ্রুত ওমরাহ করে ফেলাই উত্তম। গ্রুপ মুভমেন্ট ওমরাহ বা হজ পালনের ক্ষেত্রে অনেকটাই সহায়ক।
রমজানে ওমরাহর তাওয়াফ ও সাঈ করার সময় প্রচণ্ড ভিড় হয়ে থাকে। সমতলে মাতাফে ভিড় পরিলক্ষিত হলে দ্বিতীয় তলায় তাওয়াফ করা যায়। দ্বিতীয় তলায় ভিড় কম থাকে, তবে তাওয়াফের এরিয়া বড় হওয়াতে বেশি হাঁটতে হবে। অসুস্থ বা শারীরিকভাবে অক্ষমদের জন্য হুইল চেয়ারে তাওয়াফ-সাঈ করার ব্যবস্থা আছে। নিজেরা হুইল চেয়ার সঙ্গে নিয়ে নিজেদের পিতা-মাতা বা আত্মীয়দের হুইল চেয়ারে করে তাওয়াফ-সাঈ করানো যায়। তাছাড়া হারাম শরিফ কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত হুইল চেয়ারে ওমরাহ করানোর জন্য নিয়োজিত লোক সেখানে পাওয়া যায়। তারা হুইল চেয়ার নিয়ে সেখানে অপেক্ষা করেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে তাদের থেকে হুইল চেয়ারের মাধ্যমে ওমরাহ করার সেবা নেওয়া যায়। তাওয়াফ বা সাঈ করার সময় অন্য কাউকে ধাক্কা দেওয়া কিংবা অন্য কারো কষ্টের কারণ হওয়া যাবে না। ওমরাহ প্যাকেজে যদি খাবার অন্তর্ভুক্ত না থাকে, তাহলে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার খাওয়া যাবে। তাছাড়া অন্যান্য দেশি-বিদেশি হালাল খাবারের বিশাল সমারোহ আছে মক্কা-মদিনায় মসজিদুল হারামের আশপাশে।
যারা রমজানের এতেকাফ করার নিয়তে উমরাহ গমন করবেন, সউদি সরকারের হজ ও উমরাহ মন্ত্রণালয়ের অনলাইন পোর্টাল থেকে তাদেরকে এতেকাফের রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। অন্যথায় এতকাফের জন্য মসজিদে হারামে অবস্থান করার সুযোগ কর্তৃপক্ষ না-ও দিতে পারেন। তাই ওমরাহ সার্ভিস প্রোভাইডারকে বলতে হবে এতেকাফের রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি অনলাইনে নিশ্চিত করার জন্য। তবে এতেকাফের শ্লট খুবই সীমিত, তাই অনলাইন পোর্টালে দ্রুত শেষ হয়ে যায়। পবিত্র মদিনায় রিয়াজুল জান্নাহেত প্রবেশের জন্য নুসুক অ্যাপ (NUSUK App) থেকে অবশ্যই স্লট কনফরমেশন (Slot Confirmation) নিতে হবে। অন্যথায় রিয়াজুল জান্নাহতে প্রবেশ করা যায় না।
ওমরাহ পালনের পাশাপাশি পবিত্র মক্কায় ইসলামিক নিদর্শন ও হুজুর (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থানসমূহ পরিদর্শন করার সুযোগ নেওয়া যায়। পবিত্র মক্কা শরিফের হজের আনুষ্ঠানিকতার মূল স্থান আরাফা, মিনা, মুজদালেফা, জাবালে রহমত, জাবালে নূর (হেরা পর্বত), জাবালে সুর ইত্যাদি পবিত্র স্থানসমূহ পরিদর্শন করা যায়। তাছাড়াও মক্কা মিউজিয়াম এবং কিসওয়া বা কাবার গিলাফ তৈরির স্থান, মাকবারাহ মোয়াল্লাহ (জান্নাতুল মোয়াল্লাহ), রসুল (সা.)-এর জন্মস্থানসহ ইত্যাদি স্থান পরিদর্শন করা যায়। তায়েফ নগরীতেও গমন করে ঐতিহাসিক স্থানসমূহ পরিদর্শন করা যায়। পবিত্র মদিনায় মসজিদে কোবা যেখানে দুই রাকাত নামাজ পড়লে এক ওমরাহর সওয়াব পাওয়া যায়, মসজিদে কেবলাতাইন, ওহুদ পাহাড়, জান্নাতুল বাকি (বাকি আল-গারকাদ), খন্দক বা সাত মসজিদ ও বদরের যুদ্ধের প্রান্ত পরিদর্শন করা যায়। পবিত্র মক্কা শরিফে রমজানের শেষ ১০ দিন কিয়ামুল্লাইল নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলিম মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় ও পরমভাবাগের সঙ্গে কিয়ামুল্লাইল নামাজ আদায়ে সমবেত হন। ১০ রাকাত কিয়ামুল্লাইল দীর্ঘ সময় নিয়ে ধীরে ধীরে আদায় করেন ঈমাম সাহেব। পরম তৃপ্তি নিয়ে ও আত্মশুদ্ধির উদ্দেশে লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ ধৈর্যের সঙ্গে কিয়ামুল্লাইল নামাজে শরিক হন।
রমজানে ওমরাহ পালন বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় কিছুটা কষ্টের। সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলমান পবিত্র রমজানে ওমরাহ পালনের জন্য উদ্গ্রীব থাকেন। এত বেশি লোক পবিত্র মক্কা-মদিনায় একসঙ্গে একত্র হওয়ার কারণে স্বাভাবিক চলাচল কিছুটা সংকুচিত হয়। তাই রমজানে ওমরাহ পালন করতে চাইলে শারীরিক কষ্টের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি থাকতে হবে। ওমরাহর সময় কোনো কর্ম, চিন্তা বা চলাচলে যেন মহান আল্লাহ বা তার রসুল (সা.)-এর অসম্মান না হয়, তা সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে তাওয়াফ-সাঈ বা রসুল (সা.) রওজা জিয়ারাহ করার সময় সেলফি বা ছবি না তোলা, অপ্রয়োজনীয় কর্মাদি থেকে বিরত থাকা ও একমাত্র মহান আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাকা এবং অন্যের কষ্টের কারণ না হওয়া—এসব ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
লেখক: সভাপতি, হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)

