অবন্তিকার মায়ের অভিযোগ 

‌‘বিচার না পেয়ে আমার মেয়ে জীবন দিয়েছে’

  • কুমিল্লায় বাবার কবরের পাশে জবি ছাত্রী অবন্তিকার দাফন সম্পন্ন
  • দায়ীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে নগরীতে মানববন্ধন-বিক্ষোভ 
আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৪, ১৮:৪৯

নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে কুমিল্লা নগরীর উত্তর বাগিচাগাঁও এলাকার ভাড়াটে বাসায় গতকাল শুক্রবার রাতে ‘আত্মহত্যা’ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ছাত্রী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা। শনিবার (১৬ মার্চ) বিকালে নগরীর শাসনগাছা মহাজনবাড়ি এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। 

এর পরপরই অবন্তিকার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে নগরীর কান্দিরপাড় এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। 

অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনমের দাবি, তার মেয়েসহ পুরো পরিবারকে ২০২২ সাল থেকে নানাভাবে হয়রানির মাধ্যমে জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে বিচার চেয়েও বিচার পাওয়া যায়নি। বিচার না পেয়ে তার মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এর আগে মেয়ের উপর এমন মানসিক নির্যাতনের ভয়াবহ অবস্থা সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে মারা যান তার বাবা কলেজ শিক্ষক জামাল উদ্দিন। 

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, অবন্তিকার বাবা জামাল উদ্দিন ছিলেন কুমিল্লা সরকারি কলেজের অধ্যাপক। স্ত্রী তাহমিনা শবনম, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে অবন্তিকা ও ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী অপূর্বকে নিয়ে ছোটখাটো সাজানো সংসার ছিল ওই কলেজ শিক্ষকের। শহরের শাসনগাছা এলাকায় পৈত্রিক বাড়ি হলেও তারা থাকেন নগরীর উত্তর বাগিচাগাঁও এলাকার ফায়ার সার্ভিস সড়কের ‘পিসি পার্ক অরণি’ নামের বাসায়। দুই সন্তানের মধ্যে অবন্তিকা উচ্চশিক্ষার জন্য ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। অনার্স ডিগ্রি লাভের পর তিনি বিমান বাহিনীতে চাকরিতে যোগদান করেন। একপর্যায়ে হাঁটুতে ব্যাথাজনিত কারণে চাকরি ছেড়ে জবিতে মাস্টার্সে ভর্তি হন। এরপর ২০২২ সাল থেকে তার জীবনে নেমে আসে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা। 

আজ শনিবার সকালে অবন্তিকার নগরীর বাসায় গিয়ে দেখা যায়, অবন্তিকার মরদেহ এক নজর দেখার জন্য তাদের বাসায় উৎসুক জনতার ভিড়। এ বাসায় এসেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক মেজবাউল হাসান, নুরুন নাহার মজুমদার, মনিরা জাহান সুমিসহ ৩৫ জন শিক্ষার্থী। এসময় অবন্তিকার মা, ভাই ও স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকার বাতাস ভারি হয়ে উঠে। 

অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনম আহাজারি করে বলেন, ‘কোথায়ও বিচার পায়নি আমার মেয়ে। কারণে-অকারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২০২২ সাল থেকে আমার মেয়ের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘জবি প্রশাসনের ডাকে আমি আমার স্বামীকে নিয়ে একাধিকবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছিলাম। বিচার তো পাই-ই নি উল্টো তারা (জবি প্রশাসন) আমাদের আরও মানসিকভাবে হয়রানী করেছে। কখনো থানায় জিডি ও মামলার হুমকি দেওয়া হতো মেয়েকে।’ 

তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘মেয়েকে তার সহপাঠি আম্মান সিদ্দিকী অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছিল, এতে সে সাড়া দেয়নি। বিষয়টি সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে জানিয়ে উল্টো ফল হয়। তিনিও মেয়েকে নানাভাবে হয়রানি ও কটূক্তি করা শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিচার করেনি। আমার স্বামী কলেজ শিক্ষক জামাল উদ্দিন মেয়ের উপর এ মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে মারা যান।’ 

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবন্তিকা | ছবি : সংগৃহীত

কান্না করতে করতে তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল রোজার সময় এ কারণে অধ্যাপক স্বামীকে হারালাম। কাল (শুক্রবার) মেয়েকে হারালাম। কিন্তু ওরা আমার মেয়েকে বাঁচতে দিল না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচার না পেয়ে মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।’ তিনি তার মেয়ের মৃত্যুর জন্য সহপাঠি আম্মান, মাহিয়ান, রাফি ও সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম ছাড়াও জবি প্রশাসনকে দায়ি করেন। 

তাহমিনা শবনম আরও বলেন, ‘শুক্রবার ইফতারের আগে ও পরে মেয়েকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তবে একসঙ্গে ইফতার করেছে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাশের কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। সে প্রায়ই দরজা বন্ধ করে রাখতো। কিছুক্ষণ পর ওর রুমে ফ্যানের শব্দ না পেয়ে ডাকাডাকি করি। কোনো সাড়া মেলেনি। পরে ছেলেকে নিচে পাঠাই, দারোয়ানকে নিয়ে মই দিয়ে পূর্ব পাশের জানালা খুলে দেখতে পায়, ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছে মেয়ে। এরপর পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা পুলিশের একজন সদস্যসহ আমরা ওর নিথর দেহ নামাই। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’ 

অবন্তিকার সহপাঠি আবদুর রহমান ও মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘অবন্তিকা পুরো ক্লাস মাতিয়ে রাখতো। সে কখনো কারও সঙ্গে হাসি দেওয়া ছাড়া কথা বলতো না। কাল তারাবি নামাজে গিয়ে তার মৃত্যুর খবর শুনে যেন আকাশ ভেঙ্গে মাথায় পড়লো। আমরা চাই, বিষয়টির একটি সুষ্ঠু তদন্ত হোক।’ 

জবির আইন বিভাগের শিক্ষক মুনিরা জাহান সুমি বলেন, ‘অবন্তিকা আমাদের প্রিয় ছাত্রী ছিলেন। একজন ছাত্রীকেও যদি ভাইবা পরীক্ষায় ভালো নম্বর দেওয়ার জন্য চাইতাম, সেখানে অবন্তিকার নাম চলে আসতো। তার এভাবে মৃত্যু হবে—এটা কখনো চিন্তাও করিনি।’   

ইত্তেফাক/ডিডি