অনুকরণীয় উদ্যোক্তা রুবিনা

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৯, ২২:৪২

একসময় সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল—নারী আর পুরুষের কাজ আলাদা। কৃষির মতো কাজের বাইরেই ভাবা হতো নারীদের। কিন্তু নারীরাও যে বাড়ির বাইরে গিয়ে কৃষিতে সাফল্য অর্জন করতে পারেন, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নাটোরের রুবাইয়া রহমান রুবিনা। মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন আর কৃষি উদ্যান তৈরি করে সফল নারী উদ্যোক্তার স্বীকৃতি লাভ করেছেন নাটোরের এই শিক্ষিত নারী। মাত্র সাড়ে পাঁচ বছরেই তিনি সফল উদ্যোক্তার সম্মান অর্জন করেছেন। বর্তমানে নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্র সম্প্রসারণেও কাজ করছেন রুবিনা।

নাটোর সদরের চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা রুবিনা। অভাবের কারণে একসময় নিজের সংসারটাও বাঁচাতে পারেননি তিনি। কিন্তু দমে যাননি। প্রতিকূলতার মধ্যে লড়াই করেছেন। বাবা মারা যাওয়ার পর ভেঙে না পড়ে মা আর ছোটো ভাইবোনের দায়িত্ব নিয়ে সংসারের হাল ধরেন। নিজের সেলাই করে উপার্জিত টাকা আর কিছু ঋণে নিজ বাড়ির উঠোনেই শুরু করেন ব্রয়লার মুরগির খামার।                 শুরুতে সেখানেও লোকসান গুনতে হয়। কিন্তু ভেঙে না পড়ে শক্তহাতে নতুন উদ্যমে শুরু করেন খামারের কার্যক্রম। শুধু মুরগির খামারই নয়, বাড়িসংলগ্ন নিজেদের পুকুরে শুরু করেন মাছ চাষ, সঙ্গে ৩০০ হাঁসের সমন্বিত খামার। পাশাপাশি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে তৈরি করেন ফলের ছয়টি বাগানও। রুবিনার হাতের ছোঁয়ায় তার ফলবাগানে এখন আম, লেবু, পেয়ারা, কলা, কুল আর পেঁপের মেলা বসেছে। এসব দেখে নাটোর হর্টিকালচার সেন্টার থেকে ড্রাগন ফলের ৪০টি খুঁটিতে ১২০টি ড্রাগনের প্রদর্শনী খামার স্থাপন করে দিয়েছে রুবিনাকে। চলতি বছরেই ড্রাগনের বাগানে ফল পাওয়া যাবে। ঐ বাগানে সাথি ফসল হিসেবে রুবিনা চাষ করেছেন মৌসুমি সবজি।

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ২০১৮ সালে রুবিনা পেয়েছেন ‘কৃষি উন্নয়নে নারী’ পদক। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরও তাঁকে মূল্যায়ন করেছে। তাঁদের আঙিনায় আইপিএম স্কুল পরিচালনা করে এলাকার ২৫ পরিবারের ৫০ সদস্যকে হাঁস-মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, সবজি চাষ, বসতবাড়ির বাগান ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও অর্থসহায়তা দিয়েছে নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। রুবিনাকে সভানেত্রী করে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের নিবন্ধনে গঠিত ইয়ুথ উইম্যান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি সেলাই কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। রুবিনাকে নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ। নাটোর মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর রুবিনাকে দিয়েছে জয়িতা পদক, ইউনিলিভার ‘তোমার স্বপ্ন কর সত্যি’ ক্যাটাগরিতে ২ লাখ টাকার প্রাইজমানি।

নিজের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে রুবিনা বলেন, ‘আমার কাজের সার্থকতা তখনই আসবে, যখন দেখব সমাজের অবহেলিত নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে সামনে এগিয়ে নিতে পারছি। আমি কৃষির মাধ্যমে সবুজ বিপ্ল­ব এবং গাভির মাধ্যমে শ্বেত বিপ্ল­ব ঘটাতে চাই।’

নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের অধীন ‘বছরব্যাপী ফল উত্পাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় রুবিনাকে কমিউনিটি হর্টিকালচার প্রভাইডার মনোনীত করা হয়েছে। মাসে ৩ হাজার টাকা সম্মানী ভাতায় কৃষিতে উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছেন রুবিনা। নিজ এলাকার আট শতাধিক ব্যক্তিকে হর্টিকালচার সেন্টারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছাড়াও প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুন নাহার বলেন, ‘দেশের ২ কোটি নারী উদ্যোক্তা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। সমাজের দুস্থ ও বেকার নারীরা আজ উদ্যোক্তা হিসেবে সফল। উদ্যোক্তা এসব নারী আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে গতিশীল করছে।’