মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

এটাস্টেশন সিস্টেম প্রস্তুত হলেও এখনো সুবিধা পাচ্ছেন না বিদেশগামীরা

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৪, ১৬:৪০

দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশ গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে শত শত পরিবার। লোভনীয় বেতনে চাকরি, মোটা অঙ্কের টাকার খবরে সুনির্দিষ্টভাবে যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে না নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ তথ্য। সম্প্রতি ফেনী সদর উপজেলা ধর্মপুর ইউনিয়ন থেকে জুয়েল, হাসিব এবং জিয়া উদ্দিনকে বিদেশ নিয়ে যান দুলাল আহমেদ নামের এক ব্যক্তি। চাকরি দেওয়ার কথা বলেন একটি সুপার সপে। সেখানে নিয়ে এক আত্মীয়র বাসায় দুই মাস রাখা হলেও চুক্তিবদ্ধ কোম্পানিতে নেওয়া হয়নি। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে কোম্পানির কথা বলা হয়েছে সেখানে লোক নেওয়ার তথ্য ছিলো ভুয়া।

অবৈধভাবে কাগজপত্র তৈরি করে দুলাল আহমেদ দীর্ঘদিন এভাবেই লোক নিয়ে যাচ্ছেন। কথা হয় জুয়েলের মামা রিপনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে নতুন যে কোম্পানিটির কথা বলে তিনজনকে আনা হয়েছে, এই কোম্পানি আদৌ বাংলাদশ থেকে কোনো শ্রমিক নিয়ে আসতে অনুমোদন দেয়নি। কাগজপত্র জালিয়াতি করে এই কাজ করা হয়েছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উন্নত দেশগুলো থেকে শ্রমিকরা আসার আগেই ডিজিটাল এটাস্টেশনের মাধ্যমে আগেই সব তথ্য পাওয়া যায়, জানা যায়। কোথায়, কোন কোম্পানিতে কত টাকায় চাকরি তা আগেই অনলাইনের মাধ্যমে জানা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এটি এখনো পরিপূর্ণ চালু না হওয়া প্রতিনিয়ত এভাবেই মানুষ প্রতারিত হচ্ছে।

নিয়ম অনুসারে, বিদেশগামী কর্মীদের চাহিদাপত্র বা জব সঠিক কিনা তা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করে থাকে সে দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস। কর্মীদের চাহিদাপত্র - চাকরি এবং বেতন এমনকি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির সব ধরণের স্ট্যাটাস মূল্যায়ন করে সেই প্রতিষ্ঠান আদৌ কাজের উপযোগী কিনা- তা নির্ধারণ করা হয় এটাস্টেশনের মাধ্যমে। তবে দূতাবাসে গিয়ে এই সেবাটি নিতে গেলে নানা দুর্ভোগের শিকার হতে হয়- এমন আশঙ্কায় বড় একটি অংশ কর্মীর চাহিদাপত্রের এটাস্টেশনে আবেদনই করে না। আর এ কারণেই জানার উপায় থাকে না নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ আসলেই সঠিক কিনা। ফলে যাছাই বাছাই ছাড়াই বিদেশ গিয়ে বিপদে পড়তে হয় অনেককেই। অথবা অসাধু চক্র সহজেই বিদেশগামীদের সাথে প্রতারণা করে পার পেয়ে যেতে পারে।

বিদেশে গিয়ে কর্মীদের প্রতারিত হওয়ার মাত্রা ঠেকাতে 'আমি প্রবাসী'তে অনলাইন এটাস্টেশন প্রস্তুত থাকলেও এখনো এই সার্ভিস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি তাদের। সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা এবং আমি প্রবাসীর টেকনিক্যাল টিম দুবাই এবং আবুধাবিতে গিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে ডিজিটাল এটাস্টেশনের পরিচয় ডেমোনেস্ট্রেশন করলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে অনলাইন এটাস্টেশন প্রক্রিয়াটি 'আমি প্রবাসী'তে সংযুক্ত করা হলেও বিদেশ গমনেচ্ছুরা এই সেবাটি এখনো পাওয়া শুরু করেনি।

এদিকে প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম হলেও প্রবাসীদের ডেটাবেস নেই সংশ্লিষ্ট অনেক দপ্তরে। তাই অভিবাসীদের জন্য আধুনিক ছোঁয়ায় ডেটাবেস রক্ষণাবেক্ষণ করছে 'আমি প্রবাসী'। প্রায় ৪০ লাখ অধিবাসী শ্রমিকের তথ্য রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিদেশগমনেচ্ছুদের সেবা ডিজিটালাইজড করার মাধ্যমে অভিবাসন খাত এখন পরিণত হচ্ছে স্মার্ট সেক্টরে। মাত্র তিন বছরেই দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী অ্যাপের কাতারে জায়গা করে নিয়েছে ‘আমি প্রবাসী’। এরই মধ্যে অ্যাপটি ব্যবহার করছেন ৬০  লাখেরও বেশি মানুষ। এ সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। একইসঙ্গে ডাটাবেস রক্ষণাবেক্ষণে এর সমৃদ্ধি বেড়েছে আরও বহু গুণে।

‘আমি প্রবাসী’র সিইও নামির আহমেদ বলেন, আমাদের অনলাইন এটাস্টেশন পদ্ধতিটি বেশ কয়েক মাস আগেই আমরা আমাদের সিস্টেমে সংযুক্ত করেছি এবং প্রক্রিয়াটি এখন সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্যও  প্রস্তুত। তবে এটির ব্যবহার শুরু না হওয়ায় এর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা নিতে পারছে না কেউ। অনেকে দেশেই আমাদের দূতাবাস না থাকায় শুধুমাত্র সত্যায়নের কারণেই সেখানে আমাদের কর্মীরা যেতে পারছেন না। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই দূতাবাসে যেতে পাড়ি দিতে হয় কয়েক হাজার কিলোমিটার। এ কারণেই অনেক নিয়োগকর্তাই এতদূর পথের ঝামেলায় যেতে চান না। ফলে অনেক সুযোগ বা অনেক দেশে যাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আমাদের শ্রমিকরা।

তিনি বলেন, কর্মীদের চাহিদাপত্র সত্যায়নের পদ্ধতিটি চালু হলেই বিদেশে গিয়ে মানুষ প্রতারিত হওয়া থেকে বেঁচে যাবে। অর্থাৎ এর ফলে কেউ আর ভূয়া চাকরি দিয়ে কর্মী নিতে পারবে না। এর সাথে সংশ্লিষ্টরা ঘরে বা অফিসে বসে অনলাইনেই করতে পারবে তাদের কর্মীদের চাহিদাপত্রের সত্যায়নের কাজ। বাড়তি ভোগান্তি না হওয়ায় সত্যায়নের সংখ্যা বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক সালেহ আহমদ মোজাফফর বলেন, ডিজিটাল এটাস্টেশনের বিষয়ে সরকার অনেক মনোযোগী। প্রতারণার বিষয় থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখতে এটি আরও কীভাবে সহজ করা যায়, এ জন্য কাজ করা হচ্ছে - যাতে আমাদের জন্যও সহজ হয় কিংবা যারা বিদেশ যাবেন তাদের জন্যও সহজ হয়। ডিজিটাল মাধ্যমকে আরও বেশি ব্যবহার করা গেলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে অবশ্যই। এটাস্টেশনের বিষয়টি আরও কীভাবে সহজ করা যায় বা অনলাইনে কিভাবে পরিপূর্ণ করা যায়, এটি আমাদের ঊর্ধ্বতনরা হয়তো খুব দ্রুতই সমাধান করতে পারবেন।

ইত্তেফাক/এসকে