একটা দেশের উন্নয়ন বলতে আমরা স্বাভাবিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নতির দিকটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির নব্য আধুনিক ধারণা হলো কেবল জিএনপি কিংবা জিডিপি বৃদ্ধিতেই সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নতি। কিন্তু মানুষের জীবন বা সমাজের উন্নতি কেবল অর্থনীতির মাপকাঠি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। একটা দেশের উন্নয়নের অংশ হিসেবে সমাজের নৈতিক মূল্যবোধেরও একটা বড় ভূমিকা রয়েছে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উত্তর ইউরোপে ‘উন্নয়ন’ ধারণার উত্থান হয়েছিল। দেশের উন্নয়নে বাধা দানকারী সূচকের অন্যতম একটি হলো নৈতিক মূল্যবোধহীন সমাজ। আমাদের দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে গভীর মনোযোগ দিলেও মানুষের মধ্যকার মূল্যবোধের অধঃপতনের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। মূল্যবোধ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হয় না। মূল্যবোধের এই অধঃপতনের ফলে দেশে দুর্নীতি ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছে।
সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অর্থনীতিতে নৈতিক মাপকাঠি নির্ধারণ করা আবশ্যক। মূল্যবোধের অবক্ষয় দেশে দুর্নীতির প্রকট বাড়িয়ে দেয়। দুর্নীতি বর্তমান সময়ে একটি সামাজিক ব্যাধি। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি অনুসন্ধানের জন্য ১৯৫৩ সালে ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ গঠিত হলেও এর যথোপযুক্ত প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান জাতিকে হতাশ করে। বাংলাদেশে দুর্নীতির চিত্র কেমন সেটি বোঝা যায় দেশের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে। আইনের শাসনের সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাবে দেশে দুর্নীতি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এসব দুর্নীতির ঘটনার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে মানুষের অনৈতিক কর্মকাণ্ড। দুর্নীতি রুখতে প্রয়োজন প্রত্যেকের মধ্যে সার্বক্ষণিক নৈতিক প্রহরার ব্যবস্থা করা; অর্থাত্ মানুষের মনোজগতে শক্ত নৈতিকতার ভিত রচনা করতে হবে।
যে সব দেশের নাগরিকদের মধ্যে উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ থাকে, সে সব দেশে দুর্নীতি বা অপরাধপ্রবণতাও কম থাকে। দেশের দুর্নীতিগ্রস্তদের অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চ শিক্ষিত। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা স্তর তারা পার করে এসেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু নৈতিক মূল্যবোধের ধারক হওয়ার শিক্ষা দিতে পারেনি। অনৈতিক মানুষ দিয়ে আমরা কখনোই সুন্দর ও স্বাভাবিক সমাজ ও দেশ গড়তে পারি না।
প্রতিটি জাতির জাতীয় উন্নয়নের মূল বিষয়গুলো হলো নৈতিক মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ, আইনের শাসন, রাজনীতিতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা। মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা, সততা ও ন্যায়নীতি জাতিকে উন্নতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। পৃথিবীর ইতিহাসে সত্, ন্যায়নিষ্ঠ ও পরিশ্রমী জাতিই উন্নতির শিখরে আরোহণ করেছে। কিন্তু জাতীয় জীবনে দুর্নীতি প্রবেশ করলে জাতির সব উন্নতির পথ বন্ধ হয়ে যায়। দুর্নীতির করাল গ্রাসে একটি সম্ভাবনাময় জাতির ভবিষ্যত্ ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়।
দুর্নীতি রুখতে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা— সব স্তরেই শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনায় মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা চর্চাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সুশাসন ও সুনাগরিক হওয়ার আদর্শ শিক্ষা প্রদান করতে হবে। নৈতিক শিক্ষাকে প্রায়োগিক চর্চায় রূপান্তর করে মানবহিতৈষী কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। নৈতিক আদর্শে উজ্জীবিত একজন মানুষ কখনো দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে দুর্নীতির পথে ধাবিত হতে পারে না। দুর্নীতির মতো এই সর্বনাশা সামাজিক ব্যাধির মরণ ছোবল থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
দেশে জনকল্যাণকর টেকসই বিনিয়োগ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য দরকার ‘স্বচ্ছ প্রশাসন’। যখন জবাবদিহিতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে তখন দেশে সুশাসনের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ। জনগণকে হতে হবে নৈতিক। দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যক্তি পর্যায়ে সবাইকে দায়িত্বশীল, কর্তব্যনিষ্ঠ ও মূল্যবোধ সংবলিত মানুষ হতে হবে।
লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

