সর্বদা ইতিবাচক চিন্তা করিতে পারাটা বিশাল এক শক্তি। ইহাকে মানবজীবনের সফলতার গোপন রহস্য হিসাবে বিবেচনা করা হইয়া থাকে। ড. নরম্যান ভিনসেট পিয়েল ‘দ্য পাওয়ার অব পজিটিভ থিংকিং’ নামে আন্তর্জাতিকভাবে একটি বেস্টসেলার গ্রন্থের রচয়িতা। এই গ্রন্থে তিনি বিশ্বাস ও অনুপ্রেরণা লাভের এক শক্তিশালী মেসেজ দিয়াছেন। একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও অর্থবহ জীবন পরিচালনায় আমাদের কাজেকর্মে এই বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। আশা ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সেতুবন্ধ রচনায় এই বিশ্বাস মানুষের জীবনে কাজ করে চালিকাশক্তি হিসাবে। এই জন্য প্রতিটি কাজে আমাদের আত্মবিশ্বাস থাকিতে হইবে। কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষ তাহার ‘পারিব না’ কবিতায় লিখিয়াছেন, ‘পারিব না—এ-কথাটি বলিও না আর,/ কেন পারিবে না তাহা ভাবো একবার’। তিনি ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’ বলিয়া পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। আমরা যদি আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হইয়া এই অধ্যবসায়ের ব্রত গ্রহণ করি এবং সর্বপ্রকার হতাশাকে কাটাইয়া উঠিয়া নিজ নিজ কাজে মনোযোগী হই, তাহা হইলে সাফল্য আমাদের ধরা দিবেই। এই জন্য আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণপূর্বক সংকল্পবদ্ধ হইতে হইবে। অলসতা পরিহার করিয়া ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্কের উন্নয়ন সাধন করিতে হইবে। পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরিয়া রাখিতে হইবে।
উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপিকে বরাবরই বলিতে শুনা যায় যে, তাহারা দেশের উন্নয়নে নানা কিছু করিয়াছেন। তাহাদের কেন এইভাবে বলিতে হয়? জনগণ কি স্বচক্ষে উন্নয়ন দেখিতে পায় না? জনগণ কেন উন্নয়নের কথা বলে না? এই সকল দেশে উন্নয়ন যে একেবারে হয় না, তাহা নহে। এই জন্য খুব বেশি দূরে যাইবারও দরকার নাই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছেন : ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।’ অনুরূপভাবে ঘর হইতেই বাহির হইলেই এই সকল দেশের মানুষ দেখিতে পায়—বিভিন্ন উড়ালসড়ক, উন্নত রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, মিষ্টি শব্দে মেট্রোরেলের নিয়মিত চলাচল ইত্যাদি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন উন্নয়নও হইয়াছে যাহা বিদেশের চাইতেও কম কীসের—তাহা বলাই বাহুল্য। যেমন—শত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো দেশে চিকিত্সাব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হইয়াছে। বিদেশে যেইখানে দন্তচিকিত্সা ব্যবস্থা ব্যয়বহুল, সেইখানে এই সকল দেশে তুলনামূলক অনেক কম খরচে ইহার উন্নতমানের চিকিৎসাসুবিধা পাওয়া যায়। হৃদরোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিত্সাও হইয়া উঠিয়াছে সুলভ। এই যে ফ্লাইওভার, রাস্তাঘাট ইত্যাদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হইয়াছে, ইহা এই সকল দেশের নাগরিকদের সহজেই নজরে পড়ে; কিন্তু ইহার পরও অনেক ক্ষেত্রে জনগণের প্রশংসা পাওয়া যায় না কেন? সেইখানে মন্ত্রী-এমপিদের এত ঘটা করিয়া উন্নয়নের কথা কেন বলিতে হইবে? সমস্যা আসলে কোথায়? আসলে সেই সকল দেশে নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নের পরও জাতীয়, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির কি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সাধন হইয়াছে? রাজনীতির ক্ষেত্রে কি নেতৃত্বের গুণমানে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে? শিক্ষার মানে কি উন্নতি হইয়াছে? প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ প্রভৃতি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলিকে নৈতিক ও পেশাগত দিক হইতে শক্তিশালী করা গিয়াছে? এই ক্ষেত্রে কতটা আত্মবিশ্বাস ফিরিয়া আসিয়াছে?
ব্যর্থতা থাকিবার পরও অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিকে বিশ্বাস করিতে হইবে যে, হ্যাঁ, তাহারা পারেন। পারিব না বলিয়া তাহাদের মুখ ভার করা যাইবে না। স্বাধীনতা লাভের কয়েক দশক পর আসিয়াও তাহাদের সর্বদা আশাবাদী হইতে হইবে। আত্মবিশ্বাসের কোনো ঘাটতি না থাকিলে নিজের ঢোল নিজে পিটাইবার কোনো দরকার হইবে না। জনগণই তখন তাহাদের কাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ করিবেন ও নেতৃত্ব বাছাইয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন; কিন্তু তাহাদের উপরও যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাস না থাকে, তাহা হইলে এইভাবে তাহাদের আত্মপ্রচারের ব্যর্থ চেষ্টা করিয়াই যাইতে হইবে।

