বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভূমিধস একটি জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এটি এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মানুষের জান-মালের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভূমিধসের কারণে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচুর সম্পদ এবং মানুষের জীবনহানী হচ্ছে। ভূমিধস প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও অধিকাংশ সময়ই এর পেছনে মানুষের অপরিণামদর্শী কার্যকলাপ ভূমিকা পালন করে থাকে। অপরিকল্পিতভাবে ভূমি ব্যবহারের ফলে ভূমিধসের ঘটনা ঘটতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করলে দেখা যাবে, আমাদের এখানে মাঝে মাঝে ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটছে, যার পেছনে কোনো না কোনোভাবে মানুষের ভূমিকা থাকে। বাংলাদেশে সাধারণত তিন পার্বত্য জেলা ও সিলেট অঞ্চলে মাঝে মাঝেই ভূমিধসের ঘটনা ঘটে থাকে। বিশেষ করে তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষই ভূমিধসের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কোনো কারণে একটি এলাকার মাটি সরে গেলে ভূমিধসের সৃষ্টি হতে পারে। মাটি সরে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। আমাদের দেশে মে মাস থেকে সেপ্টেন্বর পর্যন্ত প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। মৌসুম পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হয়। বেশি বৃষ্টিপাতের কারণে মাটি নরম হয়ে যায়। মাটির ধারণক্ষমতা কমে যায়। সামান্য কারণেই মাটি ধসে পড়তে পারে। বাংলাদেশে যেসব ভূমিধস হয়ে থাকে, তার পেছনে প্রধানত অতিরিক্তি বৃষ্টিপাতই দায়ী। বৃষ্টিপাত ছাড়াও ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হতে পারে। ভূমিকম্পের কারণে মাটির স্তর সরে গিয়ে ভূমিধসের সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস বেশি হয়। কোনো কারণে পাহাড়ের তলদেশের মাটি নরম হয়ে সরে গেলে ভূমিধসের সৃষ্টি হতে পারে। ২০১৭ সালে ভূমিধসের কারণে ১০০ জনের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে আমাদের দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এ সময় ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়ে যায়। বিশেষ করে পাহাড় ও টিলাবেষ্টিত এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা এই সময়ে সাংঘাতিকভাবে বাড়ে। সমতলভূমিতেও ভূমিকম্প হতে পারে, তবে তার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ততটা গুরুতর হয় না।
বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আবহাওয়া পরিবর্তন হচ্ছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ভূমিধস, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাচ্ছে। ভূমিধসের পূর্বাভাস দেওয়া বেশ কঠিন। তাই কোনো সময় অতিমাত্রায় বৃষ্টিপাত হলে বা অন্য কোনো মাটির স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে যারা পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করেন, তাদের সব সময়ই ভূমিধসের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় অনেকেই পাহাড়ের পাদদেশে ঘর নির্মাণ করে বসবাস করেন। ভূমিধসে এদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ এসব মানুষ দরিদ্র শ্রেণির। কাজেই তারা চাইলেই সুরক্ষিত ভবন নির্মাণ করে বসবাস করতে পারেন না। তারা কোনো রকমে ঘর টিনের অথবা আধাপাকা ভবন নির্মাণ করে বসবাস করেন। স্বল্পমাত্রার ভূমিধসের কারণেই এরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
আমি রিসার্চ ফেলো হিসেবে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব কুইবেকে আছি। সেখানে ভূমিধস নিয়ে একটি গবেষণা হচ্ছে। তাদের দেশেও ভূমিধস হয়। তাদের মাটির ধরন বা প্রকৃতি আমাদের দেশের মতো নয়। কানাডার মাটি হচ্ছে সেনসেটিভ ক্লে। সেনসেটিভ ক্লে হওয়ার কারণে অনেক সময় দেখা যায় মাটি হঠাত্ করেই ধসে যাচ্ছে। তাদের দেশের মাটির ধারণক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বৃষ্টি অথবা ভূমিকম্প হলেই মাটি ধসে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে প্রধানত বৃষ্টির কারণেই ভূমিধস হয়ে থাকে। ভূমিধসের কারণে সড়ক ব্লক হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ও যানবাহনের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের ভূমিধস নিয়ে গবেষণা করার সময় এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। ভূমিধসের পূর্বাভাষ দিতে হলে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে। তার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করতে হবে আগের ভূমিধসগুলো কোন হয়েছিল। তার ক্ষতির মাত্রা কেমন ছিল। ভূমিধসের কোনো পূর্বাভাস পদ্ধতি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তবে অতীতে সংঘটিত ভূমিধসের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যদি সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে তার ভিত্তিতে একটি প্রক্ষেপণ করা যেতে পারে। আগে কত দিন পর পর বড় ধরনের ভূমিধস হয়েছে, তার ভিত্তিতে অনুমান করা যেতে পারে ভবিষ্যতে কখন ভূমিধস হতে পারে। নিশ্চিত করে বলা না গেলেও অনুমান করা যেতে পারে এবং সেই অনুমান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়।
ভূমিধস একটি জটিল সমস্যা। আমরা চাইলেই ভূমিধস ঠেকাতে পারব না। তবে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত রাখার ব্যবস্থা করতে পারি। এছাড়া আমরা মাটির উন্নয়ন ঘটাতে পারি। এলাকাভিত্তিক কাজটি করা যেতে পারে। জেড গ্রাউটিং অথবা বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির ধারণক্ষমতার উন্নয়ন ঘটানো যায়। এছাড়া সম্ভাব্য ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় দেওয়াল তৈরি করে ভূমিধস ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেসব এলাকার মাটি অত্যন্ত নরম এবং সহজেই ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকে, সেই সব এলাকায় এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কেমিক্যাল ব্যবহার করা হলে মাটির ঘনত্ব ও চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ে। ছোটখাটো চাপে সেই মাটি ধসে পড়বে না। মাটির গাঁথুনি যদি শক্ত হয়, তাহলে সেই মাটি সাধারণ ভূমিধসে বিপর্যস্ত হবে না। ভূমিধসপ্রবণ এলাকা যেমন—পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাড়িগুলো ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি করা যেতে পারে। বাড়িগুলো যদি ভূমিধস সহনীয় করে নির্মাণ করা তাহলে বিরূপ পরিবেশেও তা টিকে থাকবে এবং ধসের সৃষ্টি হবে না। পাহাড়ি এলাকায় অনেক সময় দেখা যায়, উপজাতিরা পাহাড়ের ঠিক পাদদেশে বাড়ি নির্মাণ করে থাকেন। এই প্রবণতা যে কোনো মূল্যেই হোক বন্ধ করতে হবে। কারণ যারা পাহাড়ের পাদদেশে বাড়ি নির্মাণপূর্বক বসবাস করেন, তাদের ভূমিধসে জানমাল হারানোর আশঙ্কা বেশি থাকে। কোনো কারণে একবার ভূমিধসের সৃষ্টি হলে এরা বাড়িতে থাকা অবস্থায়ই মারা যেতে পারে। রাতের বেলায় ভূমিধস হলে ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হয়। কারণ রাতে মানুষ সাধারণত ঘুমিয়ে থাকে। সেই অবস্থাতে ভূমিধসের সৃষ্টি হলে কারো পক্ষেই ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।
ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় যেসব বাড়ি তৈরি করা হবে, তা সব সময়ই পাহাড় থেকে দূরে নির্মাণ করা উচিত। এছাড়া পাহাড়ের চারদিকে এমনভাবে শক্ত দেওয়াল নির্মাণ করা যেতে পারে, যা সহজেই ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ভূমিধস-সহনীয় নির্মাণসামগ্রী পাওয়া যায়। বাড়ি-ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করা যেতে পারে। আমরা চাইলেই ভূমিধস ঠেকাতে পারব না। কারণ এটা একধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে সতর্কতা অবলম্বন করা হলে ভূমিধসের ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই সহনীয় মাত্রায় রাখা যেতে পারে। ভূমিধসপ্রবণ এলাকা দিয়ে যে রাস্তা নির্মাণ করা হবে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কারণে ভূমিধসের কারণে রাস্তার মাটি দ্বারা ব্লক হয়ে গেলে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের চলাচলে অসুবিধা হবে। ত্রাণকাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। এতে ক্ষতির পরিমাণ অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। জলবায়ু ও ভূমিধস-সহনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আর কোনোভাবেই পাহাড়ের পাদদেশে কাউকে বাড়ি নির্মাণ করে থাকতে দেওয়া যাবে না। যে বছর বৃষ্টি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হবে, সেই বছর আমাদের অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ বেশি বৃষ্টিপাত ভূমিধসের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই কোনো বছর বেশি বৃষ্টিপাত হলে সেই সময় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী নাগরিকদের সাময়িক সময়ের জন্য হলেও অন্যত্র স্থানান্তর করা যেতে পারে।
উন্নত দেশগুলোতে ভূমিধস নিয়ে নানা ধরনের গবেষণাকাজ সম্পাদিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেই তুলনায় ভূমিধস নিয়ে গবেষণা তেমন একটা হচ্ছে না। আমাদের এখন থেকেই ভূমিধস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে যেসব গবেষণা হচ্ছে, তা তাদের প্রেক্ষাপটে হচ্ছে। কাজেই সেই সব গবেষণা আমাদের দেশে হুবহু কার্যকর করা যাবে না। আমাদের দেশের উপযোগী করে গবেষণা করতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে সেনসেটিভ ক্লে বেশি থাকে। আমাদের দেশে সফট ক্লে বেশি। তাই এখানে ভূমিধসের আশঙ্কাও বেশি। সেনসেটিভ ক্লের তুলনায় সফট ক্লে ভূমিধসে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা চাইলেই ভূমিধস বন্ধ করতে পারব না, কিন্তু প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। বাংলাদেশকে ভূমিধস নিয়ে বিস্তর গবেষণা করতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে যে ধরনের গবেষণা হয়, আমাদের এখানে তার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ধরনের গবেষণা হতে হবে। তাদের গবেষণালব্দ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি, তবে আমাদের এমনভাবে গবেষণা করতে হবে, যা আমাদের দেশের জন্য উপযোগী হয়।
লেখক: রিসার্চ ফেলো, ইউনির্ভাসিটি অব কুইবেক, কানাডা
অনুলিখন: এম এ খালেক
