বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অর্ধেক পৃথিবী যেন পুড়ছে! 

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২২, ০৩:০১

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত ডিফরেন্ট টাচের একটি বিখ্যাত গান আছে। গানটি তাদের সিগনেচার গান হিসেবেও পরিচিত। গানটি শুরু হয়েছে এভাবে—শ্রাবণের মেঘগুলি জড়ো হলো আকাশে/ অঝরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে...’। ১৯৮৭ সালের শ্রাবণ মাসে গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবু যখন গানটি রচনা করেন, তখন একনাগাড়ে চার দিন বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টিতে ঘর থেকে বের হওয়া ছিল কঠিন। এখন সেই শ্রাবণ মাসই চলছে। ডাক্তাররা বাইরে বেরোতে বারণ করছেন। তবে এবার কারণ একেবারেই ভিন্ন। মূলষধারে বৃষ্টির জন্য নয়, প্রচণ্ড দাবদাহের কারণে এবার বাইরে যাওয়া মানা।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ঋতু বর্ষাকাল। আবার ২২ শ্রাবণ তার প্রয়াণ দিবস। শ্রাবণের ভরা বর্ষায় সবাইকে কাঁদিয়ে তিনি চিরবিদায় নেন। সরাসরি শ্রাবণ নিয়ে তার ২৪টি গান রয়েছে। যেমন—‘ওগো আমার শ্রাবণ মেঘের খেয়া তরীর মাঝি/ অশ্রুভরা পূরব হাওয়ায় পাল তুলে দাও আজি।’ কিংবা ‘থামাও রিমিকি ঝিমিকি বরিষণ/ ঝিল্লি ঝনক ঝন নন হে শ্রাবণ’। অথবা ‘এই শ্রাবণ-বেলা বাদল ঝরা/ যুথি বনের গন্ধে ভরা’।

শ্রাবণ নিয়ে এভাবে গৌরচন্দ্রিকা করার কারণ হলো, এই শ্রাবণে আজ অনেকের মন ভালো নেই। কোথায় শ্রাবণ মাসের বর্ষায় কবিতার বই খুলে পড়া হবে, হিমেল হাওয়ায় মন ভেজানো হবে, জানালার পাশে চাপা মাধবী, বাগানবিলাসী হেনা দুলবে, তা না হয়ে আজ দাবদাহে সবার গা পুড়ে যাচ্ছে। আষাঢ়ের শেষের দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে, তা এখনো চলছে। ভরা বর্ষায় খরতাপে পুড়ছে দেশ। অনেকেই ঋতুর এই খামখেয়ালিপনাকে মেনে নিতে পারছে না। এই বৃষ্টিহীন বর্ষায় মানুষের জীবনে আজ লেগে গেছে হাঁসফাঁস। ভ্যাপসা গরম ও গুমোট আবহাওয়ায় উঠছে নাভিশ্বাস। বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষক ধানের চারা রোপণ করতে পারছে না। কোথাও কোথাও জমি ফেটে চৌচির। গরমে জনজীবন ও প্রাণিকুল অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশে গত দুই দিনে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেশি ছিল। ১৯৪৮ থেকে ২০২২ সালের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৭০ থেকে ৭৪ বছরের ইতিহাসে চলতি জুলাই মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের নয়, ভয়াবহ দাবদাহ-দাবানলে উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপসহ অর্ধেক পৃথিবীই এখন জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে। আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সর্বত্র অসহনীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে মরক্কোয়ও দাবানালের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। স্পেন, পতু‌র্গাল প্রভৃতি দেশের অবস্থা শোচনীয়। যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ পাঁচ দেশে ইতিমধ্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। শুধু ইউরোপে নয়, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, ভারত, পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়া জুড়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এখন ৪০ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সে শহরাঞ্চল ছেড়ে মানুষ অন্যত্র চলে যাচ্ছে। গ্রিসের রাজধানী অ্যাথেন্সের ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে দমকলবাহিনী।

গতকাল সর্বশেষ যে খবর বেরিয়েছে তা ভয়াবহ। স্পেনে হেলিকপ্টার থেকে দমকলবাহিনী দাবনলের শিখা নেভাতে পানি ছিটিয়ে যাচ্ছে। এখানে তাপমাত্রা ৪৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে গেছে। ফ্রান্সে ১১ হাজার হেক্টর এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখানকার দাবানল নেভাতে ১ হাজার ২০০ ফায়ার সার্ভিসের কর্মী নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। পর্তুগালের ১৩টি বনে দাবানল নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের ১ হাজার কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। গতকাল এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, স্পেন ও পর্তুগালে আসলে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে পর্তুগালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী শুধু পর্তুগালেই মারা গেছেন ৬৫৯ জন। নিহতদের অধিকাংশই বয়োবৃদ্ধ। এভাবে জলবায়ু পরিবর্তন এখন সবাইকে প্রভাবান্বিত করছে এবং ভাবিয়ে তুলছে।

আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারতের অবস্থাও সংকটাপন্ন। ভারতের রাজস্থান, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, ওড়িশা, ছত্তিশগড় ও অন্ধ্র প্রদেশের বেশির ভাগ শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভারতীয় মহাসাগরের স্রোতের সঙ্গে সম্পর্কিত বসন্তকালীন বৃষ্টি এই অঞ্চলে পৌঁছানোর আগেই সমুদ্রে ঝরে পড়ার কারণে ভূমি অঞ্চলে বৃষ্টি হচ্ছে না। সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে তাপপ্রবাহ দেখা দেয়। তাই জুলাই মাসের এই দাবদাহকে বলা হচ্ছে অস্বাভাবিক। এটা জলবায়ু পরিবর্তনেরই সুস্পষ্ট লক্ষণ। প্রকৃতি আগের মতো আর স্বাভাবিক আচরণ করছে না। হয়তো দু-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টি হবে, তবে শ্রাবণ মাসের এই দাবদাহ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, প্রতিকূল ও পরিবর্তিত আবহাওয়ার আচরণ নিয়ে ভাবতে হবে সারা বিশ্ববাসীকেই।

পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নতুন নয়। আমাদের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণেই পৃথিবী বারবার বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব ধনী-গরিব, উন্নত-অনুন্নত সব দেশের ওপরই কমবেশি পড়ছে। চলতি বছরে পৃথিবীর অনেক দেশেই অস্বাভাবিক বন্যা দেখা দিয়েছে। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনসহ অনেক দেশ আকস্মিক বন্যার শিকার হয়েছে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে এবার এত পরিমাণ বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়, যা ১২০ বছরের মধ্যে হয়নি। এর প্রভাবে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে স্মরণাতীতকালের বন্যা হয়েছে এবং এই বন্যার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে এই অঞ্চল এখনো মুক্ত হতে পারেনি। শিল্পযুগ শুরু হওয়ার পর থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ১ সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বে এই উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণ। কিন্তু সেটা দ্রুত হ্রাস করার ব্যাপারে বিশ্বনেতারা এখনো শুভবুদ্ধির পরিচয় প্রদান করছেন বলে প্রতীয়মান হয় না।

আবহাওয়াবিদেরা মনে করছেন, ভারী বৃষ্টিপাত ছাড়া আবহাওয়ার এই রুদ্রমূর্তির অবসান হবে না। আকাশে শরৎ ও হেমন্তকালের মতো বিক্ষিপ্ত মেঘের আনাগোনা দেখা দিচ্ছে। তবে বর্ষাকালে যে পুঞ্জীভূত মেঘ বাংলাদেশে অবস্থান করার কথা, সেটা এখানে অবস্থান করছে না। এটা এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছে। এ কারণে বর্ষাকাল সত্ত্বেও বাংলাদেশে মুষলধারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। গত এক দশক ধরেই আমাদের আবহাওয়ায় বিরাজ করছে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। শীতকালেও আমরা আগের মতো আর শীত অনুভব করি না। আমরা জানি, যদি টানা তিন দিন অন্তত ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করে, তবে তাকে তাপপ্রবাহ বলে। বাংলাদেশে এই তাপপ্রবাহ গত ৫ জুলাই থেকেই বিরাজ করছে, যা শিগগির দূরীভূত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুর পালাবদল প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন ঋতু নিয়ে আমাদের যে শিল্প-সাহিত্য রয়েছে, তার সঙ্গে আমরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিল বা প্রাসঙ্গিকতা খঁুজে পাচ্ছি না। আমরা আশা করি, শিগ্গিরই শ্রাবণ তার চিরচেনা রূপে আবার ফিরে আসবে। শ্রাবণের বর্ষণে মুখরিত হয়ে উঠবে চারদিক। বাংলাদেশের জনজীবনে ফিরে আসবে স্বস্তি ও শান্তি। একই সঙ্গে বিশ্বের যেসব দেশে দাবদাহ ও দাবানল বইছে, তারও অবসান হবে।

লেখক :সাংবাদিক

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন