অণুগল্প

ফাস্টফুডের যুগে

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৯, ১৯:৪৫

 

ছুটির দিনে দুই বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন শাহ আলম। ঢুকলেন একটা আধুনিক মাকের্টে। এখন আর এইসব মার্কেট শুধু জামা-কাপড়ের বা বিশেষ পণ্যের না, এখানে সবই পাওয়া যায়। এমনকি সারি সারি খাবারের দোকান। এগুলোর নাম ফাস্ট ফুডের দোকান। নানা জাতের রসালো খাবারের ছবি ডানে-বাঁয়ে। খাবারের ঘ্রাণ নাকের ভেতরে ঢুকে টোকা দিচ্ছে। শাহ আলম নয় আর ছয় বছরের দুই সন্তানের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন দুজনেরই চোখ ছানাবড়া হয়ে আছে। তিনি বাচ্চাদের হাত ধরে একটি দোকানের ভেতর গিয়ে বসলেন।

নয় বছরের ছেলে বলল, ‘আব্বু, তোমার প্রিয় ফাস্টফুড কী ছিল?’

‘তোমার বয়সে আমাদের কোনো ফাস্টফুড ছিল না বাবা। আমাদের সবই ছিল স্লো ফুড।’

ছেলে আবার বলল, ‘তোমরা কোথায় খেতে যেতে?’

‘আমাদের একটাই খাবার জায়গা ছিল। ঘর। মা যা রান্না করতেন, তাই খেতে হতো। মাছ, ডাল চচ্চড়ি, উচ্ছে ভাজি। বাবা গম্ভীর হয়ে খেতেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে সেই খাবার শেষ করতাম। তাই এটা ছিল আমাদের স্লো ফুড।’

দুই ভাইবোন বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। ওদের চোখ বলছে, পৃথিবীটা কি কখনো এমন ছিল! তা তো জানতাম না!

শাহ আলম বললেন, ‘তোমরা এখন অর্ডার করলে যেমন বাড়িতে পিজা দিয়ে যায়, আমাদের সময় প্রতিদিন সকালে বাড়িতে দুধ দিয়ে যেত।  তোমাদের দাদা বা দাদু কেউ কোনোদিন সঙ্গে করে স্কুলে নিয়ে যায়নি। বাড়ি থেকে হেঁটে যেতাম।’

অবুঝ মেয়েটি বলল, ‘বাড়ি কী আব্বু?’

‘তোমরা যেমন ফ্ল্যাটে থাকো, আমরা তেমন বাড়িতে থাকতাম। বাড়িতে একটি উঠোন থাকে, দু-তিনটি ঘর থাকে। আলাদা রান্নার জায়গা থাকে, আলাদা গোসল ঘর থাকে। বাড়ি হলো তাই, যা বানাতে মানুষের অন্যকে ঠকানো, চুরি করা, ঘুষ নেওয়া, কামড়াকামড়ি করার প্রয়োজন হতো না।’

বলতে বলতেই অর্ডার দেওয়া খাবার চলে এল। বাচ্চা দুটো খাবারে মনোযোগ দিল। শাহ আলম চলে গেলেন তার কৈশোরে। যেখানে মোবাইলফোন নেই, আধুনিক সব কায়কারবার নেই। আছে কেবল প্রতিদিন রাত ১২টায় জাতীয় সংগীতের সুর বেজে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি সাদাকালো টেলিভিশন। যেখানে এই শহরের হাজার হাজার গাড়ির কোলাহল নেই, আছে নিস্তব্ধ মেঠোপথ ধরে রিং চালিয়ে দৌড়ে ছোটা, দুপুরবেলা ঘর পালিয়ে ওই-ই সেই বড় আমগাছটার নিচে গুলি খেলা। কালাম, সুবীর, জাফর, চঞ্চল, পোটকা হেলাল।

শাহ আলম হাতের মোবাইলে চাপ দিয়ে ইউটিউব খুললেন। কানে এয়ারফোন লাগিয়ে শ্যামল মিত্রের গাওয়া ‘পদ্মা নদীর পাড়ে আমার ছোট্ট সবুজ গ্রাম’ গানটি গভীর মনোযোগে শুনতে থাকলেন। বাচ্চা দুটো মন দিয়ে ফাস্টফুড খাচ্ছে।

সেই সে আমার ছোট্টবেলার খেলার সাথি কই,

ডাঙ্গুলি আর কানামাছি চড়ুইভাতি কই,

ইচ্ছে করে তাদের কাছে আবার ফিরে পাই,

তারা জানি না আজ কোথায়...

শাহ আলমের চোখ দুটো ভিজে উঠল।  বুকটা কেমন ভারী হয়ে গেছে।