মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

সৈয়দপুরে এত ‘বিহারি’ কীভাবে এলো

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৪, ১৫:৪৩

দেশের একমাত্র অবাঙালির শহর সৈয়দপুর। যেখানে বাঙালির চেয়ে অবাঙালিই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিহারী, বাঙালি, মাড়োয়ারি হিন্দু, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীসহ নানা গোষ্ঠীর বাস নীলফামারির ছোট্ট এই বাণিজ্যিক শহরে। শহরটি ছোট  হলেও বাণিজ্যিকভাবে এর গুরুত্ব অনেক। তেমনি ইতিহাসের পাতায়ও সৈয়দপুরের উপস্থিতি বেশ প্রাসঙ্গিক, নির্মমও বটে!

সৈয়দপুর শহরে পা রাখলেই, চারপাশ কিছুটা অপরিচিত মনে হতেই পারে। মানুষজনের আলাপচারিতা, বাচনভঙ্গিকে সহজেই পার্থক্য করতে পারবেন। ‘একটি শোক সংবাদ’ এর বদলে শুনবেন ‘এক মাইয়্যাত কি অ্যায়লান’। প্রতিটি মাইকিং করা হয় বাংলার পাশাপাশি উর্দুতে। এমনকি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এভাবেই বলা হয়— ‘মেরি মা বাহিনো আপকা পিয়ারা আপকা দুলারা ... ৭ জানুয়ারি কো আপনা কিমতি ওট দেকার কামিয়াব কিজিয়ে।’

মহান মুক্তিযুদ্ধেও নির্মম ছিল সৈয়দপুর। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর সারা দেশ শত্রুমুক্ত হলেও বিহারি অধ্যুষিত সৈয়দপুর শহর হানাদারমুক্ত হয় দু-দিন পর; অর্থাৎ ১৮ ডিসেম্বর। আবার এখানে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ও দুই দিন আগে অর্থাৎ ২৩ মার্চ! একাত্তরের ১৩ জুন এই শহরেই ট্রেন থামিয়ে অন্তত ৪৪৮ জনকে একে একে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুরো যুদ্ধকালীন সময়েই হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি বিহারিরা মাড়োয়ারি, বাঙালিদের ঘরে ঘরে ঢুকে চালায় লুটতরাজ।

কিন্তু এই বিহারিরা সৈয়দপুরে কোথা থেকে এলো? এর নেপথ্যে জানতে হলে ১৯৪৬ সালে ঘটে যাওয়া ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’, ‘নোয়াখালী ম্যাসাকার’ ও ‘বিহার দাঙ্গা’ নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু এখানে সেই সুযোগ সীমিত।

বিহার দাঙ্গা শুরু হয়েছিল ২৫ অক্টোবর। টানা চলেছিল ১০ নভেম্বর পর্যন্ত। বেশ কয়েক হাজার মানুষ—নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে নিহত হয়েছেন। কয়েক লাখ বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় খুঁজে চলেছেন। মুসলিম লীগের নেতৃত্ব এখানে সেখানে কিছু শিবির করে আতঙ্কিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করছেন। সব বাংলার লাগোয়া এলাকায়। ততদিনে দেশভাগ চূড়ান্ত হয়ে গেছে। যে বাংলাদেশ নিয়ে এক সময় বিহারে লোকগাথা ছিল, ওখানে গেলে ‘মেয়েরা মরদদের মাছি বানিয়ে দেবে’, সেখানেই বাস্তুচ্যুত মুসলমানদের আসতে হলো। এর নেপথ্যে ভয়, উগ্র হিন্দুত্ববাদ তো রয়েছেই!

১৯৪৭ সালের আগেই মুসলিম লীগের আপদকালীন রিফিউজি ক্যাম্প বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন হিন্দু ও মুসলিম নেতারা শুধু ভাগ-বাঁটোয়ারা হিসাবনিকাশে ব্যস্ত। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। খাজা নাজিমউদ্দিন সাফ জানিয়ে দিলেন বিহার-ইউপির মুসলমানদের দায় পূর্ব বাংলা নেবে না। ১৯৪৭-৫০ সাল পর্যন্ত তবু অবাঙালি মুসলমানরা দলে দলে পূর্ব বাংলায় গেছে।

ভারতের বিহার রাজ্য থেকে সৈয়দপুরে আসা তেমনি একজন কবির আলকাস খান। তার মতে বন্যার মতো মানুষ পূর্ব বাংলায় এসেছিল। তিনি বলেন, ‘দাঙ্গা ভয় নিয়ে আমরা পাকিস্তানে (পূর্ব বাংলা) আসি। আমরা ছিলাম মুসলমান, উর্দু আমাদের ভাষা। বাংলাদেশ স্বাধীনের পরও আমরা পাকিস্তানেই যেতে চেয়েছি।’

তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের করা ষাটের দশকের শেষাংশে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে পূর্ব পাকিস্তানে ২০ লাখ উর্দুভাষী আসেন। তার একটা বড় অংশ আসে সৈয়দপুরে। কারণ আগে থেকেই এখানে বেশ কিছু বিহারি কাজ করতো। (১৮৭০ সালে সৈয়দপুরে ইংরেজ সরকার একটি রেল কারখানা স্থাপন করে, ৭০০০ বিহারীকে শ্রমিক হিসেবে নিয়ে আসা হয়।) তাছাড়া সেই সময়ে এটা ছিল বৃটিশদের গড়া তিলত্তমা এক গার্ডেন নগরী। এখানকার নানা কারখানায় সস্তা শ্রমিক হিসেবে বিহারির সমাদরও পেয়েছে।

বিহার থেকে আগত মুসলিম বিহারিদের সাথে বাংলার মুসলিম অধিবাসীদের ধর্মের অনেক মৌলিক পার্থক্য ছিল। কারণ বিহারি মুসলিমরা বেশির ভাগ ছিল শিয়া মতালম্বী ও রেজা খানের অনুসারী ও সামান্য কিছু ছিল কাদিয়ানি মতালম্বী অন্যদিকে বাংলার অধিবাসীদের বেশির ভাগ হানাফী মাজহাবের অনুসারী। তাদের এই পৃথক ধর্ম মত তাদের স্থানীয় বাঙালি মুসলিমদের থেকে অনেকটা দূরে ঠেলে দিয়েছিল।

তবে একটি বড় সংখ্যা বিহারি স্থানীয় বঙ্গালী মুসলিমদের সাথে তাদের ধর্মীয় মতাদর্শের পার্থক্য না থাকায় তাদের সাথে মিলতোভাবে বসবাস করতে শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধে সময় বিহারিদের আচরণ তো সবারই জানা। নবজাগ্রত বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শাসকদের হাতের তাস হিসেবে। কিছু ভর্তুকি দিয়ে পাকিস্তানের শাসকরা ইচ্ছে করে বাঙালি-অবাঙালি সম্পর্কে ফাটল ধরাতে চেয়েছেন প্রথম থেকেই। তার পরিণতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অবাঙালি মুসলমানদের বিরাট অংশের রাজাকার, আলবদর হয়ে মুক্তিসংগ্রামের বিরোধিতা করা।

বর্তমানে সৈয়দপুরে ২২টি বিহারি ক্যাম্প রয়েছে। তাদের উর্দু ভাষাভাষী বলা হলেও তারা মূলত উর্দু-হিন্দির সঙ্গে আঞ্চলিকতার মিশেলে কথা বলেন। এখনো বিহারি প্রবীণ ব্যক্তিরা বাঙালিদের ভালো চোখে দেখেন না। এমনকি বাঙালি হকারকে তাদের দোকানের সামনে বসতে দেন না। তবে এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম বর্তমান প্রজন্মের বিহারিরা। তাই ক্যাম্পে বসবাসকারী ও ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানকারী কেউ আর পাকিস্তান যেতে চান না।

ইত্তেফাক/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন