শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০
The Daily Ittefaq

‘ব্যাংকগুলো এখন পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে’

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৪, ১৭:০৩

দেশের ব্যাংকগুলো এখন পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত ভুল আছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় যে কয়টি ব্যাংক দেওয়া হয়েছে সবক’টি দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এসব ব্যাংক মালিকদের উদ্দেশ্যই ছিল অর্থ আত্মসাৎ করা। ব্যাংক এখন পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

শনিবার (৩০ মার্চ) রাজধানীর এফডিসিতে ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।

দেশের আর্থিক খাতে অস্থিরতার দায় বাংলাদেশ ব্যাংক এড়াতে পারে না উল্লেখ করে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতিই ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসনের পথে বড় বাধা। রাজনীতিবিদই ব্যবসায়ী, মিডিয়া হাউজের মালিক ব্যাংকেরও মালিক। ফলে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়ে সুশাসনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে সংকট নিরসনের যে প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে তা ইতিবাচক হলেও প্রক্রিয়াটি জটিল। ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আর্থিক তছরুপকারী দুর্বল ব্যাংকের মালিকরা যাতে পার না পেয়ে যায় তা খেয়াল রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ গভর্নর বলেন, ঋণখেলাপি ও টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে। দুর্বল ব্যাংকের সংকট কাটাতে সবল ব্যাংক যেন দুর্বল ব্যাংকে পরিণত না হয় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে ঋণখেলাপিদের সামাজিকভাবে বর্জন করা হয়। তারা ব্যবসা বাণিজ্য, বাড়িভাড়া এমনকি পেট্রোল পাম্পে তেলও নিতে পারে না। অথচ আমাদের দেশে ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীরা এয়ারপোর্টে ভিআইপি হিসেবে যাতায়াত করে।

সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, দেশের উন্নয়ন নিয়ে আমরা গর্ব করলেও আর্থিক খাতের অনিয়ম নিয়ে কথা বলতে লজ্জা বোধ হয়, মাথা হেইট হয়ে আসে। ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের সংস্কৃতি আমাদের জন্য একটা বড় কালো দাগ। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ভয়াবহ ক্যান্সারের রূপ নিচ্ছে। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থ আত্মসাৎ, রিজার্ভ চুরি, বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতি, ফারমার্স ব্যাংকের পতন, পিপলস লিজিং এর অবসান, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ডেসটিনির জালিয়াতি, পুঁজি বাজারের কারসাজি, শেয়ার মার্কেট লুট ইত্যাদি কলঙ্কিত ঘটনা আর্থিক খাতকে ব্যাপক দুর্বল করে ফেলেছে। ব্যাংক খাত আজ তছনছ হয়ে যাচ্ছে। সোনালী ব্যাংক লুট হয়েছে। জনতা ব্যাংক লুট হয়েছে। বেসিক ব্যাংক ধ্বংস হয়েছে। পদ্মা ব্যাংক কলঙ্কের ইতিহাস রচনা করেছে। এই বেসামাল পরিস্থিতি উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংক সবল ব্যাংকের সাথে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা খুবই জরুরি। কতিপয় রাজনৈতিক চক্র, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যাতে আর আর্থিক খাতে অনিয়ম করতে না পারে তার জন্য সরকারকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরন ১০ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করেন: 

১) ব্যাংক থেকে নামে বেনামে আত্মসাৎ করা অর্থ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে প্রয়োজনে প্রচলিত আইনের সংস্কার এর মাধ্যমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থা করা ২) আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিতে স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠন করা ৩) ঋণ জালিয়াতির সাথে জড়িত ব্যক্তিসহ ঋণ খেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের নামের তালিকা জাতীয় সংসদে প্রকাশ করা ৪) আর্থিক খাতে অনিয়মের সাথে জড়িত ব্যক্তিসহ ঋণ খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা প্রদান, নতুন ঋণ প্রদান বন্ধ, দেশে বিদেশে স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তির তালিকা করে এনবিআর ও দুদকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা ও ব্যবসা সম্প্রসারণ প্রদান করা ৫) শুধু সবল ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক একীভূত নয়, যারা ব্যাংক দুর্বল করার জন্য দায়ী তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যাতে সরকারের ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকালীন সময়ে এইসব অসৎ ব্যক্তিরা পার পেয়ে যেতে না পারে ৬) দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষতির দায় কে নিবে তা স্পষ্ট করা। একই সাথে দুর্বল ব্যাংকগুলোর আমানত গ্রহণ ও বিতরণ ছাড়া অন্যসব কার্যক্রম বন্ধ করা ৭) দুর্বল ব্যাংকের আদায় অযোগ্য ঋণ আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা ৮) ব্যাংকের কার্যক্রমের উপর অধিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম না হয় ৯) ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা আলাদা করতে হবে। যাতে মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী পর্ষদ যেন ব্যবস্থাপনা কাজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে এবং ১০) ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সুফল পেতে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা। যাতে কোন পক্ষপাতমূলক সংবাদ ব্যাংক একীভূত প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। 

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র আয়োজনে ‘ব্যাংক একীভূতকরণ ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদার করবে’ শীর্ষক ছায়া সংসদে প্রস্তাবের পক্ষে প্রাইম ইউনিভার্সিটির বিতার্কিকদের পরাজিত করে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি এর বিতার্কিকরা বিজয়ী হয়।

প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু মুহাম্মদ রইস, ড. এস এম মোর্শেদ, সাংবাদিক দৌলত আক্তার মালা, সাংবাদিক ইকবাল আহসান এবং সাংবাদিক সেলিম মালিক। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী দলকে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র প্রদান করা হয়।  

ইত্তেফাক/এবি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন